প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১২:২৩
দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় হারিয়ে যাচ্ছে চাঁদপুরের এসবি খাল
পুনরুদ্ধারের দাবিতে জনমত তীব্র

চাঁদপুর শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী এসবি (শ্রীরামদী-বিষ্ণুদী) খাল আজ এক গভীর সংকটের মুখে। যে খালটির একমাথায় ডাকাতিয়ার, আরেক মাথায় মেঘনা নদীর সংযোগ ছিলো। একসময় যেখানে পালতোলা নৌকার ভিড়, স্বচ্ছ পানির প্রবাহ আর শহরের সৌন্দর্য ছিলো চোখে পড়ার মতো। আজ সেখানে জমেছে আবর্জনা, দখলদারিত্ব আর দূষণের কালো ছায়া। স্থানীয়দের ভাষায়, খালটি এখন আর খাল নেই, একটি মৃতপ্রায় নালায় পরিণত হয়েছে।
|আরো খবর
এসবি খালের অতীত ঐতিহ্য, বর্তমান বাস্তবতা, দখল ও দূষণের চিত্র, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে অনুসন্ধান তুলে ধরা হলো এই প্রতিবেদনে।
স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও ভাসে সেই দিনগুলো, যখন এসবি খাল দিয়ে নৌকা চলতো। খালটি মেঘনা নদী থেকে পানি নিয়ে ডাকাতিয়া নদীতে প্রবাহিত হতো এবং জোয়ার-ভাটার স্বচ্ছ পানিতে খাল ছিলো প্রাণবন্ত। শহরের পানি নিষ্কাশনেরও অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিলো এই খাল। একপাশে নিশিরোড উত্তরে কসাইখানা দিয়ে যেটি মেঘনায় পতিত হয়েছে, আর অন্যদিকে শহরের মাঝখান দিয়ে কোড়ালিয়া, কুমিল্লা রোড, ঘোষপাড়া, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়ক এবং জেএম সেনগুপ্ত রোড হয়ে নতুনবাজারের কাছে গিয়ে ডাকাতিয়া নদীতে মিলেছে। এই যখন অবস্থা ছিলো, তখন শহরের পানিপ্রবাহ ও সৌন্দর্য ছিলো চোখে পড়ার মতো।
এই খাল দিয়ে শুধু নৌকা নয়, এটি ছিলো এক ধরনের বিনোদনের মাধ্যমও। মানুষ নৌকায় চড়ে শহরের দৃশ্য উপভোগ করতো। একইসঙ্গে শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ হিসেবে কাজ করতো এই এসবি খাল। বর্তমানে এটি খাল নয়, যেনো ময়লার ভাগাড়। দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, অব্যবস্থাপনা মিলিয়ে বর্তমানে এসবি খালের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। খালের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে গেছে এবং অনেক জায়গায় পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ।
সবচে’ মারাত্মক যে ক্ষতিটি হয়েছে, সেটি হলো এই এসবি খালটি যখন কোড়ালিয়া রোডে ব্রীজের কাছে গিয়ে মিশেছে, সেখানে স্থাপনার কারণে যে কেউ হয়তো মনেও করবে না এখানে দূর অতীতে কোনো খাল ছিলো। কিছু কিছু মানুষ এই খালের ওপর মসজিদ ও পাকাবাড়ি নির্মাণ করেছে। ফলে কোড়ালিয়া ব্রীজ থেকে নিশিরোড হয়ে কসাইখানা পর্যন্ত যে অংশটি ছিলো, তার পুরোটাই মৃত খাল, বলা যায় বিলুপ্ত । দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে একটি খাল ছিলো।
এছাড়াও খালের দুপাড়ের বাসিন্দারা এটি যে যেভাবে পেরেছে দখল করেছে। ভেতরে ও পাড়ে অবৈধ স্থাপনা হিসেবে বহুতল ভবন ও ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ করেছে, শহরের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলেছে, পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের সংযোগ দিয়েছে। ফলে খালের পানি দূষিত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং পরিবেশ হয়ে উঠেছে অস্বাস্থ্যকর।
ইতঃপূর্বে একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালটি এখন সরু নালায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসবি খালের বড়ো অংশ দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভূমিদস্যুদের একটি চক্র, যাতে খালের জমি ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ, স্থায়ী স্থাপনা গড়ে তোলা, সরকারি জায়গাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি দাবি করা যায়।
অনেক দখলদার দাবি করেছেন যে, তারা পৈতৃক জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। তবে বাস্তবে চাঁদপুর পৌর কর্তৃপক্ষের খালের সীমানা নির্ধারণের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এই দখল বৈধ করার চেষ্টা চলছে।
