প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১১
প্রাণচাঞ্চল্যে সাহিত্য সভা: আলোচনায় জসীমউদ্দীন ও সুকুমার বড়ুয়া

কথার শব্দ আর অক্ষরের গাঁথুনিতে মানুষের বিচিত্র আমেজ অনুভূত হয়। কবিতা ও গল্পের শব্দের প্রাণখোলা ধ্বনিতে গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির অষ্টম সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবি-লেখকদের স্বরচিত লেখা পাঠ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে এটি ছিল মূলত লেখা শানিত করার একটি পাঠশালা। একাডেমির বর্তমান পর্ষদের দায়িত্বশীলতা ও দেশের খ্যাতিমান সাহিত্যবোদ্ধাদের অন্তর্দৃষ্টিতে চাঁদপুরের সাহিত্য সমাজ আজ এক অনন্য উচ্চতায়। দৈনিক সাহিত্য আড্ডা ও মাসিক সাহিত্য সভার নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় কবিমানসে নিত্যনতুন কবিতা ও গল্পের প্ল্যাটফর্ম উঁকি দিচ্ছে।
সাহিত্য সভার উল্লেখযোগ্য সূচির মধ্যে ছিল চলতি মাসে চাঁদপুর ও দেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের জন্ম ও মৃত্যু দিবস উপলক্ষে তাঁদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন। একাডেমির এই আয়োজনের মাধ্যমে প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের স্মৃতি অম্লান রাখা হয়। ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন চাঁদপুরের কৃতী সন্তান এবং জেলার প্রথম বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক আবদুর রশিদ খান। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ষাটটি। ‘নতুন কবিতা’ (১৯৫০), ‘বন্দী মুহূর্ত’ (১৯৫৯), ‘মহুয়া’ (১৯৬৫), ‘অনির্দিষ্ট স্বদেশ’ (১৯৭০) এবং ‘সমস্ত প্রশংসা তাঁর’ (১৯৮০) তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।
সভার বিশেষ আলোচক এবং সাহিত্য একাডেমির পরিচালক (গ্রন্থাগার, সেমিনার ও শিশুসাহিত্য) আশিক বিন রহিম তাঁর সাবলীল আলোচনায় বলেন, আবদুর রশিদ খানকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাঁর গ্রন্থের মাধ্যমে প্রথম তুলে ধরা হয়েছে। তিনি চাঁদপুরের এই গুণীজনের সাহিত্যকর্ম স্মরণ করিয়ে দেন। উল্লেখ্য, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আবদুর রশিদ খান মৃত্যুবরণ করেন।
গণমানুষের কবি ও পল্লীকবি জসীমউদ্দীনকে নিয়েও সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। “আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা / ফুল তুলিতে যাই / ফুলের মালা গলায় দিয়ে / মামার বাড়ি যাই...”এমন সব অমর পঙ্ক্তির মাধ্যমে গ্রামীণ জীবন, ষড়ঋতু ও শৈশবের আনন্দ গাঁথা পল্লীকবি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন। কলেজে পড়ার সময়ই ‘কবর’ কবিতা রচনা করে তিনি ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেন এবং ছাত্রাবস্থাতেই কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়। মাইকেল মধুসূদন ও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনের পাশাপাশি জসীমউদ্দীনের শব্দমালা সাধারণ মানুষের জীবনমানের সাথে মিশে যাওয়ায় তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা পান। পাঠকগণ প্রফুল্লচিত্তে পড়েন “ওইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে / তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে” (কবর)। ১ জানুয়ারি তাঁর জন্মদিবসকে স্মরণীয় করতে একাডেমির সাধারণ সদস্য, অনুবাদক ও শিক্ষক জাহিদ নয়ন অত্যন্ত সচেতনভাবে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সাহিত্য ও কবিমানস ফুটিয়ে তোলেন।
বিশিষ্ট ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়াকে নিয়েও সভায় আলোকপাত করা হয়। ৫ জানুয়ারি ১৯৩৮ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণকারী এই সাহিত্যিক পেশাগত জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ছিলেন। হাস্যরসের মাধ্যমে সমাজ সচেতনতা, অসংগতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম তিনি তাঁর ছড়ায় ফুটিয়ে তুলেছেন। সহজ ভাষায় তিনি লিখেছেন “এমন যদি হতো / ইচ্ছে হলে আমি হতাম প্রজাপতির মতো...”। ৮৮ বছর বয়সী এই ছড়া সম্রাট ২ জানুয়ারি ২০২৬ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে আলোচনা করেন একাডেমির সাধারণ সদস্য ও ছড়াকার আশরাফুল কাজী রাসেল।
সভায় স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন একাডেমির সদস্য ও ‘নীলকমল’ ছোটকাগজের সম্পাদক ইমরান শাকিব ইমর, মোহাম্মদ হানিফ, প্রবীণ কবি আমির আলী চৌধুরী, খোরশেদ আলম জিকু এবং তরুণ লেখক খায়রুল আলম। গল্প পাঠ করেন মাইনুল তোহা। স্বরচিত লেখার ওপর গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া জানান নির্বাহী সদস্য নূর নাহার মুন্নি ও ইয়াছিন দেওয়ান। সভায় আরও বক্তব্য রাখেন সুধীর বরণ মাঝি, সুমন কুমার দত্ত এবং চাঁদপুর সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ম. নুরে আলম পাটোয়ারী।
সাহিত্য একাডেমির পরিচালক (সাহিত্য ও প্রকাশনা) মাইনুল ইসলাম মানিক আগত লেখকদের সামগ্রিক মূল্যায়ন করেন। পরিচালক (গবেষণা) মুহাম্মদ ফরিদ হাসান তাঁর বক্তব্যে আশা প্রকাশ করেন যে, লেখালিখির এই ধারাবাহিকতায় চাঁদপুরের লেখকরা অচিরেই বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অন্যান্য শীর্ষ পুরস্কারে ভূষিত হবেন। একাডেমির মহাপরিচালক কাদের পলাশ জানান, নিয়মিত সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি একাডেমির ভবন নির্মাণকাজের প্রস্তুতি চলছে।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী অজিত দত্ত সাহিত্য একাডেমিকে একটি দৃষ্টিনন্দন ছবি উপহার দেন এবং নতুন ভবনের সৌন্দর্যবর্ধনের আশ্বাস দেন। এতে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন মিলনায়তন করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ ব্যক্তিত্ব মাহমুদ হাসান খান, স্বপন ভঞ্জ, নির্বাহী সদস্য উজ্জ্বল হোসাইন এবং আরিফুল ইসলাম শান্ত।
সাহিত্য একাডেমির সহ-সভাপতি আবদুল্লাহিল কাফীর সভাপতিত্বে এবং কার্যনির্বাহী সদস্য মোখলেছুর রহমান ভূঁইয়ার প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অতিথিরা সাহিত্যের এক চমৎকার পরিবেশ উপভোগ করেন। সবশেষে ‘উমেদ আলী ভূঁইয়া স্মৃতি সংসদ’-এর পক্ষ থেকে সেরা আড্ডারু হিসেবে চিত্রশিল্পী অজিত দত্ত, খোকন মজুমদার ও খোরশেদ আলম জিকুকে পুরস্কৃত করা হয়। বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন লেখক ও সাংবাদিক আসাদুল্লাহ কাহাফ এবং নবীন আড্ডারু মোহাম্মদ আনিচ।








