প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৭:০৫
সবচেয়ে সুখী ও বাসযোগ্য শহর কোপেনহেগেন?

বিশ্বের সুখী ও বাসযোগ্য শহরের আন্তর্জাতিক সূচকগুলোতে বরাবরই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। উন্নত জীবনমান, সামাজিক আস্থা, নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব নগর-পরিকল্পনা এবং মানুষের মানসিক সুস্থতাকে প্রাধান্য দেওয়ার সংস্কৃতির কারণেই শহরটি বারবার এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত *'হ্যাপি সিটি ইনডেক্স'* অনুযায়ী কোপেনহেগেন বিশ্বের সবচেয়ে সুখী শহর হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। অন্যদিকে, *ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU)*-এর *'গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স'* অনুযায়ী, টানা দুই বছর (২০২৫ ও ২০২৬) বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকাতেও শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্কের এই রাজধানী। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ স্কোর পাওয়ায় তাদের এই অনন্য অর্জন।
কোপেনহেগেনের সাফল্যের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো নাগরিকদের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সামাজিক আস্থা। ডেনমার্ক বিশ্বের অন্যতম কম দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিরাপদ দেশ। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করে যে অন্যরাও নিয়ম মেনে চলবে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করবে।
এই সামাজিক আস্থার চমৎকার প্রতিফলন দেখা যায় তাদের দৈনন্দিন জীবনে। অনেক ডেনিশ অভিভাবক তাঁদের শিশুকে স্ট্রলারে বসিয়ে রেখে ক্যাফে বা দোকানের বাইরে কিছুক্ষণ কেনাকাটা বা আড্ডা দেন—যা বিশ্বের অনেক দেশের মানুষের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও ডেনমার্কে তা নিরাপদ সামাজিক পরিবেশেরই এক উজ্জ্বল প্রতীক।
ডেনিশ জীবনধারার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো 'ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স' বা কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য। এখানে দীর্ঘ সময় অফিসে পড়ে থাকাকে সাফল্যের মাপকাঠি মনে করা হয় না; বরং পরিবার, অবসর, ব্যক্তিগত সময় ও মানসিক সুস্থতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চমানের শিক্ষা, যা নাগরিকদের জীবনকে করেছে আরও নিশ্চিন্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।
কোপেনহেগেন বিশ্বের অন্যতম প্রধান সাইকেলবান্ধব শহর। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন কাজে সাইকেল ব্যবহার করেন। বৃষ্টি, ঠাণ্ডা কিংবা তুষারপাত—কোনো কিছুই তাঁদের এই অভ্যাস থেকে বিরত রাখতে পারে না। এই সাইকেল সংস্কৃতি একদিকে যেমন পরিবেশদূষণ কমায়, অন্যদিকে নাগরিকদের সুস্থ ও সক্রিয় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক চমৎকার ভারসাম্য।
ডেনিশদের সুখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো 'হুগা' (Hygge)। এটি এমন একটি অনন্য জীবনদর্শন, যেখানে জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতে স্বস্তি, উষ্ণতা ও আনন্দ খুঁজে নেওয়াকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, এক কাপ কফি হাতে শান্ত বিকেল উপভোগ করা কিংবা ঘরের আরামদায়ক পরিবেশে অলস সময় কাটানো—এসবই ডেনিশদের কাছে সুখী জীবনের মূল উপাদান।
ডেনমার্কে বছরের বড় একটি সময় ঠাণ্ডা ও বৃষ্টিপ্রবণ আবহাওয়া থাকে। তবে ডেনিশদের একটি জনপ্রিয় প্রবাদ হলো—‘খারাপ আবহাওয়া বলে কিছু নেই, পোশাকই বরং ভুল হতে পারে।’ এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের বাস্তববাদী মানসিকতার পরিচয় দেয়। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গেই মানিয়ে নেওয়াই তাদের জীবনধারার অংশ।
কোপেনহেগেন আধুনিক নগর-পরিকল্পনার পাশাপাশি নিজস্ব ঐতিহ্যকেও সমানভাবে ধারণ করে চলেছে। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলনা ব্র্যান্ড 'লেগো' (LEGO)-এর জন্ম এই ডেনমার্কেই। ১৯৩২ সালে ওলে কির্ক ক্রিস্টিয়ানসেন এটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ বিশ্বজুড়ে শিশু ও বয়স্কদের কাছে সমান জনপ্রিয়। এ ছাড়া ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত 'টিভোলি গার্ডেন্স' বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিনোদন পার্ক, যা এখনো কোপেনহেগেনের সংস্কৃতি ও পর্যটনের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে টিকে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোপেনহেগেনের এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে কোনো একক কারণ নেই। উন্নত অবকাঠামো, নিরাপদ নগরজীবন, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা, সামাজিক আস্থা, কার্যকর জনসেবা এবং মানুষের মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়ার এক সমন্বিত মডেলই শহরটিকে বিশ্বের অন্যতম সুখী ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করেছে।
বিশ্বের অনেক শহর যখন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্ধ প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, তখন কোপেনহেগেন দেখিয়ে দিয়েছে—একটি শহরের প্রকৃত সাফল্য কেবল আকাশচুম্বী ভবন বা অর্থনৈতিক সূচকে নয়, বরং তার নাগরিকরা কতোটা নিরাপদ, সুস্থ ও শান্তিতে জীবনযাপন করছেন, সেটাই আসল মানদণ্ড।








