মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩০

সাক্ষাৎকার : ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ

চাঁদপুরে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ২৫-৩০ শতাংশ অন্য জেলার

অনলাইন ডেস্ক
চাঁদপুরে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ২৫-৩০ শতাংশ অন্য জেলার

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসকদের সংগঠন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে চাঁদপুর শহরের নতুনবাজারে। প্রকৌশলী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও পরে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি, রোটারী ইন্টারন্যাশনালের সহকারী গভর্নর এবং বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশন, চাঁদপুরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। চাঁদপুরের চিকিৎসাসেবা, বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত ও দরিদ্র রোগীদের জন্য তাঁর উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেছেন আল-আমিন হোসাইন।

আপনার শৈশব ও কৈশোর কোথায় কেটেছে? চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নটা কীভাবে বুনেছিলেন?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : আমার জন্ম যশোরে। ষাটের দশকে। বাবার চাকরির কারণে আমাদের পরিবার সে সময় যশোরে ছিলো। এর কয়েক বছর পর আমরা চাঁদপুরে চলে আসি। বাবা সরকারি চাকরির কারণে প্রায়ই জেলার বাইরে থাকতেন, আমরা ভাইবোনেরা চাঁদপুরেই থাকতাম। নতুনবাজারে, ডিএন হাইস্কুলের পাশে আমার শৈশব কেটেছে। শিশু শ্রেণি থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত ডিএন হাইস্কুলে পড়েছি। এরপর চাঁদপুর কলেজ থেকে ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পাস করি। আমাদের সময় বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা মেডিকেলের আগে হতো। বুয়েটে নির্বাচিত হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং চার বছরের ছিল, চাকরিরও ভালো সুযোগ ছিল। তৃতীয় বর্ষেই অনেকের চাকরি নিশ্চিত হয়ে যেত। মেডিকেলে পাঁচ-ছয় বছর লাগত, সেশনজটও ছিল। আমরা নয় ভাইবোন। দ্রুত পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চিন্তা ছিল। বুয়েটে ভর্তি হওয়ার চার-পাঁচ মাস পর মেডিকেলের ফল প্রকাশ হয়। আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে সুযোগ পাই। আমার চাচা নোয়াখালীর পরিচিত সার্জন ছিলেন। তিনি গরিব মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় তাঁদের অর্থও দিতেন। বাবা বলেছিলেন, ইঞ্জিনিয়ার হলে এভাবে মানুষের সেবা করার সুযোগ কম, কিন্তু ডাক্তার হলে সেটা সম্ভব। কথাটি আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৭৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই।

যেদিন প্রথম চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেন, সেদিনের অনুভূতি জানতে চাই।

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : ১৯৮৪ সালে আমি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করি। চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করার সময় মনে হয়েছিল, এবার জীবনে কিছু করতে পারব। বাবা তখন জীবিত ছিলেন, তাঁর ইচ্ছাও পূরণ হয়েছিল। আমার নিজেরও সার্জন হওয়ার ইচ্ছা ছিল। প্রথম দিকের একটি রোগীর কথা এখনো মনে আছে। ময়মনসিংহের একজন দরিদ্র কলা বিক্রেতা টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তার পেটের নাড়িভুঁড়ি ছিদ্র হয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। তখন টাইফয়েডের ওষুধ এত কার্যকর ছিল না। জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন ছিল। তার রক্তের গ্রুপ এবি পজিটিভ, আমারও একই গ্রুপ। ছাত্রজীবন থেকেই সন্ধানীর সঙ্গে যুক্ত থাকায় রক্তদানের অভিজ্ঞতা ছিল। আমি নিজেই রক্ত দিয়েছিলাম এবং একজন সিনিয়র অধ্যাপকের সঙ্গে অস্ত্রোপচার করি। রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান। একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে অংশ নিতে পারার অনুভূতিটা তখন খুব গভীরভাবে পেয়েছিলাম।

