মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২২:০৮

ক্ষুদ্র উদ্যোগ আর কঠোর পরিশ্রমে বদলে গেল তানজিনার জীবন

মো. মাসুদ হোসেন
ক্ষুদ্র উদ্যোগ আর কঠোর পরিশ্রমে বদলে গেল তানজিনার জীবন

আমাদের দেশের নারীদের গল্প যেন একেকটি সংগ্রামের আখ্যান। কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে হয়েছেন সফল৷ কেউ টেনে তুলেছেন বিপর্যস্ত পরিবারকে। আবার কেউ কেউ ঝুঁকি জেনেও বিনিয়োগ করে পেয়েছেন সাফল্য৷ তেমনি একজন নারী তানজিনা হক। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এ নারী নিজের জমানো দুই হাজার টাকা নিয়ে শুরু করেন শখের ব্যবসা। নিজের স্বপ্ন ও স্বাধীনতাকে বাস্তবে রূপ দিতেই নেমে পড়েন চ্যালেঞ্জে। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে তানজিনা। এসএসসির আগেই বিয়ে হয়ে যায় তার। বিয়ের কয়েক বছর পরে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নেমে পড়েন মাঠে। নারীদের পোশাক দিয়ে শুরু করা ব্যবসার প্রথমে পরিবারসহ আশপাশের মানুষের অসহযোগিতা ও সমালোচনায় বন্ধ হয়ে যায় তার উদ্যোগ। কিন্তু তিনি হাল না ছেড়ে আবারো দুই হাজার টাকায় শুরু করেন হোম মেইড খাবারের ব্যবসা। তিন সন্তানের এ জননী নিজের হাতে তৈরি সমুচা, সিঙ্গারা, মাসকলাইয়ের ডাল ও আলুর চিপস বিক্রি করা শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পেজ খুলেন তিনি। ঞধহলরহধ’ং টহড়হএযড়ৎ নামে এই পেজের মাধ্যমে পড়তে থাকে খাবারের অর্ডার। একসময় এ খাবারগুলো হয়ে ওঠে তার সিগনেচার পণ্য।

পারিবারিকভাবে হোঁচট খাওয়া এ নারী উদ্যোক্তা তার খাবারের ব্যবসাটিও চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তিনি মনোবল না হারিয়ে নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে থেমে থাকেননি। এক সময় তার এসব হোম মেইড পণ্য নিজ জেলার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছতে থাকে। একপর্যায়ে প্রবাসীরা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে তানজিনার হাতে তৈরি এসব পণ্য বিদেশেও নিয়ে যান। খুব অল্প সময়ে ক্রেতাদের ভালো সাড়া পান তানজিনা। এর মধ্যে পোশাক নিয়ে কাজ করা তার আগের ব্যবসাটিও পুণরায় চালু করেন। এ ব্যবসাটি পরিচালনা করার জন্য ঞৎবহফু ইঁঃঃবৎভষু ঋধংযরড়হ ঐড়ঁংব নামে ফেসবুকে আরেকটি পেজ খুলেন তিনি। তানজিনার ধারণা মতে, উদ্যোক্তা হওয়া শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, বরং নিজের পরিচয় তৈরি করা ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখারও একটি কারন। তিনি বলেন, উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুটা আমার জন্য সহজ ছিল না। পারিবারিকভাবে প্রথম দিকে তেমন কোনো উৎসাহ বা সমর্থন পাইনি। তখন পথচলাটা কিছুটা একা একাই শুরু করতে হয়েছিল। তবে সেই সময়টাতে সফল নারী উদ্যোক্তা মুসকান নূর, নাসরিন আক্তার ও বৃষ্টি আমাকে মানসিকভাবে এবং বিভিন্ন দিক থেকে অনেক সাহস ও সাপোর্ট দিয়েছে। তাদের অনুপ্রেরণা, ভরসা আর পাশে থাকার মানসিকতা আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি যোগায়। তাদের পাশাপাশি যাদের হাত ধরে আমার পথ চলার শুরু হয়েছিল- ডঊ জবষড়ধফবফ (ডড়সবহ ধহফ ব-ঈড়সসবৎপব ঞৎঁংঃ) এবং খধফরবং ঝসরষব (ঈযধহফঢ়ঁৎ এরৎষং এৎড়ঁঢ়)। ধীরে ধীরে যখন আমার কাজ এগোতে শুরু করল এবং সবাই আমার চেষ্টা ও আন্তরিকতা দেখতে পেল, তখন আমার পরিবার ও বন্ধুবান্ধব আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন তারা আমাকে সমর্থন করে, উৎসাহ দেয় এবং আমার স্বপ্নপূরণে পাশে আছে।

