প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম ও তার তাৎপর্য

‘ফাতেহা’ অর্থ দোয়া বা ঈসালে সওয়াব এবং ফারসি ‘ইয়াজদাহম’ শব্দের অর্থ এগারো; অর্থাৎ এগারো তারিখের দোয়া বা ঈসালে সওয়াব।
রবিউস সানি মাসের ১১তম দিন ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম হিসেবে পালিত হয়। হিজরি ৫৬১ সালের ১১ রবিউস সানি হজরত বড়পীর শেখ সায়েদ মহিউদ্দীন আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ইন্তেকাল করেন।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম হলো মাহবুবে সুবহানি, কুতুবে রাব্বানি, গাউসুল আজম হজরত বড়পীর শেখ সায়েদ মহিউদ্দীন আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাত বা ইন্তেকাল দিবস। সুফিবাদের অনুসারীদের কাছে দিনটি উর্দুতে ‘গেয়ারভী শরিফ’ নামেও পরিচিত।
তাৎপর্য ও অনুষ্ঠানমালা : এই দিনে বড়পীরের রুহানি তাওয়াজ্জুহ লাভের আশায় পবিত্র কোরআন তিলওয়াত, জিকির-আজকার, মিলাদ, ওয়াজ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সুফি ঘরানার মানুষেরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দিনটি পালন করে আসছে।
হজরত বড়পীর গাউসুল আজম শেখ সায়েদ মহিউদ্দীন আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর কাদেরিয়া তরিকাভুক্ত মুরিদ ও ভক্তগণ প্রতি হিজরি মাসের ১১ তারিখে অত্যন্ত ভক্তিভরে গেয়ারভী শরিফের খতম ও মিলাদ মাহফিল পালন করে থাকেন। তাঁরা তাঁর রুহ মোবারকে সওয়াব রেসানি করে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া মাহফিল এবং গাউসে পাকের জীবনী ও শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করেন।
হিজরি চতুর্দশ শতকের মুজাদ্দিদ আলা হজরত ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা শাহ আহমদ রেজা খান বেরলভী (রহ.) ‘ফতোয়া-ই-রেজভীয়া’-এর ১০ম খণ্ডে উল্লেখ করেন, “গেয়ারভী শরিফ পালন করা শরিয়তসম্মত, উত্তম ও ভালো কাজ।”
‘বাহজাতুল আসরার’ নামক কিতাবে বর্ণিত আছে, গাউসুল আজম বড়পীর শেখ সায়েদ মহিউদ্দীন আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজেকে আমার সঙ্গে সম্পর্কিত করবে, তার নাম আমার অনুসারীদের তালিকায় শামিল হবে এবং আল্লাহ তাআলা তা কবুল করবেন; যদিও সে কোনো নিন্দনীয় পথে থাকে। আল্লাহ তাআলা তাকে তওবা করার তাওফিক দেবেন এবং সে আমার মুরিদদের অন্তর্ভুক্ত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার মুরিদ ও ভক্তবৃন্দকে বেহেশত দান করার ওয়াদা করেছেন।”
‘তাফসিরে নঈমী’-তে গেয়ারভী শরিফের ভিত্তি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—হজরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল, হজরত নুহ (আ.)-এর কিস্তি পৃথিবীতে অবতরণ, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি লাভ, হজরত আইয়ুব (আ.)-এর রোগমুক্তি, হজরত মুসা (আ.)-এর লোহিত সাগর পার ও ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি লাভ, হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর নিকট পুত্র ইউসুফ (আ.)-এর প্রত্যাবর্তন এবং আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কোরআন মাজিদের সূরা আল-ফাতহ্-এর “লিয়াগফিরা লাকাল্লাহু মা তাকাদ্দামা মিন জামবিকা ওয়ামা তায়াখখার” আয়াত নাজিল হওয়া—এসব ঘটনা ১০ মহররম তারিখে সংঘটিত হয়েছিলো। এই আয়াতে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করার মহান ঘোষণা দেওয়া হয়। নবীগণ ১১তম রাতে এসব নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। সুতরাং গেয়ারভী শরিফ মূলত নবীগণেরই একটি সুন্নাত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নের মাধ্যমে এই গেয়ারভী শরিফ গাউসে পাক বড়পীর শেখ সায়েদ মহিউদ্দীন আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-কে দান করেন।
