প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫৩
২৯ এপ্রিল: রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, প্রকৃতির প্রতিশোধ—একটি রক্তাক্ত উপকূলের জবাবদিহি

২৯ এপ্রিল—এটি কোনো সাধারণ তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধ-এর এক রক্তাক্ত স্মারক। ১৯৯১ সালের এই দিনে বঙ্গোপসাগর শুধু উত্তাল হয়নি, এটি পরিণত হয়েছিল এক গণকবরের স্থপতিতে। ‘ঘূর্ণিঝড়’ শব্দটি এখানে ভীষণভাবে অপর্যাপ্ত—এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত মৃত্যু-ফাঁদ, যেখানে রাষ্ট্র ছিল অনুপস্থিত, আর মানুষ ছিল সম্পূর্ণ অসহায়।
|আরো খবর
পৌনে দুই লাখ প্রাণ—এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জাতির বিবেকের ওপর চাপানো স্থায়ী দায়। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই মৃত্যু কি শুধুই প্রাকৃতিক? নাকি এটি ছিল রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, দুর্বল পূর্বপ্রস্তুতি এবং অবহেলার ফল? যখন ২০-২৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, মহেশখালীকে গিলে খাচ্ছিল, তখন কোথায় ছিল কার্যকর সতর্কবার্তা? কোথায় ছিল নিরাপদ আশ্রয়? কেন উপকূলবাসীকে মৃত্যুর মুখে ফেলে রাখা হয়েছিল?
সেই রাতের ভয়াবহতা কোনো কাব্যিক বর্ণনা নয়, এটি ছিল নগ্ন বাস্তবতা। গাছের ডালে ঝুলন্ত লাশ, জনপদের পর জনপদ নিশ্চিহ্ন, মা-বাবার বুক থেকে ছিটকে যাওয়া শিশু—এই দৃশ্যগুলো শুধু ইতিহাসের পাতা নয়, এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার চার্জশিট। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যখন একে “পৃথিবীর শেষ দিন” বলেছিল, তখন তারা প্রকৃতির চেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছিল মানুষের নিরাপত্তাহীনতায়।
অর্থনৈতিকভাবে ১৯৯১-এর সেই আঘাত ছিল একেবারে মেরুদণ্ডভাঙা। চট্টগ্রাম বন্দর বিধ্বস্ত, অবকাঠামো ছিন্নভিন্ন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিপর্যয়—সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল একটি রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো ধাক্কা। কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই এক করুণ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাংলাদেশ তখনও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রাষ্ট্র ছিল না; বরং ছিল ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল এক অসহায় ভূখণ্ড।
তবে এখানেই শেষ নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—৩৫ বছর পর আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
হ্যাঁ, আমরা সাইক্লোন শেল্টার বানিয়েছি, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় উন্নতি করেছি, বিশ্বে “রোল মডেল” হওয়ার তকমাও অর্জন করেছি। কিন্তু বাস্তবতা কি এতটাই উজ্জ্বল? উপকূলীয় বাঁধগুলো এখনও ঝুঁকিপূর্ণ, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় বহু প্রকল্প কাগজেই সীমাবদ্ধ। বনায়নের নামে চলছে প্রকল্পভিত্তিক লুটপাট, আর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উপকূল প্রতিনিয়ত আরও অরক্ষিত হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—আমরা কি আবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছি?
আজও উপকূলের মানুষ ঝড়ের আগে আতঙ্কে দিন কাটায়। আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লেও সেগুলোর মান, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সহজলভ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। অনেক জায়গায় মানুষ এখনও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঘর ছাড়তে চায় না—কারণ তারা জানে, আশ্রয়কেন্দ্র মানেই নিরাপত্তা নয়; বরং কখনও কখনও নতুন অনিশ্চয়তা।
এই বাস্তবতায় ২৯ এপ্রিল শুধু শোকের দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্য জবাবদিহির দিন। আমরা কি সত্যিই সেই শিক্ষাগুলো গ্রহণ করেছি, নাকি শুধু স্মৃতিচারণের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করে দিচ্ছি?
একটি সত্য স্পষ্ট—প্রকৃতি কখনো প্রতিশোধ নেয় না, এটি কেবল প্রতিক্রিয়া দেখায়। আমরা যদি উপকূল ধ্বংস করি, বন উজাড় করি, অবৈজ্ঞানিক উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করি, তাহলে সেই প্রতিক্রিয়া আরও ভয়াবহ হয়ে ফিরে আসবে। ১৯৯১ ছিল একটি সতর্কবার্তা; পরবর্তী বিপর্যয়গুলো হতে পারে চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ।
অতএব, ২৯ এপ্রিলের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো নয়—এটি হলো কঠিন প্রশ্ন তোলা, ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি করা, এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।
কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—প্রকৃতিকে অবহেলা করলে, তার বিচার হয় নির্মম, নির্দয় এবং নিঃশব্দে।
লেখক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








