শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৫

ধারাবাহিক উপন্যাস-৩১

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

‘দাদা ডায়েরিটা কখনো কী পড়া হয়েছে আপনার?’

‘না সুযোগ হয় না আবার বলতে পার ইচ্ছেও জাগে না।’

‘তাহলে লিখে লাভ কী?’

‘কেউ কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করে আর আমি ডায়েরি লিখে। নিজের কথা কাউকে বলে যেমন হালকা অনুভূত হয় তেমনি আমি সেই অনুভবটা পাই ডায়েরিতে।’

‘আপনি যদি ডায়েরি পড়েনই না তাহলে অযথা লিখে কী লাভ দাদা? এতে শুধু কাগজ আর কালি নষ্ট হয়, কোনো লাভ নেই।’

‘অনিমেষ জীবনের অনেক কিছুতেই লাভ-লস দেখতে নেই, এগুলোর বাইরেও কিছু বিষয় থাকে যেখানে প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়। আমার সেটাই প্রয়োজন বুঝলে।

হাসি-আনন্দ আর নিজেদের নিয়ে দুটো দিন কীভাবে কেটে গেল বুঝতে পারিনি। শত বেদনার মাঝে আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকার নামই জীবন, নরেন্দ্রদা বেশ ভালো করেই শিখিয়ে দিল। আমরা কেহই স্বয়ং সম্পূর্ণ না তবুও এ অপূর্ণতার মাঝে বেঁচে থাকার উপকরণ খুঁজে নিতে হয়। গতরাতে বোতলটা শেষ করতে পেরেছি অবশেষে কিন্তু অনিমেষের সিগারেটের প্যাকেট এখনো শেষ হয়নি। চেইন স্মোকার হলে এই কয়টা সিগারেট শেষ করে ফেলত আগেই যদিও সে কম সিগারেট টানে। সারোয়ার এখন আমার ভালো জুটি। এখানে আসার পর দাবা কম খেলা হয় তবু দাবার বোটে এখনো আমরা জিততে পারিনি নরেন্দ্রদার সাথে। আমাদের আজ কক্সবাজার ফিরে যাওয়ার দিন। বিকেলে ক্রুজ শিপের মধ্যে সেই একইভাবে চিপস ছিটিয়ে বক, বালিহাঁস ও পানকৌরিদের ইনভিটেশন দিয়ে টেকনাফ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় টেকনাফ জেটিতে আসার আগেই ওরা অন্যত্র উড়ে গেল। রাত আটটার মধ্যে চলে আসি কক্সবাজারে। রীসোর্টে এসে আমাদের ক্লান্তি যেন পিছু ছাড়ছে না। পরদিন কোথাও যাওয়া হয়নি তারপর অনিমেষ বলেÑ

‘আমাদের কক্সবাজার জেলায় দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে দেখা প্রয়োজন।’

‘ঠিকই বলেছ অনিমেষ। আমরা তাহলে কাল রামু বৌদ্ধ বিহার দেখতে যাই। ভোরে বৌদ্ধ বিহার দেখব পরবর্তীতে যাব মহেশখালি।’

‘মহেশখালির পান নাকি বেশ সুস্বাদু? চেখে দেখতে হবে।’

‘এগুলো পাহাড়ী পান তাই আমাদের ওসব অঞ্চলের পানের মতো হবে না। পানগুলো বেশ পুরুত্ব ও ঝাল ঝাল ভাব আছে। হুট করে খেলে ভালো নাও লাগতে পারে আবার কিছুদিন খাও অভ্যাস হয়ে যাবে।’