এই এসবি খালটিই ছিলো চাঁদপুর শহরের প্রধান ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এখন সেটি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও হাঁটু সমান পানি জমে যায়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের মতে, খালটি বন্ধ হয়ে গেলে পুরো শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কখনও উন্নতি হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চাঁদপুর পৌরসভার এক কর্মকর্তা জানান, এটি উদ্ধারে সবচে’ বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে পৌরসভা।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসবি খাল শুধু পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাল। কারণ এই খালের দুদিকের গতিপ্রবাহ ঠিক করা হলে চাঁদপুর শহরের ড্রেনেজ সিস্টেম খুবই ভালো থাকবে। শহরের পানি নিষ্কাশনে কোনো সমস্যা হবে না। এতে করে মশা, মাছির উপদ্রব কমবে।
বর্তমানে প্রায়ই চাঁদপুর পৌরসভার পানি সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। প্রায়ই ড্রেনেজ সিস্টেম পানির লাইনের সাথে এক হয়ে ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহ হচ্ছে। এতে শহরবাসী স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। মশা ও রোগের বিস্তার বাড়ছে।
এক প্রতিবেদনে খালটিকে ‘মৃতপ্রায়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চাঁদপুর শহরের বহু বাসাবাড়ির ময়লা ও পয়ঃনিষ্কাশন সরাসরি এসবি খালে ফেলা হচ্ছে। কোনো কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। খাল হয়ে উঠেছে প্রধান ডাম্পিং চ্যানেল। খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হওয়ার ফলে এটি এক ধরনের খোলা নর্দমাতে পরিণত হয়েছে।
মাঝে মাঝে প্রশাসনিক উদ্যোগ শুরু হলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে আর চলমান থাকে না। ইতঃপূর্বে জেলা উন্নয়ন কমিটির সভায় একাধিকবার এসবি খাল পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কিছুই হচ্ছে না।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এসবি খালসহ জেলার ৮টি খাল দখলমুক্ত করা হবে। তবে বাস্তবতা হলো, এই উদ্যোগ এখনো পূর্ণাঙ্গ ফল দিতে পারেনি। বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী খাল ভরাট বা দখল করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এসব আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকায় দখলদাররা অনেক সময় পার পেয়ে যাচ্ছে।
দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই কর্মসূচি জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। চাঁদপুরবাসীর প্রত্যাশা, এসবি খাল দ্রুত দখলমুক্ত করা হবে।
চাঁদপুরের সচেতন নাগরিকদের মতে, এসবি খাল শুধু একটি খাল নয়, এটি শহরের লাইফলাইন। তাদের দাবি : দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কঠোর আইন প্রয়োগ করে এসবি খালটি উদ্ধার করা হোক।
স্থানীয়রা জানান, খাল উদ্ধার সংকটের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে : অবৈধ দখল, প্রভাবশালী মহলের স্থাপনা নির্মাণ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইন প্রয়োগে শৈথিল্য ও জনসচেতনতার অভাব। তাই এখন সময় এসেছে, এসবি খাল পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা। সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে এই খালকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
বর্তমান সরকারের খাল খনন কর্মসূচি, খাল পুনঃরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ১৬ মে শনিবার চাঁদপুর জেলায় সফর করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এদিন খাল খনন কর্মসূচি তিনি উদ্বোধন করবেন। সাধারণ মানুষের অন্যতম দাবি : এদিন যেনো চাঁদপুর পৌরসভার এসবি খাল খনন ও উদ্ধার বিষয়টিও সামনে আসে। চাঁদপুরবাসীর একটাই দাবি, এসবি খাল ফিরিয়ে দাও, শহরকে বাঁচাও।








