বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৫

আল্লাহর পরিচয় ও কর্তৃত্ব: কুরআনের আলোকে

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকীর ব্যাখ্যা

অনলাইন ডেস্ক

নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ” আল্লাহর পরিচয়, আল্লাহ কে? এই প্রশ্ন মানবজাতির চিরন্তন অনুসন্ধান। হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনের আলোকে তুলে ধরেছেন মহান আল্লাহর পরিচয়, কর্তৃত্ব ও মানুষের প্রতি তার নির্দেশনার প্রকৃত রূপ। কুরআনের সূরা ইউনুসের তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ নিজেই জানিয়েছেন, তিনি আসমান-যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং বিশ্বজগতের শাসনকর্তা হিসেবে সমাসীন আছেন।

তিনি বলেন, সৃষ্টির পর আল্লাহ কোনোভাবেই নিস্ক্রিয় নন বরং তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রতিটি ঘটনার গতিপথ। মানবজাতি অনেক সময় ভুলভাবে মনে করে, এই বিশাল জগত যেন এমনি করেই চলছে, কেউ যেন নিয়ন্ত্রণ করছে না। অথচ কুরআন স্পষ্টভাবে বলছে, প্রতিটি ঘটনাই আল্লাহর হুকুম ও অনুমতিক্রমে সংঘটিত হয়।

শুধু সৃষ্টি করাই নয়, আল্লাহ এই বিশ্বজগতের প্রতিপালক, শাসক ও পরিচালক। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তেমনভাবেই এই জগত চালান এবং এই শাসন ব্যবস্থার একজনই মালিক। আল্লাহর এই রুবুবিয়াত বা সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা মানেই তারই ইবাদত করা আবশ্যক। ইবাদতের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো দাসত্ব, আনুগত্য এবং প্রভুর প্রতি শ্রদ্ধা।

আরও

ধৈর্য ও আল্লাহর উপর ভরসাই মুমিনের শক্তি

এই ইবাদত কেবল নামাজ, রোজা, হজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী চলাই তার প্রকৃত রূপ। একজন মুমিনের জীবনে আল্লাহর নির্দেশই চূড়ান্ত এবং তার বাইরে অন্য কোনো কর্তৃত্ব স্বীকৃত নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মানুষ নিজেকে আল্লাহর দাস হিসেবে গড়ে তোলে।

আল্লাহর এই পরিচয় জানার পর মানুষের উচিত একমাত্র তঁার কাছেই মাথা নত করা, তারই আইন ও বিধান অনুযায়ী জীবন গঠন করা এবং অন্য কোনো শাসক বা প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ না করা। ইবাদতের এই তিনটি স্তরই আল্লাহর একক অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি বহন করে।

কুরআনে আরও বলা হয়েছে, আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর আলো। এই আলোর ব্যাখ্যায় তিনি এমন একটি চিত্র তুলে ধরেছেন যা নিঃসন্দেহে মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রভূত্ব ও করুণা সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি তৈরি করে। এটি এমন এক আলো, যা সবদিক থেকে পরিপূর্ণ ও শুদ্ধ, যা আল্লাহ যাকে চান তারই অন্তরে প্রবেশ করান।

সবশেষে হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী দোয়া করেন, মহান আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে তার হুকুম মেনে চলার তাওফিক দান করেন এবং তারই নির্দেশনায় জীবন পরিচালনার শক্তি দান করেন। আমিন।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম সিলেট। সাবেক ইমাম ও খতীব: কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ রহ. মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল: হযরত শাহজালাল রহ. ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা উপশহর সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক: হযরত শাহজালাল রহ. লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা দক্ষিণ সুরমা সিলেট।

আখেরি চাহার শোম্বা তাৎপর্য ও শিক্ষা : হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী।

নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ” আখেরি চাহার শোম্বা তাৎপর্য ও শিক্ষা, এ দিনটি মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে থাকে। ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনে এ দিনটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। ফারসি ভাষায় ‘আখের’ অর্থ শেষ, আর ‘চাহার শোম্বা’ অর্থ বুধবার। অর্থাৎ হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকেই আখেরি চাহার শোম্বা বলা হয়। এ দিনে নবিজি (স.) শেষ বারের মতো রোগ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর শোকর আদায় করেছিলেন বলে প্রতি বছর মুসলমানরা শুকরিয়ার দিবস হিসেবে দিনটি পালন করে থাকেন।

রসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজ, তার সব আচরণ, প্রতিটি পদক্ষেপ তথা সমগ্র জীবনই সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে অনুকরণীয় অনুসরণীয়; যা কুরআনুল করিমে নানা আঙ্গিকে ব্যক্ত হয়েছে। তবে নবুওয়াত জীবনের প্রথম অধ্যায় মক্কি জীবনের ১৩ বছর তাকে নির্মম নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়েছে। হিজরতের পর মদিনায় গিয়েও তাকে ইহুদি-মোনাফেকদের নতুন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। মক্কার কাফেররা মদিনার ইহুদি মোনাফেকদের যোগসাজশে তাকে অশান্তিতে রেখেছিল। নানা কৌশলে তার প্রাণনাশের চেষ্টা পর্যন্ত করেছে। ৭ম হিজরিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর মুহরম মাসে ইহুদিদের একটি চক্র ‘লবিদ ইবনে আসম’ যিনি জাদুবিদ্যায় খুব পারদর্শী ছিলেন, তাকে দিয়ে তারা মুহাম্মদ (স.)-কে জাদু করান। লবিদ কৌশলে নবিজির এক ইহুদি গোলামের মাধ্যমে তার ব্যবহৃত চিরুনি ও চুল সংগ্রহ করে। তারপর মোমের একটি পুতুল বানিয়ে তাতে ১১টি সুচ বিদ্ধ করে একটি সুতায় কুফরি মন্তর পড়ে ১১টি গিট দেয়। সবকিছু পুতুলটির মধ্যে রেখে একটি কূপে পাথরের নিচে চাপা দিয়ে রেখে দেয়। এই জাদুর প্রভাবে রসুলুল্লাহ (স.) শারীরিকভাবে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। অতঃপর হজরত জিবরাইল (আ.) সুরা ফালাক ও সুরা নাস নিয়ে অবতীর্ণ হন। এ দুইটি সুরার আয়াতসংখ্যা ১১। মহান আল্লাহ ওহির মাধ্যমে তার প্রিয় হাবিবকে জানিয়ে দেন—ইহুদি লবিদ আপনাকে জাদু করেছে, আপনি অমুক কূপ থেকে জাদুর সরঞ্জাম তুলে তাতে এই সুরা দুইটির একেকটি আয়াত পাঠ করে ফুঁক দিতে থাকুন। নবিজি হযরত আলী (রাদ্বি.)-এর মাধ্যমে জাদুর সব সরঞ্জাম উদ্ধার করে সুরা ফালাক ও নাসের ১১টি আয়াত পর্যায়ক্রমে পাঠ করালে জাদুর কার্যকরিতা নষ্ট হয়ে যায়, এতে তিনি দ্রুত আরোগ্য লাভ করেন। এরপর নবী (স.) গোসল করেন এবং বলেন আমার শরীরটা এখন অনেক হালকা মনে হচ্ছে, আমি নিজেকে পূর্ণ সুস্থ মনে করছি। এই দিনটি ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার।

নবিজির সুস্থতার খবর পেয়ে একে একে স্ত্রীগণ তার কাছে আসেন, মেয়ে ফাতেমাতুজ জোহরা (রাদ্বি.), ইমাম হাসান ও হুসাইন (রাদ্বি.)-কে নিয়ে উপস্থিত হন। বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরাম নবিজির হুজরার কাছে এসে ভিড় জমান। নবিজি আবেগজড়িত কণ্ঠে সবাইকে বলেন, ‘হে আমার প্রিয় সাহাবি ও ভ্রাতৃবৃন্দ! আমার মৃত্যুর পর, আমার বিয়োগে তোমাদের অবস্থা কীরূপ হতে পারে?’ এ কথা শুনে সবাই কঁাদতে আরম্ভ করেন। তিনি সবাইকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, কেউ চিরকাল থাকে না, আমাকেও আমার রবের হুকুম মানতে হবে, তার কাছে যেতে হবে। এরপর তিনি মসজিদে নববিতে প্রবেশ করে হযরত আবু বকর সিদ্দিককে (রাদ্বি.) ইমামতি করার নির্দেশ করেন। রাসূল (স.)-এর জীবদ্দশায় আবু বকর (রাদ্বি.)-কে দিয়ে ইমামতি করিয়ে তিনি ইঙ্গিত করলেন যে, আমার ইন্তেকালের পর তোমাদের প্রথম খলিফা হবেন, আমার প্রিয় সাথি আবু বকর।

নবিজিকে পূর্ণ সুস্থ দেখে সাহাবায়ে কেরাম খুবই আনন্দিত হন, প্রত্যেকে নিজ সামথর্য অনুযায়ী দান-সাদকা করেন। হজরত আবু বকর (রাদ্বি.) তৎকালীন সময়ে ৫ হাজার দিনার গরিবদের দান করে দেন। হজরত উমার ফারুক (রাদ্বি.) ৭ হাজার দিনার সাদকাহ্ করেন। হজরত ওসমান গনি (রাদ্বি.) করেছিলেন ১০ হাজার দিনার। হযরত আলি (রাদ্বি.) দান করেন ৩ হাজার দিনার। সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাদ্বি.) এই খুশির সংবাদে ১০০ উট আল্লাহর রাস্তায় দান করেন। এ থেকে আমরা শিক্ষা পেতে পারি, নবির প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা কেমন ছিল। এক কথায় বলা যায়, নবি (স.)-এর প্রতি তাদের ভালোবাসা ছিল নিখাদ ও অতুলনীয়। তারা নবিজির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পর্যন্ত দ্বিধা করেননি।

প্রিয় নবি (স.)-এর প্রিয় উম্মতের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে—জীবনের সবকিছুর চেয়ে যেন আমরা নবিজিকে ভালোবাসি, তার অনুসৃত পথে নিজেদের জীবন সাজাই। যেহেতু নবি (স.)-এর রোগমুক্তির দিনটি ছিল সমগ্র জগতের জন্য খুশির দিন, তাই এ দিনে আল্লাহর কাছে আমাদের ফরিয়াদ থাকবে, তিনি যেন যাবতীয় অকল্যাণ থেকে দূরে রেখে আমাদেরকে সুস্থ সুন্দর জীবন দান করেন। আমিন।

লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম সিলেট। সাবেক ইমাম ও খতীব: সিলেট নগরীর কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ রহ. মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল: হযরত শাহজালাল রহ. ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা উপশহর সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক: হযরত শাহজালাল রহ. লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা দক্ষিণ সুরমা সিলেট।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়