মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৮

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া ও শরীরচর্চার গুরুত্ব এবং শিক্ষকের ভূমিকা

ফরিদুল ইসলাম

শিশুর শিক্ষা কেবল বই পড়া, লিখতে শেখা কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য প্রয়োজন শারীরিক সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস। আর এসব গুণ বিকাশের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো খেলাধুলা ও শরীর চর্চা। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্রীড়া ও শারীরিক শিক্ষাকে কোনো অতিরিক্ত বা অবকাশকালীন কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি শিশুর সামগ্রিক শিক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বিষয়টি নীতিগতভাবেও স্বীকৃত। জাতীয় শিক্ষাক্রমের প্রাথমিক স্তরে শারীরিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে ‘শারীরিক শিক্ষা’ পৃথক বিষয় হিসেবে রয়েছে এবং বিভিন্ন শ্রেণির জন্য এ বিষয়ের শিক্ষক নির্দেশিকাও (টিচার্স গাইড) প্রকাশ করা হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ‘বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল (শারীরিক শিক্ষা)’ সংরক্ষিত রয়েছে। অর্থাৎ শারীরিক শিক্ষা পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের সরকারি প্রশিক্ষণ কাঠামো বিদ্যমান।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বর্তমান আইন ও বিধিমালার তালিকায় ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’ রয়েছে। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কাঠামোয় প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য পৃথক ‘ক্রীড়া শিক্ষক’ বা ‘শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক’ পদ রয়েছে—এমন বিধান এই সরকারি শিক্ষক নিয়োগ কাঠামোয় দেখা যায় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, শারীরিক শিক্ষার গুরুত্ব নেই। বরং বিষয়টি বিদ্যালয়ের বিদ্যমান শিক্ষক কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষক সহায়িকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় ‘শারীরিক শিক্ষা’ আলাদা প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ‘চঊগওঝ’-এর শিক্ষক-তথ্য ব্যবস্থাপনাতেও এটি তালিকাভুক্ত।

এখানে একটি বাস্তবসম্মত প্রশ্ন সামনে আসে—প্রতিটি বিদ্যালয়ে যদি আলাদা ক্রীড়া শিক্ষক না থাকেন, তাহলে শারীরিক শিক্ষা কার্যক্রম কে পরিচালনা করবেন? এর যৌক্তিক উত্তর হলো—বিদ্যালয়ের বিদ্যমান শিক্ষকদের মধ্য থেকে দায়িত্ব বণ্টন, প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যক্রমটি পরিচালনা করা। তবে ‘প্রতিটি বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে অবশ্যই শারীরিক শিক্ষায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে’—এমন নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক সরকারি নির্দেশনা সরকারি উৎসগুলোতে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায় না। তাই এটিকে সরকারি বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে দাবি না করে নীতিগতভাবে একটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা অধিক নির্ভুল।

শিশুর শারীরিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি হলো প্রাথমিক বয়স। এই সময়ে নিয়মিত দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা, ব্যায়াম ও শারীরিক কর্মকাণ্ড শিশুর চলনক্ষমতা, ভারসাম্য, সমন্বয় ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে খেলাধুলা শিশুর মধ্যে দলগত সহযোগিতা, নেতৃত্ব, নিয়ম মেনে চলা, জয়-পরাজয় মেনে নেওয়া এবং অন্যকে সম্মান করার মতো সামাজিক গুণ তৈরি করে। শুধু মাঠের খেলাই নয়—সহজ শরীরচর্চা, মুক্ত হাওয়ায় হাঁটা, দৌড়, লাফ, ভারসাম্য অনুশীলন, ছন্দময় ব্যায়াম কিংবা বয়সোপযোগী খেলাও বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হতে পারে।