বিগত দিনগুলো কীভাবে কেটে গেল তেমন একটা টের পাইনি। ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে আসছে। আমরা যথারীতি রামু বৌদ্ধ বিহার দেখলাম অসাধারণ লাগল। এখানে বৌদ্ধদের প্রায় ৩৫টি মন্দির রয়েছে আবার একটা মন্দিরের নাম স্বর্ণ মন্দির, বেশ নীরব আর শান্ত ওখানকার পরিবেশ। অস্থিরতা ভুলে মনটা যেন শীতল হয়ে আছে এই শান্ত পরিবেশ পেয়ে। বুদ্ধিস ভিক্ষুরা উপাসনায় থাকলে কথা কম বলে বা বলে না। গেরুয়া পোশাকধারীদের জীবনমান অনেক সরল ও সাবলীল। কয়েকজনের সাথে কথা বলে ওদের বিষয়ে আরো কিছু জানা গেল। “জীব হত্যা মহাপাপ” এটাকে জীবনের মূলমন্ত্র মেনে নিয়ে ওরা কোনো জীবিত প্রাণী খায় না। যেমন মাছ বা মুরগি আমরা জবাই করি ওরা সেটা না করে অপেক্ষা করবে কখন মরবে তখন সেটা খাবে। অদ্ভুত তাদের জীবন প্রণালি যা আমাদের কাছে অসামঞ্জস্য হলেও ওদের কাছে এটা স্বাভাবিক। এখানে উত্তর মিঠাছড়ি পাহাড়ের চূড়ায় ১০০ ফুট লম্বা গৌতমবুদ্ধের সিংহ শয্যা মূর্তি দেখে আমরা থমকে দাঁড়াই। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেল এটা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় মূর্তি। তারপর সেখান থেকে ফিরে পরদিন যাওয়া হয় মহেশখালী দ্বীপে। যাওয়ার সময় স্পিডবোটে করে যেতে বেশ লাগছিল আর মনে একটু ভয়ও ছিল। নদী পেড়িয়ে সাগরের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় স্পিডবোটে করে। এত হালকা বোট নিয়ে সাগরের ঢেউ কীভাবে সামাল দিয়ে এগোবে সেটাতেই শঙ্কিত ছিলাম কিন্তু সাগরে ঢেউ না থাকায় ভয় থাকলেও টেনশন ছিল না তেমন। আমরা সেখানে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করি। অনিমেষ সহকারে বাকিদের নিয়ে আদিনাথ মন্দিরের ভিতর যাওয়া হয়। সেখান থেকে বের হয়ে চলে যাই সোনাদিয়া দ্বীপে এটা মহেশখালী থেকে একটা খাল দ্বারা পৃথক হয়েছে যেখানে তিন দিক দিয়েই সমুদ্র। সাগর লতায় ঘেরা বালিয়ারি, কেয়া নিশিন্দার ঝোপঝাড় আর বিভিন্ন ধরনের জলজ পাখিদের আনাগোনায় দ্বীপটা বেশ লাগছিল। আমরা কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে সেখান থেকে ফিরে আসি। আমাদের কক্সবাজার ফিরতে হবে আবার জোয়ার আসলে ফিরে যাওয়া অনেকটা রিস্কি হয়ে যায় তাই দেরি করিনি। সময়মতো ফিরে এসে কক্সবাজার পৌঁছায় সকলে যেন প্রাণ ফিরে পেল। আজ একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম আমরা আজও বেঁচে থাকার জন্য মরিয়া যেখানে জীবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যু চিন্তায় বিভোর থাকি। মরার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা কেহই মরতে চাই না। এই যে পিটার বলে মরে গেলেই বেঁচে যেত সেও তো আজ ভীত ছিল। নিজে নিজে ভাবছি আর হাসছি আমরা যতই মুখে মরে যাওয়ার কথা বলি কিন্তু মরাটা এত সহজ নয় কারণ নিজের অজান্তেই আমরা বাঁচতে চাই প্রতিনিয়ত আর এটাতেই আমরা অভ্যস্ত। লাইফ ইজ এ গেইম আর যখনই মরে যাব গেইম আউট। সেদিন রাতে যাওয়া হয় রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড। শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঝাঁউতলা এলাকায় এটা অথচ এখান দিয়ে বেশ কয়েকবার আসা যাওয়া হয় বুঝতে পারিনি। অটোড্রাইভার আমাদের আলোচনাগুলো কান পেতে শোনার পর বলেÑস্যার আপনারা রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড ঘুরে আসুন মজা পাবেন। সেখানে গিয়ে কী দেখব বলায় সে আমাদের বিস্তারিত বলে। সকলে সম্মত হই যাওয়ার জন্য তখন অটোরিকশা ড্রাইভার আমাদের নিয়ে সেখানে নামিয়ে দিয়ে আসে। ভিতরে প্রবেশ করার পর অসাধারণ লাগল আমাদের যেন সমুদ্রের তলায় এসে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দেখছি। সামুদ্রিক হাঙ্গর, কচ্ছপ, জেলি ফিস, স্টার ফিস, লগষ্টার, বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়াসহ অনেক জলজ প্রাণীর দেখা মিলে যার বৈজ্ঞানিক নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে মৎস গবেষণার জন্য মাছের প্রজাতিগুলো পরিচর্যা করছে মনে হয়। অবশেষে সময়টা বেশ কাটল আমাদের ভয়ের অধ্যায় শেষে।

১৮.

