বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৯

সনদনির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসা জরুরি

ড. সুলতান মাহমুদ রানা
সনদনির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসা জরুরি

কয়েক দিন আগে মাস্টার্সের ক্লাসে ঢুকে দেখি শিক্ষার্থীদের মন খারাপ। প্রাসঙ্গিকভাবে তাদের জিজ্ঞেস করলাম মন খারাপের কারণ। এর উত্তরে একজন শিক্ষার্থী বলল, ‘স্যার, প্রতিদিন চার-পাঁচটি ক্লাস হচ্ছে। আমাদের কি কাজ শুধু ক্লাস করা? আমরা কি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাব না?’ তার এই কথার মাঝে ছিল অনেক ক্ষোভ এবং হতাশার প্রতিচ্ছবি। তারা ধরেই নিয়েছে যে এই পড়াশোনার কোনো মূল্য নেই। ক্লাসে বসে যে চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় ব্যয় করছে এবং সেখান থেকে যা শিখছে তা বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর মতো সুযোগ আমাদের এই দেশ দিতে পারবে না।

এখানেই প্রশ্ন উঠে, তাহলে একটি বিষয়ে অনার্স করে এবং মাস্টার্স করে শিক্ষার্থীদের লাভ কী? সেই বিষয়টি যদি তার বাস্তব জীবনে কর্মে প্রবেশের সিঁড়ি না হয়, তাহলে তো তার মনে ক্ষোভ ও হতাশা জন্ম নেওয়াই স্বাভাবিক। শুরুতেই একটু কঠিন কথা দিয়ে লেখাটি শুরু করলাম। উল্লিখিত ঘটনাটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, সক্ষমতা এবং সামাজিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত হয়নি। এ ক্ষেত্রে একটি মৌলিক সমস্যা স্পষ্ট।

সেটি হলো আমাদের দেশে কাঠামো আছে, কিন্তু তার ভেতরে বাস্তবতার কোনো ভিত্তি নেই। বাংলাদেশে শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সক্ষমতা বা সমাজের প্রয়োজন মেটানোর কেন্দ্র হিসেবে খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। এখানে মূলত কৃত্রিম কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিখছে, কিন্তু সেই শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো দক্ষতা, মানসিকতা বা অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে না। এমনকি একটা পর্যায়ে এসে শিক্ষার্থীদের শেখার মানসিকতাও থাকছে না। তারা সব সময়ই ভাবছে যে এই পড়াশোনা তার বাস্তব জীবনের কোন কোন ক্ষেত্রে কাজে লাগছে।

একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি শিক্ষা। প্রাকৃতিক সম্পদ, সামরিক শক্তি কিংবা অবকাঠামো একটি দেশকে সাময়িকভাবে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে শুধু একটি দক্ষ, সৃজনশীল এবং জ্ঞানভিত্তিক জনগোষ্ঠী। এ কারণেই বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো শিক্ষাকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং সর্বোচ্চ লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই শিক্ষার মান, শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।

আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মনে প্রশ্ন, ‘পড়াশোনা শেষ করে কী হবে? চাকরি কি পাওয়া যাবে?’ এই প্রশ্নটি শুধু সাধারণ জনগণের মনের কথা তা নয়, বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের হতাশার মূল কারণ। এটিকে আমরা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখতে পারি। ইদানীং একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই বুঝে যায় যে দেশের কর্মসংস্থানের হাল খুবই খারাপ। পড়ালেখা শেষ করলেই যে কেউ চাকরি পাবে সেটি কেউ নিশ্চিত নয়। এখানে ডিগ্রি বাড়ছে, কিন্তু দক্ষতা বাড়ছে না। এমনকি এ কারণে দেশে শিক্ষিত বেকারও বেড়ে চলেছে। গত ২৬ জুলাই তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় চার কোটি। একটি চাকরির পদের বিপরীতে বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয় লাখ পর্যন্ত আবেদন জমা পড়ছে। এমন সংকটের পেছনে নানা ধরনের সমস্যা কাজ করছে।

বাংলাদেশে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এখনো প্রধান ধারা। শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করা, বিতর্ক করা, বিশ্লেষণ করা কিংবা নতুন ধারণা তৈরির পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় কিভাবে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, গবেষণামনস্কতা এবং সৃজনশীলতার বিকাশ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘটে না।

এর ফলে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যেখানে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল করলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান করতে, সিদ্ধান্ত নিতে কিংবা নতুন উদ্ভাবনী ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়। চাকরিদাতারা প্রায়ই অভিযোগ করেন, সনদধারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদের সংকট কমছে না।

শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রশ্নপত্র ফাঁসের সংস্কৃতি। গত এক দশকে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা কিংবা নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। প্রতিবারই সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করেছে, কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে অবৈধ পথ কখনো কখনো বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। এতে মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। একটি সমাজে যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সততা নয়, বরং অনিয়মই সফলতার পথ, তখন শুধু শিক্ষা নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতাও আজ বড় সংকট। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করলেও তাদের একটি বড় অংশ এমন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, যার সঙ্গে তাদের শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ ব্যাংকে চাকরি করছে, কেউ বিসিএস প্রস্তুতিতে বছর পার করছে, কেউ আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মূল উদ্দেশ্যই অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ফিনল্যান্ড বহু বছর ধরেই বিশ্বের অন্যতম সফল শিক্ষা মডেলের উদাহরণ। সেখানে শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে শেখানো হয় কিভাবে চিন্তা করতে হয়, কিভাবে প্রশ্ন করতে হয় এবং কিভাবে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে হয়। পরীক্ষার চাপ তুলনামূলকভাবে কম হলেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিশ্বমানের। সিঙ্গাপুর স্বাধীনতার পর প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব সত্ত্বেও মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে। শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি ভিয়েতনামও গত দুই দশকে শিক্ষার মানোন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নে তাদের শিক্ষার্থীরা অনেক উন্নত দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করছে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেন একই পথে এগোতে পারছে না? এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষা অনেক সময় রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকে না। অবকাঠামো নির্মাণ দৃশ্যমান ফল দেখায়, কিন্তু শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল পেতে সময় লাগে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি সাফল্যকে অনেক সময় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষানীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। সরকার পরিবর্তন, নীতিগত পরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বহু ভালো উদ্যোগও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয় না। তৃতীয়ত, শিক্ষার সঙ্গে শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের কার্যকর সংযোগ এখনো দুর্বল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক ক্ষেত্রে এমন বিষয় পড়ানো হয়, যার সঙ্গে শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সমন্বয় সীমিত। ফলে ডিগ্রি ও দক্ষতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়। চতুর্থত, গবেষণাকে এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বেশির ভাগ উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে গবেষণা তহবিল, গবেষণা অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখনো প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষাকে অনেক সময় শুধু পরীক্ষা, সনদ এবং চাকরির মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। অথচ প্রকৃত শিক্ষা একজন মানুষকে যুক্তিবাদী, সহনশীল, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। একটি সমাজে যদি শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু নম্বর ও সনদে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে সেই সমাজে উদ্ভাবন, নেতৃত্ব এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী, গবেষণাভিত্তিক এবং দক্ষতাকেন্দ্রিক শিক্ষা বিস্তৃত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে শিল্প ও শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের তরুণদের হাত ধরেই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্ধারিত হবে।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়