শুক্রবার, ০২ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৮

কিছু কথা না বললেই নয়-পর্ব ১০৩

সাফল্যের শিখরে থেকেও যাঁর মুখে অমলিন হাসি

ড. আব্দুস সাত্তার
সাফল্যের শিখরে থেকেও যাঁর মুখে অমলিন হাসি

আমরা দুজন হাসছিলাম। কেন হাসছিলাম, সে কথা আজও বলতে পারবো না। তবে যাঁর সঙ্গে হাসির সেই মুহূর্ত ভাগ করে নিয়েছিলাম, তাঁর কথা না বললেই নয়। তিনি চিকিৎসক ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরী।

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার দত্তরাইল গ্রামের সন্তান কালী প্রদীপ চৌধুরী। জমিদার কালীপদ দত্ত চৌধুরীর বংশধর এই মানুষটির শৈশব-কৈশোর কেটেছে সিলেটেই। এমসি কলেজে পড়াশোনা শেষে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড ও কানাডা হয়ে পাড়ি জমান আমেরিকায়।

তখন তাঁর পকেটে ছিলো মাত্র ৮ ডলার, কিন্তু চোখে ছিলো পাহাড়সম স্বপ্ন।

আমেরিকায় এসে প্রথম চাকরির জন্য তিনি একটি হাসপাতালে আবেদন করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু প্রত্যাখ্যান তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং জেদ আরও দৃঢ় হলো। তিনি সংকল্প করলেন, একদিন এই হাসপাতালেই কাজ করবেন।

দীর্ঘ ১১ মাসের প্রচেষ্টার পর অবশেষে সেই হাসপাতালে কাজের সুযোগ পেলেন। কয়েক মাস পর একদিন হাসপাতালের প্রশাসককে বললেন, ‘একদিন আমি এই হাসপাতালটি কিনে নেবো।’

তাঁর কথা শুনে প্রশাসক হেসে উঠেছিলেন। মাঝেমধ্যে সেই কথাটি নিয়ে তাঁকে উপহাসও করতেন। অবশ্য সদ্য আমেরিকায় এসে কোনো রকমে চাকরি পাওয়া এক বাঙালি তরুণের মুখে এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা শুনে তাঁর অবিশ্বাস অস্বাভাবিক ছিলো না।

কিন্তু সময় মানুষকে অনেক কিছুই দেখায়। মাত্র ১৩ বছর পর সেই প্রশাসক বিস্মিত হয়ে দেখলেন—যে তরুণ একদিন হাসপাতালটি কিনে নেওয়ার স্বপ্নের কথা বলেছিলো, সে সত্যিই হাসপাতালটির মালিক হয়ে গেছে!

সেখান থেকেই শুরু হয় 'কেপিসি গ্রুপ'-এর বিস্তৃত যাত্রা। আজ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রিয়েল এস্টেট, কৃষি, প্রযুক্তি, শক্তি ও পরিবহনসহ নানা খাতে তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। সাফল্যের এই বিপুল পরিসরের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে মানবিক উদ্যোগেও সম্পৃক্ততার পরিচয়।

২০১৮ সালে অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তার লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘এবাভ অ্যান্ড বিয়ন্ড রিসোর্স সেন্টার’ । এ উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি লাভ করেন ‘এবাভ অ্যান্ড বিয়ন্ড অ্যাওয়ার্ড’।

২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, কেপিসি গ্রুপের হাসপাতালের সংখ্যা ছিলো ৭০টি। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর প্রতিষ্ঠানের রয়েছে বিপুল পরিমাণ জমি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষের সংখ্যাও কয়েক হাজার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারতের চা-বাগানও উল্লেখযোগ্য।

তাঁর সাফল্যের গল্প যেন এক দীর্ঘ অভিযাত্রা—স্বপ্ন, সংগ্রাম, অধ্যবসায় আর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্য প্রচেষ্টা।

তবে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও তিনি নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি। বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন বারবার, বুকের মধ্যে নানা স্বপ্ন নিয়ে।

নিজ গ্রামে পৈতৃক সম্পত্তির ওপর বিশ্বমানের একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তাঁর দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি ঢাকার পূর্বাঞ্চলে একটি ১৪২ তলা আইকনিক টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। প্রস্তাবিত ভবনটি বিশ্বের অন্যতম উঁচু স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিলো তাঁর। প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিলো।

এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তিনি বহুবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। কিন্তু নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে উদ্যোগটি এখনো সফলতার মুখ দেখেনি।

দেশে স্বপ্নের সেই ভবন নির্মাণের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি নীরব হয়ে গেলেন। তাঁর চোখে যেন ভেসে উঠলো চাপা বেদনার ছায়া। কাউকে দোষারোপ করলেন না, কোনো অভিযোগও করলেন না। তবু তাঁর নীরবতায় যেন স্পষ্ট হয়ে উঠলো এক গভীর উপলব্ধি—বাংলাদেশে ইচ্ছা থাকলেই, সামর্থ্য থাকলেই সব স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সহজ নয়।

তবে আশার কথা, সংশ্লিষ্ট মহল থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাসের কথাও জানা গেছে। স্বপ্নের ভবনটি একদিন বাস্তব রূপ পাবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

আমি তাকিয়ে দেখছিলাম মানুষটিকে। সাফল্যের চূড়ায় অবস্থান করেও যাঁর মধ্যে বিনয়ের দীপ্তি। চোখে তারুণ্যের উজ্জ্বলতা, চিন্তায় দূরদর্শিতা, কথায় আভিজাত্য—আর মুখে এক নির্মল হাসি।

আমাদের হাসির কারণ হয়তো ভিন্ন, কিন্তু হাসির ভাষা তো এক। সেই হাসি দেখে কারও মুখেও হাসি ফুটতে পারে। আর মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে বড় মানবিক অর্জন আর কী হতে পারে?

হাসি হোক আনন্দের, ভালোবাসার, সহমর্মিতার। প্রতারণার অন্ধকার কিংবা কৃত্রিম গাম্ভীর্য নয়—উদারতার সুরে মুখরিত হোক আমাদের জীবন।

জীবন কাটুক হাসি-আনন্দে। আপনার হাসিতে হেসে উঠুক পৃথিবী। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জীবন হোক নির্মল আনন্দে পরিপূর্ণ। প্রতিটি হাসিতে ফুটে উঠুক মানবিকতার আলো। কল্যাণ, মমতা ও শুভকামনা ঝরে পড়ুক সেই সোনাঝরা হাসিতে।

হাসি হোক মানুষের, হাসি হোক মানবতার।

ড. আব্দুস সাত্তার : লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট; ওয়াশিংটন ডিসি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়