আপনার দীর্ঘ কর্মকালে পেশাগতভাবে আপনি কী কী দায়িত্ব পালন করেছেন?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : ঢাকা মেডিকেলে প্রায় দুই বছর সার্জারির প্রশিক্ষণ নিয়েছি। ১৯৮৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কর্মজীবনে প্রবেশ করি। ১৯৮৬ সালের দিকে সরকারি চাকরির পোস্টিং নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তখন নিজ জেলায় প্রথম দুই বছর দায়িত্ব পালনের নিয়ম ছিল। কিন্তু আমার পোস্টিং ফরিদপুরে দেওয়া হয়, যদিও চাঁদপুরে ২১টি পদ খালি ছিল। পোস্টিং পরিবর্তনের জন্য তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে চেষ্টা করেছি। পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর কাছেও গিয়েছিলাম; তবু চাঁদপুরে পোস্টিং হয়নি।

একই সময়ে ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সালের চাকরির ধারাবাহিকতা নিয়েও আন্দোলন হয়েছিল। আটটি মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকেরা এতে যুক্ত ছিলেন। আমাদের দাবি ছিল চাকরির ধারাবাহিকতা ও বেতন-ইনক্রিমেন্ট বহাল রাখা। শেষ পর্যন্ত দাবি মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু ফরিদপুরে যোগদানের জন্য পাঁচ দিনের সময়সীমার মধ্যে আমি সেখানে যাইনি। ফলে চাকরি শেষ হয়ে যায়। এখন এটাকে আর দুর্ভাগ্য মনে করি না। চাঁদপুরে ফিরে এসে প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করি। বাবা বলেছিলেন, ‘চাঁদপুরে আইসা প্র্যাকটিস শুরু করো।’

ছাত্রজীবনে সন্ধানীর দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলাম। রক্তদান, চক্ষুদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলাম। প্রায় ১৯৯০ সালে রোটারী ক্লাব চাঁদপুরে যোগ দিই। ২০০৪-২০০৫ সালে বিএমএ চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি এবং একই বছর রোটারী ইন্টারন্যাশনালের চাঁদপুর জেলার সহকারী গভর্নর নির্বাচিত হই। এক বছর দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করেছি। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি।

শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও দীর্ঘদিন যুক্ত আছি। ১৯৯৬ সাল থেকে ডিএন হাইস্কুলের কমিটিতে ছিলাম; প্রথমে সহসভাপতি, পরে সভাপতি হিসেবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছি। লেডী দেহলভী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গেও প্রায় ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্ত ছিলাম। পুরানবাজার কলেজের গভর্নিং বডিতে ছিলাম। ফরিদগঞ্জের ঘনিয়া কামিল মাদ্রাসা ও এতিমখানার গভর্নিং বডির সঙ্গেও যুক্ত আছি। এছাড়া চাঁদপুর জেলা কমিউনিটি পুলিশিংয় সমন্বয় কমিটির সভাপতি ছিলাম। সম্প্রতি সেই দায়িত্ব ছেড়েছি। ১৯৯৯ সালে রিজিয়ন-৩-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম।

বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশন, চাঁদপুরের সভাপতির দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : আমাদের মূল কাজ ছিল বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সেবা নিশ্চিত করা। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিম্নমানের প্রতিষ্ঠান বন্ধে কাজ করা হয় এবং মাসিক অভিযান পরিচালিত হয়। সংগঠনের কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স কমিটিও আছে। রোটারীর মাধ্যমে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রতি শুক্রবার বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ১৯৯৯-২০০০ সালে রোটারী সভাপতি থাকাকালে ৫২ সপ্তাহ নিজে রোগী দেখেছি। পরে সময় কম দিতে হয়েছে। এখন আবার সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। ডা. এম জি ফরুকসহ চাঁদপুরের আরও কয়েকজন চিকিৎসক সেখানে নিয়মিত রোগী দেখেন ও ওষুধ দেন।