বিশাখাকে তেমন একটা বুঝে উঠতে পারি না। মেয়েটা মাঝে মধ্যে এতটাই জেদি হয়ে যায় যে তার সাথে পেরে ওঠা যায় না আর তখন তার সাথে মিলিয়ে নেওয়া বেশ কষ্টকর। কোন বিষয়ে প্রসন্ন আবার কোনটায় অভিমানী বুঝে উঠতে পারি না। আমাদের বন্ধুত্বটা সেই প্রাচীন সময় থেকে অথচ একে অপরে বুঝতে পারার বিষয়ে আজও আমি অপরিপক্ক। হয়তো কাউকে বোঝার মতো সে ক্ষমতা আমার নেই। সে বলে আমি মাঝে মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাই অথচ আমার সেটা মনে হয় না। নিজের বিষয়ে ভাবতে চাওয়া কী আত্মকেন্দ্রিক হওয়া, এটা কেমন কথা! ওর পাণ্ডিত্য ঝাড়ার একটা স্বভাব আছে এটা আমার জানা সেই ছোটবেলা থেকে আর সেজন্যই তো তাকে জ্ঞানপাপীদের দলে বিবেচনা করি। তবে মেয়েটা বেশ মিশুক আর আমার কাছে খোলা ডায়েরির মতো তার জীবন। একটা সময় ছিল যখন তার কথাগুলো আমাকে কিছু না বললে স্বস্তি পেত না, পেটের কথাগুলো যেন তাকে পীড়া দিত। ওর ভালো লাগা, ভাবনা, অনুভব ইত্যাদি সকল কিছু আমার সাথে শেয়ার করত একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো কিন্তু আমার এগুলোতে আগ্রহ কম ছিল। আমাদের মাঝে এই একটা বিষয়ে পার্থক্য আর এখানেই আমরা আলাদা। মা মারা যাওয়ার পর আমার ভালোবাসার মানুষের কমতি হয়নি। মাতৃহারা ছেলে বলে সকলেই ভালোবাসত বা বলতে গেলে একপ্রকার করুণা করত কিন্তু আশপাশের ভালোবাসায় মায়ের ছোঁয়া পেতাম না কারণ মা তো মা, মায়ের মমতার সাথে অন্য মমতা বা ভালোবাসার কভু তুলনা হয় না। এই অবেলায় এখন কল করল কে? ফোন তুলতেই বিশাখার গলা ভেসে আসল।

‘হ্যালো, কেমন আছ?

‘ভালো’

‘তুই কেমন আছিস?’

‘এই আছি আর কী এক প্রকার ভালোই বলতে পার।’

‘জানিস এখন বসে বসে তোর কথাই ভাবছিলাম আর অমনি তুই কল দিলি।’

‘পরম সৌভাগ্য আমার তা কী কী ভাবলে শুনি?’

‘সেটাও তোকে বলা লাগবে? আচ্ছা তুই সবসময় আমার সাথে ঝগড়ার মুড করিস কেন বল তো? আমার সাথে ঝগড়া করে তুই শান্তি পাস।’

‘হা হা হা...আরে না ঝগড়া করব কেন। তুমি তো ঝগড়াটে না তাই তোমার সাথে ঝগড়া করে লাভ নেই, মজা পাওয়া যায় না। ঝগড়া করার জন্য পক্ষে বিপক্ষে দুজনেরই দক্ষতা থাকা চাই।’

‘তাই! আচ্ছা বাপি কী ফিরেছে?’

‘আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন তুমি নিজেই খোঁজ নিতে পার।’

‘তা পারি বটে তবে সমবয়েসিদের সাথে গেছে আনন্দ-ফুর্তি করে সময়টা কাটাক তাই বারংবার নক করে বিরক্ত করি না।’

‘না ফেরেননি তবে গতকাল আমাকে নক দিয়েছিলেন পাথরের নেকলেস সেট কিনে দিবেন বলে আর সেটা কোন কালার হবে জানার জন্য। আমি তখন জিজ্ঞেস করেছি কখন আসছেন কাকাবাবু উনি বলেছেন দু এক দিনের মধ্যেই ফিরবেন।’

‘খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাক করছে কী না কে জানে। যাদের সাথে গেছে সকলের একই অবস্থা। একজন অসুস্থ্য হয়ে গেলে অন্যজনের সামলে নেওয়াটা ঝামেলা হয়ে যাবে।’

‘তুমি টেনশন নিও না উনারা গেছেন একসাথে আর একে অপরের প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল তাই কোনো ঝামেলায় পড়বেন না। তাছাড়া উনারা প্রবীণ, জীবনের সকল ধাপগুলো ভালোভাবেই পাড় করেছেন তাই এখন কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।’

‘আবার জ্ঞান দেওয়া শুরু করলি। তুই পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা করিস ভালো করবি। শিক্ষকরা এভাবে কারণে অকারণেও বোঝায়।’

‘জানতাম তুমি এমন কিছু একটা বলবে। আরে তোমায় তো বলা হয়নি সেদিন আমি একটা ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম পরামর্শের জন্য কাকাবাবুর কাছে।’

‘কীসের ঝামেলা?

‘আমার তো পরীক্ষা শেষ ভাবছিলাম একটা জব করব পার্টটাইম। বাবা-মা কিছুতেই রাজি না

ভাবলাম কাকাবাবুকে ম্যানেজ করে নিয়ে গেলে বিষয়টা বাগিয়ে নিতে পারব।’

তারপর?’

‘তারপর আর কী। আমায় একগাদা উপদেশ দিয়ে বিদায় দিয়ে দিলেন আর আমিও চলে আসলাম। আচ্ছা তোমার সেই কলিগটার কী হয়েছে বললে না তো?’

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়