বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৭

রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার অবস্থান!

মাছুম বিল্লাহ
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার অবস্থান!

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার সম্পর্কে আমরা ইতোমধ্যে অনেকটাই জেনেছি। শিক্ষা বিষয়ক কিছু স্পষ্ট কথা শনুতে চেয়েছিলাম যদিও একেবারে স্পষ্ট করে বলা বেশ কঠিন কাজ। কারন, এই নির্বাচন অনেক হিসেব-নিকেষের বিষয়। আর শিক্ষার বিষয়টি এত ব্যাপক ও গভীর যে, এটির অনেক দিকই স্পষ্ট করে সহজে বলা মুশকিল। আমরা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কথা শুনছি বড় দলগুলোর কাছ থেকে কিন্তু সেটি কিভাবে হবে? দেশে উচচশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই প্রায় পনেরো লাখ। চিকিৎসা বিষয়ক বেসরকারি ১৮৬টি ডিপ্লোমা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষার্থীর অভাবে। দেশে টেকনিক্যাল মানবসম্পদ প্রয়োজন কিন্তু সেই মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা কি এরকম বেকার তৈরির কারখানাগুলো বর্তমানের মতো খোলা রাখব নাকি বিকল্প ভাববো?

দেশে শিক্ষার বিরাট অংশই পরিচালিত হয় বেসরকারি পর্যায়ে। শুধু প্রাথমিক শিক্ষার বিরাট অংশ রাষ্ট্রায়াত্ত কিন্তু সেখানে শিক্ষার মান শূন্যের কোঠায়। মাধ্যমিক স্তর বেসরকারি আর সরকারি বেসরকারি যৌথ পরিচালনায় চলছে একটি বড় অংশ। তারা চাচেছন প্রাথমিকের মতো জাতীয়করণ। সেটি করা হলে অবশ্যই শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে যেটি তাদের দরকার, কিন্তু থাকবেনা শিক্ষার মান যেমনটি প্রাথমিকে হয়েছে। কিছু হলেই তারা ধর্মঘট ডাকবেন, বিরোধিতা করবেন স্বার্থে একটু আঘাত লাগলেই। এমতাবস্থায় সরকারের বাইরে থাকাকালীন রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কথাই বলে কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসার পর বাস্তব অবস্থা দেখে বাস্তবায়নের ধারেকাছেও যেতে পারেনা কারন বিষয়টি খুব জটিল। এই জটিল সমস্যা শুধু উপরে চিন্তার দ্বারা কিংবা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করলে তখন কিছু একটা করার প্রবণতা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। শিক্ষার বহুধাকরণ এবং অগণিত সমস্যা সম্পর্কে গভীর ধারনা যাদের থাকবে তারাই এই বিশাল মন্ত্রণালয় সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। এখানে শুধু মিষ্টি মিষ্টি কথা, আবেগের কথা, অবাস্তব কথা আর নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলা মানে মন্ত্রণালয়কে দুর্বল করা যেটি আমরা গত পনেরো-ষোল বছর দেখে এসেছি এবং এভাবে সমস্যার পাহাড় জমেছে যা থেকে মুক্তি পাওয়া এত সহজ নয়।

শিক্ষা জাতীয়করণ শিক্ষার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান নয়। আবার শিক্ষকরা অনিয়মিত, অসচছল বেতন নিয়ে সঠিক পাঠদান করবেন এটিও হতে পারেনা। আবার যারা ইতিমধ্যে শিক্ষকতায় আছেন তারা সবাই যে, প্রকৃত শিক্ষাদান করতে পারছেন অর্থাৎ তারা সবাই যে মোটিভেটেড সেটিও কিন্তু না। আবার এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে পড়াতে সব উন্নতমানের শিক্ষকও পাওয়া যাবেনা। কারণ যারা একটু মেধাবী, একটু সৃজনশীল তারা অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে এত মানসম্পন্ন শিক্ষক আমরা কোথায় পাব, এর সমাধান কী? একটি শ্রেণিতে দুই চারটি ছেলেমেয়ে মানসম্পন্ন তারা তো শিক্ষকতায় আসবেন না এবং আসছেন না। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা না থাকলে তারা শুধু বলবেন যে, শিক্ষা বিষয়ে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার মানে হচেছ তারা প্রস্তত নন এবং সমস্যার গভীরে এখনও চিন্তা করেননি।

শিক্ষার গুণগত মানের কথা আমরা অনেকেই বলে যাচ্ছি কিন্তু এজন্য ন্যূনতম কোন পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কেউ কেউ হঠাৎ বলে ওঠেন শিক্ষার খোলনলচে বদলাতে হবে, এখানে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। এটি একটি সাধারণ কথা এবং ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থা’। এত কিছু মাড়িয়ে আমরা যে পরিবর্তন নিয়ে এলাম, এসব ওপরে ওপরে কথা বলে শিক্ষায় পরিবর্তন আনা যাবেন। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমরা অন্তত বাস্তবমুখী কিছু পদক্ষেপের কথা শুনতে চাচিছলাম উপরোল্লিখিত সমস্যাগুলোর সমাধানের ক্ষেত্রে, সেটি কিন্তু আমরা এখনও দেখতে পাচিছনা।

আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ ও জনগনের প্রত্যাশা পূরণে তারেক রহমানের ‘উই হ্যাভ অ্যা প্লান’ যোগ হচেছ বিএনপি-র ইশতেহারে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের আদলে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি তৈরির পরিকল্পনা এবং নির্বাচিত হলে ১৮মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে রেখেছে দলটি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং মসজিদ-মাদরাসাভিত্তিক ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানি ভাতাসহ জনকল্যাণমুখী আটটি খাতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বিএনপি অন্তর্ভুক্ত করছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যাবে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে সার, উন্নত বীজ ও কৃষিপ্রযুক্তি পাবেন কৃষকরা। শক্তিশালী প্রাইমারী হেলথ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বিদেশি শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ খুঁজে বের করে এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আরও বেশি তরুণকে ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্টে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। চাহিদাভিত্তিক, দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন গড়ার কথাও বলা হচেছ। আমরা এগুলো সমর্থন করছি কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে আরও গভীরের কথা শুনতে চেয়েছিলাম।

জুলাই চেতনাকে ধারণ করে তৈরি হচ্ছে জামায়াত ইসলামীর ইশতেহার। দেশের কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রকাঠামোতে ব্যাপক সংষ্কারকে গুরুত্ব দিচেছ তারা । সততা, দেশপ্রেম, দুর্নীতিকে না বলা। শিক্ষা প্রতিটি শিশুর অধিকার। সর্বস্তরে সতততার নীতি কায়েম করতে শিশু বয়স থেকেই নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ব করার কথাও তারা বলছেন। শিক্ষাব্যবস্থার শুরু থেকে সর্বোচচ স্তর পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে আনা, অপরিকল্পিত শিক্ষা থেকে বেড়িয়ে আসা, উচচতর গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি থাকছে ইশতেহারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচচ ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জামায়াত গড়ে তুলতে চায় কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা।স্বাস্থ্যসেবায় জড়িত চিকিৎক, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট সেবার সমস্যা সমাধানেও জামায়াতের থাকছে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি। জনগনের অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা তৈরির বড় পরিকল্পনা থাকছে জামায়াতের ইশতেহারে। এজন্য দেশীয় শিল্পের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধান করে দেশকে আত্মনির্ভরশীল করার পরিকল্পনার কথাও বলা হচেছ। সাধারণ প্রশাসনসহ পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কারের কথা বলছে জামায়াত। পুলিশের বেসিক প্রশিক্ষণে গুণগত পরিবর্তন আনা এবং দেশপ্রেম ও সেবার মানসিকতা তৈরিতে প্রশিক্ষন কার্যক্রম নেওয়ার কথা বলেছে। বিদেশে কর্মসংস্থাহের জন্য সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং এটাকে সম্প্রসারণ করার প্রতিশ্রতি থাকছে ইশতেহারে।

এনসিপির ২৪ দফার মধ্যে ছিল নতুন সংবিধান ও সেকেন্ড রিপাবলিক, জুলাই গণ-অভুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচার, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা ও আইন সংস্কার, শিক্ষানীতি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের কথা থাকছে।

একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের চরিত্র ও মানসিক কাঠামো তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারেনা, এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবের কারণে শিক্ষা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, নীরস ও প্রাণহীন। এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি শিক্ষাকে রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করছে নাকি কেবল উন্নয়ন সূচকের একটি পরিসংখ্যানমূলক খাত হিসেবে দেখছে? উচচশিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানবিকের কোনো বিষয় পড়াচেছনা, বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলো পড়াচেছনা। তারা মূলত চাহিদামাফিক শিক্ষার কাছাকাছি হাঁটাহাঁটি করছে, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ভাল জব ম্যানেজ করছেন, কিন্তু সবাই না। তাদের মানবিক শিক্ষাটা অপূর্ণ থেকে যাচেছ।

রাষ্ট্র পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুগোপযোগী কমিউনিকেশন দক্ষতা গড়ে উঠছে না অধিকাংশ শিক্ষার্থীর। আর একটি বিষয় সবাই গবেষণার কথা বলছেন। এটি ভাল। কিন্তু গবেষণা মানে নতুন কিছু আবিষ্কার করা ছাড়া শুধু কাগুজে গবেষণা দ্বারা তেমন কিছু আগায় না। সেই ট্রেন্ড এখন চলছে সর্বত্র! একদল শিক্ষকের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে কে কত সার্টিফিকেট নিতে পারেন, কার কয়টি প্রকাশনা হয়েছে বিভিন্ন জার্নালে (যদিও অনেকগুলোই প্রিডেটরি জার্নাল) আর সব কাগুজে গবেষণা যার দ্বারা শিক্ষাক্ষেত্র প্রকৃতপক্ষে উন্নত হচেছনা। এই বিষয়গুলো কিভাবে নির্ধারিত হবে তারও নীতিমালা থাকা এবং কিভাবে তার বাস্তবায়ন হবে সেই উল্লেখ ইশতেহারে সরাসরি না থাকলেও বর্তমানের অভিজ্ঞতার আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা আসবেন তাদের সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে।

এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার পৌনে তের কোটি। এর মধ্যে একেবারে নতুন ভোটার আছে কমবেশি এক কোটি। এই বিশাল সংখ্যক ভোটার এবারই প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। দেশের এসব বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী ইশতেহার সাজাতে হবে যা নতুন রাষ্ট্রচিন্তার দলিল হিসেবে চিহ্নিত হবে। যেখানে থাকবে শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তি, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও মধ্যমেয়াদি বাস্তব পরিকল্পনা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কৌশলসমুহ, শুধু স্বল্প মেয়াদি আর এডহক কোন পরিকল্পনা নয়।

লেখক: ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়