বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২০

কিছু কথা না বললেই নয়

ড. আব্দুস সাত্তার
কিছু কথা না বললেই নয়

(পর্ব-১০১)

বললে অনেক কথাই বলা যায়—ভালো কথা, নীতিকথা কিংবা কথার কথা। কিন্তু ‘কিছু কথা না বললেই নয়’--এ আমি বলতে চাই শুধু ততটুকুই, যতটুকু নিজের চোখে দেখেছি, সান্নিধ্যে পেয়েছি এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ও কথোপকথনের মধ্য দিয়ে অনুভব করেছি।

প্রায় এক যুগ আগে, ২০১৩ সালে, এই লেখার শুরু। সে বছর অমর একুশে বইমেলায় আমার কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। সেই আনন্দঘন সময়ে যাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছি, যাঁদের হাতে বই তুলে দিয়েছি, যাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি উৎসাহ ও প্রেরণা—তাঁদের ঘিরেই জন্ম নিয়েছে কিছু কথা, কিছু অনুভূতি, কিছু স্মৃতি। ২০২৪ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় ‘কিছু কথা না বললেই নয়’ নামে আমার প্রবন্ধগ্রন্থ। পাঠকের ভালোবাসায় লেখাটি আজও চলছে।

দীর্ঘ প্রবাসজীবনে প্রবাসী বাঙালি সমাজের খুব কাছ থেকে দেখা মানুষগুলোই এই লেখার মূল অনুষঙ্গ। তাঁরা আমার কাছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ; স্মৃতির পাতায় তাঁরা থাকবেন আত্মার প্রিয় সারথি হয়ে।

আজ তেমনই একজনকে নিয়ে লিখছি—বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিদের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন ৪০তম ফোবানা সম্মেলন। লস অ্যাঞ্জেলেসের হিলটন ইউনিভার্সেল হোটেলে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তবে আমার কাছে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি মঞ্চের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; ছিল মঞ্চের বাইরের মানুষটি।

সম্মেলনের বিভিন্ন আয়োজনে তাঁকে দেখা গেছে। শিশুদের আর্ট প্রতিযোগিতা, রেড কার্পেট লাঞ্চ এবং খালেদ মহিউদ্দিনের টক শো—সবখানেই তিনি অংশ নিয়েছেন। টক শো চলে প্রায় দুই ঘণ্টা। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি প্রবাসীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। ক্লান্তির কোনো ছাপ যেন তাঁকে স্পর্শই করেনি। তিনি জানিয়েছেন, প্রবাসীদের নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য চারজন সচিবের নেতৃত্বে বিশেষ সেল কাজ করছে। প্রবাসীরা তাদের অভিযোগ ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনগুলোতে প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার কথাও তিনি বলেন।

কথাগুলো মঞ্চে বলা এক বিষয়; কিন্তু সেই কথার বাস্তব প্রতিফলন নিজের চোখে দেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

তিন দিনের সম্মেলনে অসংখ্য প্রবাসী তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন। কেউ চাকরি নিয়ে, কেউ পাসপোর্ট-দূতাবাস নিয়ে, কেউ জমিজমা নিয়ে, কেউবা দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের হাতে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তিনি হোটেলে বসেই বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোন করে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করেছেন।

একটি দৃশ্য বিশেষভাবে আমার চোখে আটকে আছে। মন্ত্রী কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিতে হোটেলের এক পাশে একটি সোফায় বসেছিলেন। মনে হয়েছিল—এই তো একটু বিশ্রামের সময়। কিন্তু সেখানেও একে একে প্রবাসীরা তাঁদের সমস্যার কথা নিয়ে হাজির হলেন। কেউ জায়গা-জমি নিয়ে বিপাকে, কেউ অর্থনৈতিক প্রতারণার শিকার, কেউ আত্মীয়স্বজনের দখলদারিত্বের অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। ভাবছিলাম—এত মানুষের এত কথা, একজন মানুষ কতটা ধৈর্য নিয়ে শুনতে পারেন! বিস্ময়ের বিষয়, তাঁকে বিরক্ত হতে দেখলাম না। বরং কারও অভিযোগ শুনে নিজেই ফোন তুলে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললেন। একজন ডিসির সঙ্গেও কথা বলতে দেখলাম।

সেই মুহূর্তের আচরণ আমার কাছে মঞ্চের দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও বেশি অর্থবহ মনে হয়েছে।

আমি জীবনে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, নেতা-পাতিনেতাসহ অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সত্যি বলতে, অনেকের কাছে পৌঁছানোই ছিল কঠিন; পৌঁছাতে পারলেও কথা বলার সুযোগ পাওয়া ছিল আরও কঠিন।

কিন্তু এখানে যেন অন্য এক দৃশ্য—পদমর্যাদার দেয়াল নেই, দূরত্বের অহংকার নেই; আছে মানুষের কথা শোনার স্বাভাবিক আগ্রহ।

অনেক চেষ্টার পর টক শো শেষে তাঁর সঙ্গে আমারও কথা বলার সুযোগ হলো। আমার প্রকাশিত বইগুলো তাঁর হাতে তুলে দিলাম। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে সেগুলো গ্রহণ করলেন।

মুহূর্তটি হয়তো খুব ছোট, কিন্তু আমার কাছে ছোট নয়। কারণ, একজন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার স্মৃতি নয়—আমি মনে রাখতে চাই একজন মানুষের সঙ্গে একজন প্রবাসী বাঙালির সহজ কথোপকথনের স্মৃতি।

ফোবানার বড় মঞ্চে অনেক আলো, ক্যামেরা ও বক্তব্য থাকে। কিন্তু সেই আলোর বাইরে, হোটেলের এক কোণে বসে থাকা একজন মন্ত্রী যখন ক্লান্ত শরীরেও একজন সাধারণ প্রবাসীর সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনেন—সেই দৃশ্যই হয়তো সবচেয়ে বড় ছবি হয়ে থেকে যায়।

আমার দীর্ঘ প্রবাসজীবনে অনেক মানুষ দেখেছি। পদ দেখেছি, ক্ষমতা দেখেছি, দূরত্ব দেখেছি। আবার কিছু মানুষকে দেখেছি, যাঁরা পদকে নিজের চারপাশে দেয়াল বানাননি।

আরিফুল হক চৌধুরীকে ঘিরে ফোবানার এই কয়েকটি দিন আমার কাছে তেমনই একটি অভিজ্ঞতা। মনে হলো—মন্ত্রী হওয়া বড় পরিচয় হতে পারে, কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারা তার চেয়েও বড় পরিচয়।

টক শো শেষ হয়েছে, ফোবানার মঞ্চও একদিন গুটিয়ে যাবে। মানুষ যার যার গন্তব্যে ফিরে যাবে। কিন্তু কিছু দৃশ্য থেকে যায়—মনের ভেতর, নিঃশব্দে।

আমার সেই দৃশ্যগুলোর একটিতে আছেন আরিফুল হক চৌধুরী—একজন মন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা মানুষ হিসেবে।

বাংলাদেশের সবাই যদি এমন হতো, তাহলে হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্র আর এত দূরের কোনো শব্দ হয়ে থাকত না।

ড. আব্দুস সাত্তার : লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট; ওয়াশিংটন, ডি.সি.।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়