বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪১

প্রাথমিকে মেধাবী শিক্ষক ও আকর্ষণীয় বেতন বাঞ্ছনীয়

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার
প্রাথমিকে মেধাবী শিক্ষক ও আকর্ষণীয় বেতন বাঞ্ছনীয়

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। এই স্তরেই শিশুর চরিত্র, চিন্তাশক্তি, ভাষা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং শেখার প্রতি আগ্রহের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

ফলে প্রাথমিক শিক্ষা দুর্বল হলে পরবর্তী মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষার সব স্তরেই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেও সাবলীলভাবে পড়তে পারে না, সহজ ইংরেজি বুঝতে অসুবিধা হয়, এমনকি মৌলিক গণিতেও দুর্বলতা দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে এসএসসি বা এইচএসসিতে অনেক শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেলেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারে না।

বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের শেখার দক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের মানবপুঁজি সূচক (ঐঁসধহ ঈধঢ়রঃধষ ওহফবী) অনুযায়ী, বাংলাদেশের এইচএসসি পাস করা একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিখনমান আন্তর্জাতিক মানের মাত্র সপ্তম শ্রেণির সমান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা ১২ বছর পড়াশোনা করলেও শিখনমানের দিক থেকে প্রায় সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ বছর পিছিয়ে থাকে। এসব বাস্তবতা প্রমাণ করে যে শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে গোড়া থেকেই অর্থাৎ প্রাথমিক স্তর থেকেই সংস্কার শুরু করতে হবে।

এ লক্ষ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সবচেয়ে মেধাবী, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের নিয়োগ, তাঁদের উচ্চ বেতন, সামাজিক মর্যাদা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশে প্রাথমিক স্তরে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদেরই নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাঁদের বেতনও কম।

ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে উচ্চমানের একাডেমিক যোগ্যতা, কঠোর বাছাই প্রক্রিয়া এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ অতিক্রম করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সেরা মেধাবীরাই শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। কারণ সেখানে শিক্ষকরা সম্মানজনক বেতন, গবেষণার সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদা পান।

ফিনল্যান্ডে প্রাথমিক শ্রেণিতে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে খেলাধুলা, গল্প, দলগত কার্যক্রম, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীল চিন্তা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখানো হয়। এখানে সাত বছর বয়স থেকে ৯ বছরের বাধ্যতামূলক মৌলিক শিক্ষা শুরু হয়। কোনো প্রমিত বা পাবলিক পরীক্ষা নেই, হোমওয়ার্ক অত্যন্ত কম দেওয়া হয় এবং প্রতিটি শিশুর মানসিক ও শারীরিক কল্যাণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে শিক্ষার্থীদের তুলনা বা র‌্যাংকিং করার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষকরা নিজেদের মতো করে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অগ্রগতি মূল্যায়ন করেন। এখানে কোনো ভালো বা খারাপ স্কুলের বৈষম্য নেই। তবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়। অন্যান্য উন্নত দেশেও অনুরূপ ব্যবস্থা অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরের প্রথম কয়েক বছরে আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা খুবই সীমিত বা অনুপস্থিত থাকে, বরং শিক্ষার্থীর ধারাবাহিক অগ্রগতি, অংশগ্রহণ, আচরণ, সৃজনশীলতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। শিশুদের ওপর অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ সৃষ্টি না করে শেখার আনন্দ সৃষ্টি করাই তাদের মূল লক্ষ্য। ফলে শিশুরা ভয় নয়, আগ্রহ নিয়ে বিদ্যালয়ে যায় এবং মানবিকতা, সততা, সহযোগিতা, পরিবেশসচেতনতা, প্রযুক্তি ব্যবহার, কর্মমুখী দক্ষতা ও নেতৃত্বের মতো জীবনঘনিষ্ঠ গুণাবলি ছোটবেলা থেকেই অর্জন করে। অর্জনের এই মডেলগুলো দেখায় যে একটি দেশের উন্নত মানবসম্পদ গড়ে তুলতে প্রাথমিক শিক্ষায় মেধাবী শিক্ষকদের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ মেধাবী শিক্ষকরা তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগ ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের কৌতূহল ও সমালোচনা করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেন এবং তাদের মধ্যে নৈতিকতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করে জীবনমুখী করে তোলেন।

আমাদের দেশের বেশির ভাগ খুদে শিক্ষার্থী প্রতিদিন ভারী স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে বিদ্যালয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অল্প বয়সেই একাধিক বই, গাইড, কোচিং ও পরীক্ষার চাপে পড়তে হয়। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, নম্বরকেন্দ্রিক মূল্যায়ন এবং সৃজনশীলতার সীমিত চর্চা শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। গল্প, কবিতা বা তথ্য শুধু মুখস্থ করিয়ে ভালো ফল অর্জনের চেষ্টা করা হলেও বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগের দক্ষতা অনেক সময় গড়ে ওঠে না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ শ্রেণিতে উঠেও পাঠ্যবই বুঝে পড়তে পারে না, যুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে না কিংবা ভাষা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে। এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য পাঠ্যক্রমকে আরো জীবনমুখী ও আনন্দভিত্তিক করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে খেলাধুলা, বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গল্প বলা, নাট্যাভিনয়, চিত্রাঙ্কন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা বাড়াতে হবে। শুধু মেধাবী শিক্ষকরাই এসব কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিসসহ কর্ম ও বাস্তবমুখী জ্ঞানার্জনে শিক্ষার্থীদের পরিচালিত করতে পারবেন। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান কর্নার, খেলাধুলার মাঠ, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ এবং শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতির ব্যবহার, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অভিভাবকদের সচেতন সম্পৃক্ততা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। প্রাথমিক স্তরে শিশুদের মানবিকতা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যবিধি, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও কর্মের মর্যাদা সম্পর্কে বাস্তবমুখী শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

তাই শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তনের সূচনা হতে হবে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বেতন, আকর্ষণীয় পদোন্নতি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করলে মেধাবীরা এই পেশায় আগ্রহী হবেন। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে দক্ষতা ও সৃজনশীলতাভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় বই ও পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শেখাকে আনন্দময় ও বাস্তবমুখী করতে হবে। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা প্রশাসন এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, প্রশাসক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাদের শিক্ষার ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, দেশের ভবিষ্যৎও তত উজ্জ্বল হবে। একটি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা শুধু ভালো ফল নয়, বরং সৎ, দক্ষ, মানবিক, উদ্ভাবনী ও কর্মক্ষম নাগরিক তৈরি করতে পারে। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত প্রাথমিক শিক্ষায় মেধাবীদের যথাযথ সম্মানসহ উচ্চ বেতনে নিয়োগ দেওয়া।

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়