তানজিনা হক তার প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর শারীরিক শ্রমকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন তার নিজ গতিতে। প্রথমদিকে তিনি তার অর্ডারগুলো নিজেই গিয়ে কাস্টমারের কাছে ডেলিভারি দিয়ে আসতো। পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে অর্ডারগুলো পৌঁছানোর জন্য একজন ডেলিভারি ম্যান নিয়োগ দেন তিনি। আর দূরের অর্ডারগুলো কুরিয়ারের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া হয়। আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মাত্র দুই হাজার টাকা মূলধনে এখন তার পুঁজি ১৫ লাখের মতো। তার আয় দিয়ে চলছে সাত সদস্যদের পরিবার। এমনকি নিজের সকল খরচও ব্যায় হচ্ছে এই আয় দিয়ে। তার এই উদ্যোগ নিয়ে দেশের নামি-দামি মেলায় অংশগ্রহণ করার পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় উই হাটবাজার নামে দুটি নারী উদ্যোক্তা মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া এই নারী উদ্যোক্তা অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও ভূমিকা রাখতে গত ৫ মাস আগে কুমিল্লার প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। যা তিনি নিজেই পরিচালনা করে আসছেন। উদ্যোক্তা লাইফে তার এমন চেষ্টা সত্যিই প্রশংসারযোগ্য। তিনি দেখিয়েছেন চেষ্টা থাকলে পুরুষদের ন্যায় নারীরাও সমাজে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। চলতি বছরে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে অদম্য নারী (জয়িতা) পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। তার এই উদ্যোগটি এখন গরহরংঃৎু ড়ভ ঈড়সসবৎপব, ইধহমষধফবংয-এ নিবন্ধনপ্রাপ্ত।

নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়া নারী উদ্যোক্তা তানজিনা হক বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শেষ করে নিজের কিছু করা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। কিন্তু পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে আমার পড়ালেখা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও নিজের ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে ভরসা করে আমি জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনভাবে চলা এবং নিজের মত প্রকাশ করার প্রবল ইচ্ছা ছিল, আর সেই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়েই আমার উদ্যোক্তা জীবনের পথচলা শুরু। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নিজেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা ও স্বাবলম্বীতা অর্জন করা। এবং ভবিষ্যতের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারি। পাশাপাশি, উদ্যোক্তা হলে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, যা সমাজ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। তাই উদ্যোক্তা হওয়া শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, বরং নিজের পরিচয় তৈরি করা ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখারও একটি কারন।

তিনি আরো বলেন, গত ৬ বছর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সবার দোয়া-ভালোবাসায় ব্যবসা করে যাচ্ছি। যদিও শুরুতে অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। অনেকেই বলত “অমুকের মেয়ে বা বউ ফেসবুকে খাবার বিক্রি করছে”। পরিবারের ভেতর থেকেও তখন অনেক কথা শুনতে হয়েছে এবং নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সেই কথাগুলো আমাকে কষ্ট দিলেও আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মানুষের কথায় থেমে থাকব না। আমি জানতাম, জীবনে এগিয়ে যেতে হলে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। উদ্যোক্তা হিসেবে ৬ বছর কাটানো আমার জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ঐ সময়টা আমার জন্য একদম সহজ ছিল না, অনেক চ্যালেঞ্জ এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে আমাকে পড়তে হয়েছে। সে থেকে শুরু হয় নিজের ক্ষমতা পরীক্ষা করার এক যাত্রা। শুরুতে নানা বাধা, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করতে হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং সঠিক সমর্থনের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। একটা জেদ সবসময় মাথায় কাজ করতো “আমরা নারী আমরাই পারি “এবং আমাকে পারতে হবে। তবে প্রথম বড় অর্ডারটি সফলভাবে ডেলিভারি করতে পেরে তখন যে আনন্দিত হয়েছিলাম, তখনই নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। আমি নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছি, তেমনি অন্যদেরও উৎসাহ দিচ্ছি। ভবিষ্যতে ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই। আমার সাথে আরো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। আর মেয়েদের বলব, কোনো কাজই ছোট নয়, ভয় পেয়ে বসে থাকলে চলবে না। পরিশ্রম করতে হবে, লেগে থাকতে হবে, তবেই সফলতা আসবেই।

মো. মাসুদ হোসেন : সজকর্মী ও ফিচার লেখক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়