প্রিয় মুসলমান ভাইয়েরা! আমরা এই পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম তথা এগারো শরিফের রাতে গাউসে পাকের জীবনী আলোচনা, আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আজকার, কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ-কিয়াম ও দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে গাউসে পাকের রুহানি ফয়েজ কামনা করি।
বড়পীর হজরত শেখ সায়েদ মহিউদ্দীন আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর বাবার নাম সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গি এবং মায়ের নাম বিবি ফাতেমা। বড়পীর ৪৭০ হিজরিতে ইরানের জিলান নগরীতে ১ম রমজান জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাগদাদের মহান পীর হজরত আবু সাঈদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন মাখজুমি (রহ.)-এর নিকট বায়আত হয়ে মারফাতের জ্ঞানে পূর্ণতা লাভ করেন, খেলাফত প্রাপ্ত হন এবং কাদেরিয়া তরিকার প্রবর্তন করেন।
গাউসে পাকের কয়েকটি কারামত :
১. জিনদের বাদশাহর আনুগত্য :
হজরত আবু সা’দ আবদুল্লাহ বিন আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেন, “একবার আমার মেয়ে ফাতেমা ঘরের ছাদ থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে গেলো। আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বাগদাদের সরকার হুজুর গাউসে পাক (রহ.)-এর খেদমতে হাজির হলাম এবং আমার মেয়েকে উদ্ধার করে দেওয়ার আবেদন জানালাম। তিনি বললেন, “কারখ নামক স্থানে গিয়ে রাতের বেলা কোনো এক নির্জন টিলার ওপর অবস্থান নেবে। তারপর নিজের চারপাশে একটি বৃত্ত (কুণ্ডলী) এঁকে সেখানে বসে থাকবে এবং আমাকে স্মরণ করে বিসমিল্লাহ বলবে। দেখবে, রাতের অন্ধকারে তোমার চারপাশে জিনেরা দল বেঁধে চলাফেরা করছে। তাদের আকৃতি দেখতে খুবই আশ্চর্যজনক ও ভয়ংকর হবে, তবে তুমি তাদের দেখে ভয় পেয়ো না। সেহরির সময় জিনদের বাদশাহ তোমার নিকট উপস্থিত হবে এবং তোমার উদ্দেশ্য জানতে চাইবে। তাকে বলবে, শেখ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) আমাকে বাগদাদ থেকে পাঠিয়েছেন, তুমি আমার কন্যাকে খুঁজে বের করো।’
অতঃপর কারখের নির্জন ভূমিতে গিয়ে আমি হুজুর গাউসে পাক (রহ.)-এর নির্দেশ মোতাবেক কাজ করলাম। রাতের নির্জনতায় দেখতে পেলাম, ভয়ংকর জিনেরা আমার আঁকা বৃত্তের বাহির দিয়ে অতিক্রম করছে। জিনদের আকৃতি এতোই ভয়ংকর ছিলো যে সেদিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। সেহরির সময় জিনদের বাদশাহ একটি ঘোড়ায় চড়ে আমার বৃত্তের কাছে এসে উপস্থিত হলো। তার চারপাশে অনেক জিন ভিড় করছিলো। বৃত্তের বাইরে থেকেই সে আমার উদ্দেশ্য জানতে চাইলো। আমি বললাম, ‘আমাকে হুজুর গাউসুল আজম (রহ.) তোমার কাছে পাঠিয়েছেন।’ এটুকু শুনতেই সে ঘোড়া থেকে নেমে মাটিতে বসে পড়লো। অন্য জিনেরা তাকে অনুসরণ করে বাইরে বসে পড়লো।
