প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৫
চাঁদপুরে প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ ঘিরে ফুটবলের নবজাগরণ
৫০৪ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দল গঠন, চলছে নিবিড় প্রস্তুতি—জাতীয় পর্যায়ে কাপ জয়ের স্বপ্ন শিক্ষার্থীদের

চাঁদপুরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফুটবলকে জনপ্রিয় করা, প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করা এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় মানের ফুটবলার তৈরির লক্ষ্যে ‘প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। জেলার ৫০৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে এক বিশাল ফুটবল কাঠামো। ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দল গঠন, বাছাই ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
জেলা প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ, ক্রীড়া বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান এবং কোচদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ আয়োজনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক এতো বড় ফুটবল আয়োজন দেশের ফুটবলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুরে মোট ৫০৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মাদ্রাসা, বালিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মহিলা মাদ্রাসাও রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাই করে দল গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, “প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য আমাদের সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। জেলার উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক উপজেলাকে চারটি করে জোনে ভাগ করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।”
তিনি জানান, প্রথমে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে জেলা, উপ-শিক্ষা অঞ্চল, শিক্ষা অঞ্চল হয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। “আমরা অত্যন্ত আশাবাদী, চাঁদপুরের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে খেলবে এবং ভালো ফলাফল অর্জন করবে”—বলেন জেলা প্রশাসক।
জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল্লাহ বলেন, জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতোমধ্যে ক্রীড়া কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে যারা ফুটবলে পারদর্শী, তাদের নিয়ে দল গঠন করা হয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয় ও কলেজের প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা শিক্ষা অফিসও এ বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রস্তুত রয়েছে। এখন সরকারঘোষিত উদ্বোধনের দিনের অপেক্ষা।
হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন জানান, হাজীগঞ্জের ৩৩টি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোকে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খেলোয়াড় বাছাই ও দল গঠনের কাজ শেষ হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত।
চাঁদপুর সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপের জন্য কলেজে ইতোমধ্যে দল গঠন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। চাঁদপুর সরকারি কলেজের দল সর্বোচ্চ পর্যায়ে ভালো করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মো. আফাজ উদ্দিন বলেন, “এই কর্মসূচিকে ঘিরে ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রয়েছে। প্রত্যেক উপজেলাকে চারটি করে জোনে ভাগ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।” তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক এ আয়োজন থেকে নতুন খেলোয়াড় উঠে আসার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। চাঁদপুরের সাম্প্রতিক ফুটবল সাফল্যও এ ক্ষেত্রে আশাবাদ তৈরি করছে।
চ্যাম্পিয়ন বাবুরহাটের লক্ষ্য এবার জাতীয় শিরোপা
২০২৫ সালের চাঁদপুর জেলা আন্তঃকলেজ ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে বাবুরহাট উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ। বিভাগীয় পর্যায়ে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ডে জয় পেলেও তৃতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নেয় দলটি। এবার প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপকে সামনে রেখে আরও বড় স্বপ্ন দেখছে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি।
বাবুরহাট উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোশারফ হোসেন বলেন, “আমাদের স্কুল থেকে ছেলে ও মেয়েদের দুটি এবং কলেজ শাখা থেকে দুটি—মোট চারটি দল প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিটি দলে ১৬ জন করে খেলোয়াড় রয়েছে। তারা নিয়মিত অনুশীলন করছে। আমাদের লক্ষ্য এবার কাপ জয় করা।”
স্কুল শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন, “বাবুরহাট একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং খেলাধুলাসহ সকল ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানটি জেলার সেরা। আমরা নিজেদের প্রমাণ করে জাতীয় পর্যায়ে খেলে চ্যাম্পিয়ন হবো।”
স্কুল শাখার ক্রীড়া শিক্ষক ওমর হোসাইন বলেন, উপজেলা, জেলা, উপ-শিক্ষা অঞ্চল ও শিক্ষা অঞ্চল পর্যায়ের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে জয়লাভের লক্ষ্য নিয়েই তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কলেজ শাখার টিম ম্যানেজার ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, গত বছর জেলা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। খেলোয়াড়দের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এবার প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপে দেশসেরা হওয়ার স্বপ্ন তাদের।
খেলাধুলায় শরীর-মন, নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার বিকাশ
বাবুরহাট উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের কলেজ শাখার খেলোয়াড় রাকিব পাঠান বলেন, খেলাধুলা পড়াশোনায় মনোযোগী হতে সহায়তা করে। ফুটবলের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি সতেজ ও সুস্থ থাকা যায়। পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীরাও খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিচ্ছেন।
ফুটবল কোচ ইউসুফ বকাউল বলেন, শিক্ষার্থীদের ফুটবল দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের ভবিষ্যতে আরও বড় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
অন্যদিকে কলেজ শাখার খেলোয়াড় সেঁজুতি চৌধুরী জানান, তিনি তিন বছর ধরে ফুটবল খেলছেন। এবার বাবুরহাট উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে লতা সরকার, মাইদা ইসলাম, রাবেয়া ইসলাম জয়া ও বর্ষাসহ অন্য নারী খেলোয়াড়রাও নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
কেন প্রয়োজন এমন আয়োজন
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে ফুটবলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো তৃণমূল পর্যায় থেকে নিয়মিত প্রতিভা খুঁজে বের করা। বড় পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রতিযোগিতা হলে প্রত্যন্ত এলাকার মেধাবী খেলোয়াড়রাও নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শারীরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা, দলগত কাজ, নেতৃত্বের গুণাবলি ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা গড়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের মূল লক্ষ্যও কেবল একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজন নয়; বরং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করে সুস্থ, মেধাবী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলা। মাঠে ফিরলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার চর্চা বাড়বে এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞ ও ক্রীড়াসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ধারাবাহিক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা গেলে এখান থেকেই ভবিষ্যতের জাতীয় দল ও পেশাদার ফুটবলের জন্য খেলোয়াড় বাছাই করা সম্ভব হবে। স্কুল-মাদ্রাসা-কলেজের মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে নারী ফুটবলেও তৈরি হতে পারে নতুন প্রতিভা।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্টে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি শিক্ষার্থীদের মাঠমুখী করার পাশাপাশি চাঁদপুরের ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা করবে। আর সেই স্বপ্ন নিয়েই এখন ৫০৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে চলছে প্রস্তুতি—লক্ষ্য উপজেলা পেরিয়ে জেলা, অঞ্চল এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ের শিরোপা।






