প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৭
ধারাবাহিক স্মৃতিকথা
বড়বেলার স্কুলজীবন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
মাস্টার্স শেষ করে চাকরিতে ঢুকেছিলাম। কোরিয়ায় আসার পূর্বে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, নারায়ণগঞ্জে। একটা প্রশিক্ষণে নাম আসলো আমার। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা গেলাম প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করার জন্য। প্রশিক্ষণ চলাকালীন দুপুর একটার দিকে আমার ব্যাচমেট তিথি, আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা লিংক পাঠালো। লিংক-এর সাথে আবার লিখে দিয়েছে, আপু, অ্যাপ্লাই করুন। আমি প্রশিক্ষণের ক্লাস শেষ করে তিথিকে কল দিলাম। তিথি কল পেয়ে পেয়ে বললো, কোনো কথা নেই আপু, আপনি লিংকে ঢুকে দেখুন কী কী লাগবে, আর অ্যাপ্লাই করুন। আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৪ ফেব্রুয়ারি আবেদনের শেষ তারিখ। যেভাবেই হউক অ্যাপ্লাই করুন। লিংকটি ছিলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া কোইকার স্কলারশীপ। তিথি আরও আগেই ওসএইড-এর স্কলারশিপ পেয়ে বসে আছে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমাবে আরেকটা মাস্টার্স করবে বলে। ও যখন ওসএইড এ অ্যাপ্লাই করেছিলো তখন আমাকে বলেছিলো কিন্তু আমার তখন আবেদন করা হয়ে উঠেনি।
প্রশিক্ষণে দুপুরের খাবারের বিরতিতে ভালোভাবে খাবার না খেয়েই জনপ্রশাসনের ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখলাম আমার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ থেকে স্বাক্ষরকৃত অনুমতিপত্র লাগবে। তখন আমার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আমার শ্রদ্ধেয় জেলা প্রশাসক জনাব মো. মনজুরুল হাফিজ স্যার। আমি স্যারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলাম। স্যার তখন খুব আন্তরিকতার সাথে বিস্তারিত জানতে চাইলেন, আমি কোন বিষয় নিয়ে পড়বো, কতদিনের কোর্স, পরিবার আমার সাথে থাকার সুযোগ পাবে কি না ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। সব শোনার পর স্যার বললেন, কোরিয়া খুব সুন্দর, ভালো দেশ, যাও, পড়াশোনা করে এসো। আর আবেদন করে সহকারী কমিশনার (গোপনীয়)-এর কাছে পাঠিয়ে রাখো, আমি স্বাক্ষর করে দিবো। সহকারী কমিশনার (গোপনীয়), যে স্যারের প্রতিদিনকার সকল সিডিউলসহ জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ কাজসমূহের খেয়াল রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। স্যারের কথায় খুব ভরসা পেলাম। আবেদনপত্র ই-মেইল করে পাঠালাম। সহকারী কমিশনার (গোপনীয়)-এর সাথে যোগাযোগ করলাম। সে আমার জুনিয়র। অসম্ভব ভালো ছেলে। সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে সে কাজটি করেছে। স্যারের কাছে আমার আবেদন দিলে স্যার সেটিতে স্বাক্ষর করার পর সহকারী কমিশনার (গোপনীয়) ফিরতি মেইলে আমাকে পাঠিয়েছিলো।