আমি তাকে আমার কন্যা হারানোর ঘটনা বললাম। সে জিনদের মধ্যে ঘোষণা করে দিলো, ‘মেয়েটিকে কে নিয়ে গেছিস?’ কিছুক্ষণের মধ্যে জিনেরা এক চীন দেশীয় জিনকে অপরাধী হিসেবে গ্রেপ্তার করে বাদশাহর সামনে হাজির করলো। জিনদের বাদশাহ তাকে বললো, ‘তুমি কেন জামানার কুতুব গাউসুল আজমের শহর থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে এসেছো?’ সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো, ‘হুজুর! আমি তাকে দেখামাত্রই তার ওপর আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম।’ বাদশাহ এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ওই চীন দেশীয় জিনের গর্দান কেটে ফেলার নির্দেশ দিলো এবং আমার প্রিয় কন্যাকে ফেরত দিলো। আমি তার এই ব্যবহারে অত্যন্ত মুগ্ধ হলাম এবং জিনদের বাদশাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললাম, “তুমি গাউসে পাককে অনেক ভালোবাসো!” এ কথা শুনে সে বললো, “অবশ্যই! হুজুর গাউসুল আজম যখন আমাদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন, তখন সমগ্র জিন জাতি থরথর করে কাঁপতে থাকে। আল্লাহ তাআলা যখন কাউকে জামানার কুতুব নির্ধারণ করে দেন, তখন সমস্ত মানব ও দানবকে তাঁর অনুগত করে দেন।” (বাহজাতুল আসরার ওয়া মা’দানুল আনওয়ার, পৃষ্ঠা : ১৪০)
২. আল মদদ ইয়া গাউসে আজম :
হজরত বিশর করযী (রহ.) বর্ণনা করেন, “একবার আমি মালামাল বোঝাই ১৪টি উটসহ একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সঙ্গে ছিলাম। আমরা রাতের বেলা এক ভয়ানক জঙ্গল অতিক্রম করছিলাম। রাতের প্রথম অংশে আমার চারটি মাল বোঝাই উট হারিয়ে গেলো। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পেলাম না। কাফেলা এগিয়ে গেলো, আর উটের রাখাল আমার সঙ্গে রয়ে গেলো।
সকালবেলা হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, আমার পীর ও মুর্শিদ বাগদাদের হুজুর গাউসে পাক আমাকে বলেছিলেন, “যখনই তুমি কোনো বিপদে পড়বে, তখন আমাকে ডাকবে। ইনশাআল্লাহ, সেই বিপদ দূর হয়ে যাবে।” তাই আমি ফরিয়াদ করলাম, “হে শেখ আবদুল কাদির! আমার উট হারিয়ে গেছে।”
এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ পূর্বদিকের টিলার ওপর সাদা পোশাক পরিহিত এক বুজুর্গ আমার নজরে এলেন, যিনি ইশারায় আমাকে তাঁর দিকে ডাকছিলেন। আমি উটের রাখালকে নিয়ে যখনই সেখানে পৌঁছালাম, ওই বুজুর্গ সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি অবাক বিস্ময়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া সেই চার উট টিলার নিচে বসা অবস্থায় দেখতে পেলাম। আমি দেরি না করে সেগুলো ধরে ফেললাম এবং আপন কাফেলার সঙ্গে মিলিত হয়ে গেলাম।” (বাহজাতুল আসরার, পৃষ্ঠা : ১৯৬)
৩. মানুষের অন্তর আমার হাতের মুঠোয় :
হজরত ওমর বাজ্জাজ (রহ.) বলেন, “জুমার দিনে আমি হুজুর গাউসে আজম (রহ.)-এর সঙ্গে জামে মসজিদের দিকে যাচ্ছিলাম। আমার মনে খেয়াল এলো, ‘আজকে বড়ই আশ্চর্য ব্যাপার! ইতঃপূর্বে যখনই আমি মুর্শিদের সঙ্গে জুমার মসজিদে আসতাম, তখন সালাম ও মুসাফাহাকারীর সংখ্যা এতো বেড়ে যেতো যে সামনে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়তো। কিন্তু আজ কেউ সালাম-মুসাফাহা তো দূরের কথা, চোখ তুলেও তাকাচ্ছে না!’
আমার মনে এই খেয়াল আসার সঙ্গে সঙ্গে হুজুর গাউসে পাক আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। এরপর লোকেরা দলে দলে মুসাফাহা করার জন্য আসতে লাগলো। এমনকি ভিড়ের কারণে আমার ও আমার মুর্শিদে করিমের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেলো। তখন পুনরায় আমার ইচ্ছা জাগলো, ‘এর চেয়ে তো আগের অবস্থাটাই ভালো ছিলো!’
আমার মনে এই ইচ্ছা জাগার সঙ্গে সঙ্গে গাউসে পাক আমাকে বললেন, “হে ওমর! তুমিই তো ভিড়ের আকাঙ্ক্ষা করছিলে। তুমি জানো না যে মানুষের অন্তর আমার হাতের মুঠোয়? আমি ইচ্ছা করলে মানুষের মনকে আমার প্রতি ধাবিত করতে পারি, আবার ইচ্ছা করলে দূরে সরিয়ে দিতে পারি।’” (বাহজাতুল আসরার, পৃষ্ঠা : ১৪৯)
মুফতি ফজলুল কাদের বোগদাদী : খতিব, আলীগঞ্জ হজরত মাদ্দাহ্ খাঁ (র.) জামে মসজিদ, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।








