প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৬
মুসলিম জীবনে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের গুরুত্ব ও ফজিলত

ইসলামের ইতিহাসে বহু আলেম, সাধক ও মনীষী তাঁদের জ্ঞান, আমল, চরিত্র ও দাওয়াতের মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে আলোকিত করেছেন। তাঁদের জীবন ও কর্ম স্মরণ করা মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতির চেতনা জাগাতে পারে। উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে তেমনই একটি বহুল পরিচিত ধর্মীয় ঐতিহ্য হলো ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম। প্রতিবছর হিজরি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে এটি পালন করা হয় এবং এর সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে বিশিষ্ট আলেম ও সুফিসাধক হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর স্মৃতি। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১১ রবিউস সানি (২৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার) ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালিত হবে।
‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ; এর অর্থ ‘এগারো’। রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে এই স্মরণানুষ্ঠান হওয়ায় এর নাম হয়েছে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম। প্রচলিত ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই দিনটি হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি ৫৬১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন এবং কাদেরিয়া সুফি ধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে মুসলিম বিশ্বে সুপরিচিত। তবে তাঁর ইন্তেকালের সঠিক তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো জীবনী ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় ১০ রবিউস সানি, আবার প্রচলিত কাদেরিয়া ঐতিহ্যে ১১ রবিউস সানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ১১ রবিউস সানিকে তাঁর ওফাতের নিরঙ্কুশ ঐতিহাসিক তারিখ হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ছিলেন জ্ঞান, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার জন্য প্রসিদ্ধ একজন ইসলামী মনীষী। তাঁর শিক্ষা ও উপদেশে কোরআন-সুন্নাহর অনুসরণ, আল্লাহভীতি, সত্যবাদিতা, বিনয়, তওবা, মানুষের হক আদায় এবং আত্মসংযমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্মরণ তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর জীবন থেকে নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের উপলক্ষ হওয়া উচিত। একজন আলেম ও সাধকের প্রকৃত মর্যাদা তাঁর নামে আয়োজনের ব্যাপকতায় নয়; বরং তাঁর শিক্ষা কতটা মানুষের চরিত্র ও জীবনাচরণে প্রতিফলিত হলো, তার মধ্যেই নিহিত।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে সাধারণত কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, দোয়া-মোনাজাত, নফল ইবাদত, দান-সদকা এবং ইসালে সওয়াবের আয়োজন করা হয়। এসব আমলের প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি দোয়া শেখানো হয়েছে : হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ভাইদেরও, যারা আমাদের আগে ঈমান নিয়ে চলে গেছে।”* (সূরা আল-হাশর, ৫৯:১০)। এই আয়াত মৃত মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্ব নির্দেশ করে। একইভাবে সহিহ হাদিসে এসেছে : “মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে—এসবের সওয়াব অব্যাহত থাকে।” (সহিহ মুসলিম, ১৬৩১)।
অতএব, মৃত মুসলমানদের জন্য দোয়া করা ইসলামের স্বীকৃত একটি আমল। কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও অন্যান্য নেক আমলের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানো—এ বিষয়েও ফিকহবিদদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে। তাই এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারী মুসলমানকে হেয় করা উচিত নয়।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে উঠতে পারে আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণে। এ উপলক্ষে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেতে পারে :