যে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করছিলাম তখন সেটি ছিলো বেশ কঠোর প্রশিক্ষণ। বাজেট ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট (বিএমএস) কোর্স। ঢাকার সেগুনবাগিচায় আইপিএফ এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে। কোনো ছুটির কথা বলাই বাহুল্য, পরীক্ষা আর পড়াশোনার চাপে শ্বাস ফেলা কঠিন। এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আনুষঙ্গিক কাগজপত্রসহ আবেদন জমা দেয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করে দেয়া ছিলো। কীভাবে যে সব কিছুর ব্যবস্থা করে ফেললাম সেটা বুঝতেই পারিনি।
জিয়নজু গ্রামে যাচ্ছি। ইসাডোরার স্বামী এসেছেন কেডিআই ডরমিটরি থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমরা চারজন যাচ্ছি। বাকি তিনজন আফ্রিকার তিনটি দেশের— ঘানা, ক্যামেরুন, লাইবেরিয়া। ক্যামেরুনের যে বন্ধুটি আছে সে তার উপজাতির রাজা হওয়ার সিরিয়ালে আছে। সেও আমার সাথে একই বৃত্তি নিয়ে পড়তে এসেছে। তবে আরেকটি বিষয় হলো এই তিনজনের মধ্যে একজন বহুদিন ধরে আমার সাথে অন্য রকম সখ্যতা গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমি সাফ না করে দেয়ার পরেও তিনি চেষ্টারত আছেন। সময়ে সময়ে আমাকে বাজার সদাই পর্যন্ত কিনে এনে দিয়েছেন। আমি তার আবেগকে শ্রদ্ধা করি কিন্তু কেন যেন তাঁর সাথে আমার মনের মিল হয় না।
সাউথ দেইজংয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ইসাডোরার স্বামী একটি স্টেডিয়াম দেখিয়ে বললো, এই সেই স্টেডিয়াম যেখানে জাপান ও কোরিয়ার ফুটবল খেলা হয়েছিল। দেখে ভালোই লাগলো। গাড়িতে বসে রাস্তায় ঘটে যাওয়া নানা রকম কর্মকাণ্ড, প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে গান শুনতে আমার দারুণ লাগে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ২৪ ঘন্টা চলন্ত গাড়িতে বসে থাকি। কোরিয়ার রাস্তাঘাট এতো পরিষ্কার, গুছানো ও ছিমছাম দেখতেই ভালো লাগে। গাড়িতে চড়ে কোনো ক্লান্তি আসে না কারণ কোনো ঝাঁকি হয় না। অন্যদিন গান শুনলেও আজ বের হওয়ার সময় একটা বইয়ের অডিওবুক ডাউনলোড করে নিয়ে এসেছি। ওটা শুনছি। প্রায় ৫ ঘন্টার অডিওবুক। কানে এয়ারপড লাগিয়ে উচ্চ ভলিউম দিয়ে রেখেছি। আমি বসেছি ড্রাইভারের পাশের সিটে। সব কিছু খোলামেলা দেখা যাচ্ছে, তাই সবকিছু দেখতে আরও স্বস্তিদায়ক লাগছে। বাংলাদেশে গাড়িতে করে অফিসে যাওয়ার সময় বেশ কিছু প্রটোকল মানতে হয়। যেমন অফিসার ড্রাইভারের পাশে বসবেন না, তিনি বসবেন ড্রাইভার যে সিটে বসেছেন তার ঠিক পিছনের সিটের পাশের সিটে। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসবেন বডিগার্ড বা কোনো অফিস সহায়ক। যেহেতু আমি এই দেশে পড়াশোনা করতে এসেছি তাই এসব প্রটোকলের কোনো ব্যাপার স্যাপার নেই। তাছাড়া এখানে সবাই নিজেই নিজের গাড়ি ড্রাইভ করেন। গাড়িতে বসে বসে বই শুনছি আর মারসিডিস বেঞ্জ, ল্যান্ড রোভার, টেসলা এসব গাড়ির শো-রুম দেখছি। নিউজ পেপার প্রিন্টিং ফ্যাক্টরি, সোফা ও বেড-এর শো-রুম, গ্রান্ড হিলস্টোন হোটেল এবং পরপর আরও কতগুলো হোটেল দেখলাম। গাড়ির শো-রুম দেখার সাথে সাথে ইসাডোরার স্বামী বললেন কোরিয়ায় একটি গাড়ি সর্বোচ্চ ১৫ বছর ব্যবহার করা হয়, তারপর অন্য গাড়ি কেনা হয়। ইচ্ছে করছিলো জিজ্ঞেস করি ১৫ বছর পরে ঐ গাড়িগুলো কী করা হয়! কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়নি, কারণ অডিওবুকটা খুব মনে ধরে আছে, শুনতে ভালো লাগছে, কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া ব্রাদার গিল ইংরেজি একটু কম বুঝেন, তাকে বুঝাতে একটু সময় লাগবে। আরেকটা বিষয় হলো, তিনি নিজে আমার কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারলে সেটা রেখে দেন তাঁর স্ত্রী ইসাডোরার জন্য। গাড়িতে বসে থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা আর বই শুনতে শুনতে কখন যেনো ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারিনি। ঘুম ভেঙে ইসাডোরার স্বামীর দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলাম সে তার সোয়েটার উল্টো পরেছে, অর্থাৎ সামনের গলা পিছনের দিকে আর পিছনেরটা সামনে। সাধারণত উল্টো পালটা কিছু দেখলে বিরক্ত লাগে আমার, সাথে সাথে ঠিক করে দেয়ার চেষ্টা করকিন্তু এবার সোয়েটার নিয়ে কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না, শুধু এক নাগারে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম আর বললাম, আপনি কি খুব তাড়াহুড়ো করে বের হয়েছেন আজ? গাড়ি থামলো একটা জ্বালানির পাম্পে। কোরিয়ার জ্বালানির পাম্প গুলোতে সাধারণত ড্রাইভার নিজেই জ্বালানি নেন, আর নিজেই কার্ড দিয়ে জ্বালানির মূল্য পরিশোধ করেন। সাহায্য করার জন্য অন্য কেউ থাকে না। ইসাডোরার স্বামী গাড়িতে জ্বালানি নিলেন, তারপর গাড়িটা একটু খালি জায়গায় দাঁড় করিয়ে কোথায় যেন চলে গেলেন। দুই মিনিটের মধ্যে ফেরত আসলেন। খেয়াল করে দেখলাম, এবারে সোয়েটার ঠিকঠাক আছে। আমি মনোযোগ দিয়ে আছি অডিওবুকে।। অডিওবুকটার নাম হলো “ইউ ক্যান হিল ইয়োর লাইফ”, লিখেছেন লুইস এইচ. হে। নাম শুনেই বুঝা যাচ্ছে জীবন নিয়ে লিখা বিশেষ জরুরি বই। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে বইটা শুনে। কী নেই এই বইতে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা যত ধরনের সমস্যায় পড়ি তার প্রায় সব কিভাবে সমাধান করা যায় সেটা লেখক ভালোভাবেই বর্ণনা করেছেন। আমি মুগ্ধ।
