প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১১:১৭
লেডের নীরব বিষ: আজকের শিশু, আগামীর বিপন্ন প্রবীণ সমাজ

মানুষ সভ্যতার অগ্রগতির জন্য অসংখ্য আবিষ্কার করেছে। কিন্তু কিছু আবিষ্কার ও প্রযুক্তির অপব্যবহার কখনো কখনো মানবজাতির জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনে। “লেড” বা সীসা তেমনই একটি নীরব বিষ। বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন, লেড মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ। আজ বাংলাদেশে যেভাবে ব্যাটারিচালিত যানবাহন, পুরোনো ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গভীর দুঃসংবাদ হয়ে উঠতে পারে।
প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে সহিংসতা, অপরাধ ও মব ভায়োলেন্স আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। পরে গবেষকরা দেখতে পান, দীর্ঘদিন ধরে পেট্রোলে অতিরিক্ত লেড ব্যবহারের ফলে মানুষের শরীরে বিষাক্ত সীসা জমা হচ্ছিল। এই লেড শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। তারা বড় হয়ে অনেক ক্ষেত্রে অস্থির, আগ্রাসী ও বিচারবোধহীন আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, যেসব এলাকায় শিশুদের শরীরে লেডের মাত্রা বেশি ছিল, সেখানে পরবর্তী সময়ে অপরাধ ও সহিংসতার হারও বেশি দেখা গেছে। পরে ধীরে ধীরে পেট্রোলে লেডের ব্যবহার কমানো হলে অপরাধের হারও কমতে শুরু করে। এই অভিজ্ঞতা আজ পুরো বিশ্বের জন্য একটি বড় শিক্ষা।
বাংলাদেশেও আমরা হয়তো একই ধরনের বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সামাজিক সচেতনতা এখনো খুবই কম। বর্তমানে দেশের শহর ও গ্রামে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও বিভিন্ন যানবাহনের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এসব যানবাহনের ব্যাটারিতে প্রচুর পরিমাণ লেড থাকে। পুরোনো বা নষ্ট ব্যাটারি অনেক সময় খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয়। কোথাও কোথাও অস্বাস্থ্যকর উপায়ে ব্যাটারি ভেঙে সীসা আলাদা করা হয়। এতে মাটি, পানি ও বাতাস দূষিত হয়। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই বিষাক্ত পদার্থ ধীরে ধীরে শিশুদের শরীরে প্রবেশ করছে।
শিশুরা সাধারণত মাটিতে খেলাধুলা করে, ধুলাবালি স্পর্শ করে এবং অনেক সময় হাত না ধুয়ে খাবার খায়। ফলে দূষিত পরিবেশ থেকে লেড খুব সহজেই তাদের শরীরে ঢুকে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামান্য পরিমাণ লেডও শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতি করতে পারে। এতে স্মৃতিশক্তি কমে যায়, শেখার ক্ষমতা হ্রাস পায়, মনোযোগে সমস্যা তৈরি হয় এবং আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয়। কোনো কোনো শিশু অল্প বয়স থেকেই অস্থির ও আক্রমণাত্মক আচরণ করতে শুরু করে।
সমস্যাটি এখানেই শেষ নয়। আজ যে শিশুরা লেডের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে, তারাই একদিন প্রবীণ হবে। তখন তাদের মধ্যে স্মৃতিভ্রংশ, মানসিক অস্থিরতা, স্নায়বিক দুর্বলতা, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা এমনকি আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ আমরা অজান্তেই একটি অসুস্থ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ভবিষ্যৎ সমাজ তৈরি করছি। আজকের অবহেলা আগামী দিনের প্রবীণ সমাজের জন্য ভয়ংকর বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ব্যাটারিও বড় একটি ঝুঁকি। ব্যবহারের পর এসব ব্যাটারি নিরাপদভাবে সংরক্ষণ বা পুনর্ব্যবহার না করে যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হয়। অনেক সময় শিশু কিশোররাও এগুলো নিয়ে খেলাধুলা করে। ফলে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। উন্নত দেশগুলোতে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর আইন ও নিরাপদ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ খুব সীমিত।
আমাদের মনে রাখতে হবে, লেড কোনো তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণের মতো ভয় দেখায় না। এটি ধীরে ধীরে মানুষের শরীর ও সমাজকে ধ্বংস করে। তাই একে বলা হয় “নীরব বিষ”। আজ যে শিশু শান্তভাবে স্কুলে যাচ্ছে, তার শরীরে যদি প্রতিদিন সামান্য পরিমাণ লেড জমা হতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে সেই শিশুর জীবন, আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো সমাজে বাড়তে পারে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও মানসিক সংকট।
এখনই সময় সরকার, পরিবেশবিদ, চিকিৎসক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষকে একসাথে কাজ করার। পুরোনো ব্যাটারি ও ই-বর্জ্য নিরাপদভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর অবৈধ কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে জনগণকে সচেতন করতে হবে—ব্যাটারি কোনো সাধারণ আবর্জনা নয়, এটি একটি বিপজ্জনক বিষাক্ত বর্জ্য।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের উপর। যদি শিশুদের মস্তিষ্ক ও মন আজ বিষাক্ত পরিবেশে আক্রান্ত হয়, তবে আগামী দিনের সমাজও অসুস্থ হয়ে উঠবে। তাই লেড দূষণকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতি এবং ভবিষ্যৎ প্রবীণ সমাজের নিরাপত্তার প্রশ্ন। এখনই সতর্ক না হলে, আগামী দিনে হয়তো আমরা এমন এক সমাজের মুখোমুখি হব যেখানে প্রযুক্তির উন্নতি থাকবে, কিন্তু মানুষ হারাবে তার মানবিকতা, সহনশীলতা ও সুস্থ বিচারবোধ।