বর্তমানে চাঁদপুরের চিকিৎসা খাতের প্রধান সংকটগুলো কী কী?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : চাঁদপুর সদর হাসপাতালে অধিকাংশ চিকিৎসক পরিশ্রম করে কাজ করেন। কিন্তু কিছু দালালচক্র সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ভালো হবে না বলে দরিদ্র রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। এটি শুধু চাঁদপুরের সমস্যা নয়, দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালেও আছে। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। বর্তমান সিভিল সার্জন কয়েক বছর ধরে আছেন এবং তিনি সৎ ও দায়িত্বশীল। সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। চাঁদপুরে আশপাশের জেলার রোগীর চাপও বেশি। শরীয়তপুরের চারটি উপজেলা এবং লক্ষ্মীপুরের সীমান্তবর্তী কয়েকটি উপজেলার রোগীরা এখানে আসেন। তাঁর হিসাবে, চাঁদপুরের ২৫-৩০ শতাংশ রোগী অন্য জেলা থেকে আসেন। ফলে ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালে চাপ তৈরি হয়।

সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই একটি অভিযোগ থাকে যে, প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো চিকিৎসাসেবার চেয়ে ব্যবসার ওপর বেশি জোর দেয়। দায়িত্বশীল সংগঠক হিসেবে এই ধারণাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : এক-দুটি প্রতিষ্ঠানে এমন হতে পারে। তবে ৩২-৩৫ বছর ধরে চাঁদপুরের বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে দেখেছি, অনেক প্রতিষ্ঠান দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে সেবা দেয়। কেউ কেউ বেডের ভাড়াও নেন না। ডা. মিজানুর রহমান, ডা. আনোয়ার শেখ, ডা. গোলাম মাহবুব, ডা. মোবারকসহ অনেক চিকিৎসক জাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্র রোগীদের ওষুধ দেন। ডা. মিজানুর রহমানের উদ্যোগে বেসরকারি হাসপাতালেও জাকাতের অর্থের একটি অংশ দিয়ে ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। আমি মনে করি, বড় করপোরেট হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা খরচ অনেক বেশি হওয়ায় মানুষ ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা নিতে যায়। তবে বাংলাদেশে দক্ষ অনেক চিকিৎসক ও নার্স রয়েছেন এবং মাঝারি পর্যায়ের হাসপাতালগুলোও অনেক সেবা দিচ্ছে।

চাঁদপুরে অনেক সময় অনুমোদনহীন বা মানহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। আপনাদের সংগঠন বা সমিতির পক্ষ থেকে চিকিৎসার মান রক্ষা এবং এ ধরনের অনিয়ম রোধে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। বর্তমান সিভিল সার্জনও মানের বিষয়ে কঠোর এবং কয়েকটি নিম্নমানের ল্যাবরেটরি বন্ধ করেছেন। সংগঠনের কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স কমিটি সব প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ছোট ছোট কয়েকটি ক্লিনিক একত্র হয়ে বড় প্রতিষ্ঠান করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এতে ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কেনা সম্ভব হবে এবং মানসম্মত পরীক্ষা কম খরচে করা যাবে।

বর্তমানে চিকিৎসাসেবা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাটা বড় প্রশ্ন। প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষ যেন সুলভে মানসম্মত সেবা পায়, এ বিষয়ে আপনাদের কোনো উদ্যোগ রয়েছে কী?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : প্রতি মাসে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক মালিকদের নিয়ে সভা হয়। দরিদ্র রোগীদের সহযোগিতা করার জন্য তাঁদের বলা হয়। রোগীর সামর্থ্য না থাকলে অনেক সময় সম্মিলিতভাবে বিনা মূল্যে সেবা দেওয়া হয়। সরকারি হাসপাতাল থেকে কোনো রোগীর পরীক্ষা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এলে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়; কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনা মূল্যে করা হয়। আমার গ্রীন ডায়াগনস্টিকেও প্রতিদিন একাধিক পরীক্ষা দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে করা হয়। ভোক্তা অধিকারবিষয়ক রেট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের খরচ ১০০ টাকা এবং প্রস্রাব পরীক্ষার খরচ ২০০ টাকা করা হয়েছে।