লাঞ্চের সময় হয়ে এলো। গাড়ি পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে থামলো এসে একটা রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টের নাম হলো, সয়াবিন স্যুপ রেস্টুরেন্ট। বিশেষ নামকরা রেস্টুরেন্ট। আমরা পাঁচজন মিলে ঢুকলাম রেস্টুরেন্টে। পছন্দসই টেবিলে বসলাম। একটা রোবট এসে সাইড ডিস দিয়ে গেলো। সাইড ডিসের মধ্যে সাধারণত থাকে বিভিন্ন রকমের কিমচি। কিমচি কোরিয়ানদের প্রিয় খাবার। অনেকটা আচার ধরনের খাবার। কিছু কিছু কিমচি দারুণ লাগে তবে আমি কাঁচা শুটকি বা সিদলের মতো একটা আঁশটে গন্ধ পাই। তাই মাঝে মাঝে হালকা পাতলা একটু বিরক্ত লাগে কিন্তু উপায় নেই। খেয়ে নিই সবকিছু। আমি খেয়াল করে দেখলাম, প্রায় সব রেস্টুরেন্টে মেইন ডিসের তুলনায় সাইড ডিস আমার বেশি ভালো লাগে। এবার পাঁচটি সয়াবিন স্যুপ অর্ডার করা হলো। রোবট চলে এলো সয়াবিন স্যুপ নিয়ে। রেস্টুরেন্টে সাইড ডিস ফ্রি। যত ইচ্ছে তত খাওয়া যায়। স্যুপ খাওয়া শুরু করলাম। খারাপ লাগছে না। তবে আহামরি বিশেষ ভালোও লাগছে না। স্যুপের সাথে আলাদা একটা বাটিতে একটা ডিম দেয়া আছে। ডিমের কুসুমটা একদম হলুদ। দারুণ সুন্দর, আকর্ষণীয়। ডিমের কুসুম মনে হচ্ছে কাঁচা। আমার ধারণা বাটিটা গরম করে তাতে কাঁচা ডিমটা ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে, ঐ বাটির গরমে ডিমটা যা সিদ্ধ হয়েছে সেটাই। ডিমের সাদা অংশটা বাটির সাথে লেগে আছে। আমি স্যুপ থেকে অল্প অল্প করে স্যুপ ঐ ডিমের বাটিতে তুলে নিয়ে তারপর ডিমের বাটি থেকে তুলে স্যুপ খাচ্ছি। এবার খেতে বেশ ভালোই লাগছে। প্রতিটি খাবার খাওয়ার কিছু সাধারণ নিয়ম থাকে তবে ব্যক্তিবিশেষ তার পছন্দসই খাবারের নিয়ম তৈরি করতেই পারে। আমিও তেমন আমার রুচিমতো একটা পদ্ধতি বের করে নিয়েছি। পেটপূর্তি হয়ে গেছে আমার। বাকিদেরও খাওয়া শেষ।
রেস্টুরেন্টের উপরেই দুতলায় একটা সয়াবিন মিউজিয়াম আছে। আমরা সবাই গেলাম মিউজিয়ামে। এই মিউজিয়াম এবং সয়াবিন স্যুপ এর একটি গল্প আছে। গল্প হলেও সত্যি। গল্পটা হলো এমন- এক মহিলার বিয়ে হয় এক পুরুষের সাথে। সেই পুরুষের উপর ঐ মহিলার ভরপোষণের দায়িত্ব থাকলেও তিনি তার দায়িত্ব পালন করেন নি। মহিলা খেয়ে না খেয়ে থাকতেন। তারপর থেকে কোনোভাবে সয়াবিনের ব্যবস্থা করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সয়াবিন স্যুপ খেতেন। তার জীবদ্দশায় তিনি এই সয়াবিন স্যুপের রেস্টুরেন্ট দিলেন, তখন থেকেই এই রেস্টুরেন্ট বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। অন্যান্য রেস্টুরেন্টেও সয়াবিন স্যুপ বিক্রি করা হয় কিন্তু আমরা যেখানে গিয়েছি সেটাই আদি সয়াবিন স্যুপ কিন্তু দাম প্রায় অর্ধেক তাই এই রেস্টুরেন্টের রমরমা ব্যবসা। দুতলায় মিউজিয়ামে গিয়ে এই কাহিনী জানতে পারলাম। মিউজিয়ামটি খুব বড় নয়, তবে আয়নার ব্যবহার ছোট্ট একটি রুমকে অনেক বড় আকারে দেখাচ্ছে। ওয়ালে বিভিন্ন ফ্রেমে সয়াবিনের জীবনপ্রণালী বর্ণনা করা আছে। আবার বড় ডিসপ্লেতে সয়াবিন স্যুপ তৈরির ভিডিও দেখানোর ব্যবস্থাও আছে। দেখে বেশ ভালোই লাগলো। ভিডিও করলাম, ছবিও তুললাম।
হীরামনি : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান।
(চলবে, পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)