প্রথমত, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া : আল্লাহর কালাম পাঠ, নিজের ও মৃত মুসলমানদের জন্য মাগফিরাত কামনা এবং উম্মাহর কল্যাণের জন্য দোয়া করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দান-সদকা : দরিদ্র, অসহায়, এতিম ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কোনো স্মরণানুষ্ঠান যদি মানুষের ক্ষুধা নিবারণ, অসুস্থের চিকিৎসা কিংবা অসহায়ের সহায়তায় পরিণত হয়, তবে তা মানবিকতার সুন্দর বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।
তৃতীয়ত, সিরাত ও ইসলামী জ্ঞানচর্চা : হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন, তাঁর জ্ঞানচর্চা, নৈতিক শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি চরিত্রগঠনের শিক্ষা পেতে পারে।
চতুর্থত, আত্মসমালোচনা ও তওবা : মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিজের ভুল উপলব্ধি করা। অন্যায়, অহংকার, হিংসা, মিথ্যা, প্রতারণা, সুদ-ঘুষ, মানুষের হক নষ্ট করা ও গুনাহ থেকে ফিরে আসার সংকল্প করা এমন দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।
ধর্মীয় কোনো আয়োজনের মূল্য কেবল তার বাহ্যিক জাঁকজমকে নয়; বরং মানুষের অন্তরে তার কী পরিবর্তন ঘটছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমকে যদি শুধু খাবার আয়োজন, আলোকসজ্জা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে এর আত্মিক শিক্ষার বড় অংশ হারিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে এ উপলক্ষে যদি কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা আলোচনা করা হয়, মানুষের জন্য দোয়া করা হয়, অসহায়দের সাহায্য করা হয়, গুনাহ থেকে তওবা করা হয় এবং নৈতিক জীবন গঠনের সংকল্প নেওয়া হয়—তাহলে দিনটি আত্মশুদ্ধির একটি অর্থবহ উপলক্ষ হতে পারে।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। একদল আলেম কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, সদকা ও ইসালে সওয়াবের মতো আমলকে বৈধ মনে করেন এবং পুণ্যবান ব্যক্তিদের স্মরণকে নেক কাজের অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে কিছু আলেম প্রতিবছর নির্দিষ্ট একটি দিনকে বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্ধারণ করার বিষয়ে আপত্তি করেন। এমনকি হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাতের তারিখ নিয়েও ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। তাই ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমকে ইসলামের ফরজ, ওয়াজিব বা সর্বসম্মত সুন্নত হিসেবে দাবি করা যেমন যথাযথ নয়, তেমনি এ উপলক্ষে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, সদকা বা আলেমদের আলোচনাকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের পারস্পরিক বিদ্বেষ সৃষ্টি করাও কাম্য নয়। মতভেদ থাকলে তা জ্ঞান, শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করাই ইসলামী আদবের মূল কথা।
হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর স্মরণ তখনই সার্থক হবে, যখন তাঁর জীবন থেকে আমরা সত্যবাদিতা, তাকওয়া, বিনয়, আত্মসংযম, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্যের শিক্ষা গ্রহণ করব। আজকের সমাজে দুর্নীতি, মিথ্যা, প্রতারণা, হিংসা, অহংকার ও ভোগবাদ যখন মানুষের নৈতিক জীবনকে দুর্বল করে দিচ্ছে, তখন ধর্মীয় স্মরণানুষ্ঠানগুলোকে আত্মশুদ্ধির সুযোগে পরিণত করা প্রয়োজন। শুধু কোনো বুজুর্গের নামে আয়োজন নয়—তাঁর আদর্শের আলোকে নিজের জীবন সংশোধন করাই হতে পারে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম তাই কারও জন্য নিছক একটি ঐতিহ্য, কারও কাছে আধ্যাত্মিক স্মরণ, আবার কারও কাছে ইসালে সওয়াবের উপলক্ষ। দৃষ্টিভঙ্গির এই পার্থক্যকে সম্মান রেখেই এর ইতিবাচক শিক্ষাগুলো সামনে আনা যেতে পারে। কোরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর কাছে দোয়া, দান-সদকা, আত্মশুদ্ধি এবং মানুষের কল্যাণ—এসব সর্বজনস্বীকৃত ইসলামী মূল্যবোধের দিকে ফিরে যাওয়াই হওয়া উচিত এর মূল অনুপ্রেরণা। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই প্রকাশ পাবে, যখন একটি স্মরণদিবস আমাদের হৃদয়ে ঈমান, চরিত্রে সততা এবং জীবনে মানবিকতার নতুন প্রত্যয় সৃষ্টি করবে।
ফরিদুল ইসলাম : চিন্তক, কবি ও প্রাবন্ধিক।