রাজধানীর বাইরে জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে চাঁদপুর কতটা এগিয়েছে?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : চাঁদপুরে মেডিকেল কলেজ হওয়া বড় সৌভাগ্য। এখানে হৃদরোগ, স্ত্রীরোগ, চর্ম, নাক-কান-গলা, নিউরোমেডিসিন, মনোরোগ, অর্থোপেডিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ ও ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ১০-১৫ জনের মতো উচ্চশিক্ষিত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন। আগে এসব চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হতো। এখন চাঁদপুরেই অনেক চিকিৎসা পাওয়া যায়। বিভিন্ন হাসপাতালে উন্নত যন্ত্রপাতিও এসেছে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সরকারি খাতের পাশাপাশি প্রাইভেট খাত এখানে কতটুকু পরিপূরক ভূমিকা পালন করছে?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : আমার হিসাবে, সরকারি হাসপাতালগুলো প্রায় ৪০ শতাংশ রোগীকে সেবা দেয়। বাকি প্রায় ৬০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসাসেবা দেন বেসরকারি চিকিৎসক, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থান তৈরিতেও বেসরকারি খাতের ভূমিকা আছে। দরিদ্র রোগীর কথা বিবেচনা করে অনেক চিকিৎসক বিনা মূল্যে রোগী দেখেন। ডা. এ কে এম আজাদ, ডা. ফারুক পাঠান, ডা. দীন মোহাম্মদের মতো স্বনামধন্য চিকিৎসক সম্প্রতি চাঁদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন। ডা. সরদার আবদুল নাঈম বিভিন্ন জেলায় গিয়ে বিনা মূল্যে ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচার করেন। অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহসহ অনেক চিকিৎসক কম খরচে বা বিনা মূল্যে সেবা দেন।

আগামী দিনে চাঁদপুরের চিকিৎসাসেবা খাতকে আরও আস্থাশীল করতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনার কথা জানতে চাই।

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : চাঁদপুরে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল খুবই প্রয়োজন। গাছতলায় হাসপাতালটির জন্য জায়গা নির্ধারণের কথা রয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণে কিছু জটিলতা আছে। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। হাসপাতালটি হলে জেলার পাশাপাশি অন্য জেলা থেকে আসা রোগীদের চাপ সামলানো সহজ হবে।

চিকিৎসাসেবার খরচ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর ইতিহাস ভালোভাবে নেওয়া হলে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এড়ানো সম্ভব বলে আমি মনে করি। আমার অভিজ্ঞতায়, প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করলে দরিদ্র রোগীর ওষুধ কেনার টাকাও শেষ হয়ে যেতে পারে।

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়েও আমি আশাবাদী। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানো, টিকাদানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি করেছে। ইউনিয়ন পর্যায়েও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে সেবা পৌঁছেছে। ডেঙ্গু ও হাম নিয়ন্ত্রণে সমস্যা আছে, তবে সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এগুলোও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করি। যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ কমলে স্বাস্থ্য খাতেও আরও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

অবসর সময়ে কী করেন?

ডা. এস এম সহিদ উল্লাহ : টেলিভিশনে সংবাদ দেখি। অ্যানিমেল প্ল্যানেট আমার প্রিয়; প্রায় প্রতিরাতেই দেখি। ডিসকভারি চ্যানেলও দেখি। পৃথিবীর বৈচিত্র্য দেখতে ভালো লাগে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ আছে। ইউসুফ-জুলেখা, সুলতান সুলেমানের মতো ঐতিহাসিক নাটক বা চলচ্চিত্রও দেখি। বাংলা সংস্কৃতির প্রতি আমার গভীর টান রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলন আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ইতিহাস নিয়ে পড়ি এবং ইউটিউবেও বিভিন্ন বিষয় দেখি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়