অনেকের ধারণা, খেলাধুলায় বেশি সময় দিলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একটি শিশু দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকলে তার মনোযোগ ও সক্রিয়তা কমে যেতে পারে। পরিকল্পিত শারীরিক কার্যক্রম শিশুকে সতেজ করে আবার শেখার পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই শারীরিক শিক্ষাকে পড়াশোনার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে শিক্ষার সহায়কে হিসেবে দেখতে হবে। একটি সুস্থ শরীর শিশুর শেখার সক্ষমতাকেও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্রীড়া ও শরীরচর্চার সাফল্য অনেকাংশেই শিক্ষকের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষককে শুধু ‘খেলার সময় মাঠে পাঠানো’র দায়িত্ব নিলে হবে না। কোন বয়সের শিশুর জন্য কোন ধরনের কার্যক্রম উপযোগী, কতক্ষণ করা নিরাপদ, কীভাবে সবাইকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যায়—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। বিশেষ করে মেয়েশিশু, শারীরিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিশু কিংবা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা যেন খেলাধুলা থেকে বাদ না পড়ে, সে বিষয়ে শিক্ষককে সংবেদনশীল হতে হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে খেলাধুলার উদ্দেশ্য শুধু বিদ্যালয়ের জন্য চ্যাম্পিয়ন তৈরি করা নয়; বরং প্রত্যেক শিশুকে আনন্দের সঙ্গে শারীরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিশু দৌড়ে প্রথম হতে না পারলেও সে যদি নিয়মিত দৌড়ায়, দলগত খেলায় অংশ নেয়, সহপাঠীর সঙ্গে সহযোগিতা করতে শেখে এবং পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে—তবুও সে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন লাভ করছে। তাই বিদ্যালয়ের ক্রীড়া কার্যক্রমে ‘কে সেরা’ প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কে অংশ নিল’, ‘কে নতুন কিছু শিখল’ এবং ‘কে আত্মবিশ্বাসী হলো’—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক একাডেমিক পরিকল্পনার পাশাপাশি একটি বাস্তবসম্মত বিদ্যালয়ভিত্তিক শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময়ে শারীরিক শিক্ষা, দৈনিক সংক্ষিপ্ত শরীরচর্চা, বয়সভিত্তিক খেলাধুলা, আন্তঃশ্রেণি প্রতিযোগিতা এবং বার্ষিক ক্রীড়া আয়োজন—এসব পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। যেসব বিদ্যালয়ে মাঠের সংকট রয়েছে, সেখানে বিদ্যালয়ের ছাদ, খোলা জায়গা কিংবা স্থানীয় নিরাপদ স্থান ব্যবহারের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে শিশুর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্তমান কাঠামোয় পৃথক ক্রীড়া শিক্ষক পদ না থাকলেও প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত একজন শিক্ষককে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া পরিচালনায় বিশেষভাবে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের যেহেতু শারীরিক শিক্ষার বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল রয়েছে, তাই বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কাঠামোকে আরও পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে উপজেলা বা থানা পর্যায়ে ‘শারীরিক শিক্ষা মাস্টার ট্রেইনার’ তৈরি করে বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষিত শিক্ষক পরবর্তীতে নিজ বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদেরও মৌলিক কৌশল শেখাতে পারবেন।

এটি ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিদ্যালয়ের আকার, মাঠের সুযোগ, ক্রীড়া অবকাঠামো এবং সরকারের জনবল কাঠামো বিবেচনা করে বড় বিদ্যালয়গুলোতে পৃথক শারীরিক শিক্ষা/ক্রীড়া শিক্ষক পদ সৃষ্টির বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সব বিদ্যালয়ে অবিলম্বে পৃথক পদ সৃষ্টি করা সম্ভব না হলেও অন্তত প্রশিক্ষিত দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক, নির্ধারিত সময়সূচি, প্রয়োজনীয় ক্রীড়া উপকরণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা সম্ভব।

শারীরিক শিক্ষা শিক্ষাক্রমে থাকলেই হবে না; বাস্তবে তা কতটা চর্চা হচ্ছে, সেটাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। উপজেলা শিক্ষা অফিস, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় শারীরিক শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। বিদ্যালয়ে ক্রীড়া উপকরণ আছে কি না, সেগুলো ব্যবহার হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত অংশ নিচ্ছে কি না এবং কোনো শ্রেণি বা শিক্ষার্থী বাদ পড়ছে কি না—এসবও পর্যবেক্ষণের আওতায় আসা উচিত।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শুধু ভবিষ্যতের পরীক্ষার্থী নয়, সে ভবিষ্যতের নাগরিক। তাকে যদি আমরা সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও সহযোগিতাপ্রবণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি মাঠকেও শিক্ষার অংশ করতে হবে। সরকারি নীতিতে শারীরিক শিক্ষা ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের অংশ এবং এ বিষয়ে শিক্ষক সহায়িকা ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও রয়েছে। এখন প্রয়োজন এর বাস্তব প্রয়োগকে আরও সুসংগঠিত করা। প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, নির্দিষ্ট সময়সূচি, পর্যাপ্ত ক্রীড়া উপকরণ, নিরাপদ খেলার পরিবেশ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা গেলে প্রাথমিক শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভব। কারণ শিশুর হাতে শুধু বই নয়, বলও থাকা দরকার; শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, মাঠও তার শিক্ষার জায়গা। শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করা, তাহলে শরীরচর্চা ও ক্রীড়া কোনো অতিরিক্ত আয়োজন নয়—এটি সেই শিক্ষারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ফরিদুল ইসলাম : চিন্তক, কবি ও প্রাবন্ধিক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়