মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪১

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও বাংলাদেশে শিক্ষকতা

এম. আব্দুল আজিজ শিশির
বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও বাংলাদেশে শিক্ষকতা

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা হলো মানুষের মৌলিক অধিকার। আর এই মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে শিক্ষা বাস্তবায়নের মূল কাণ্ডারী হলেন শিক্ষক। শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানই করেন না, তিনি একজন শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটান; নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা ও আচার-আচরণ শেখান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলোর পথ দেখান। প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। প্রতিবছরের ন্যায় আজও বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে : ঝঃধহফরহম রিঃয ঃবধপযবৎং : ৬০ ুবধৎং ড়ভ ঢ়ৎড়ঃবপঃরহম ঃযব ঢ়ৎড়ভবংংরড়হ, ধফাধহপরহম রঃং ংঃধঃঁং ধহফ ংযধঢ়রহম ড়ঁৎ ভঁঃঁৎবং. বাংলায় যার ভাবার্থ হলো—শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো, পেশা রক্ষা, মর্যাদার উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ৬০ বছর।

দিবসটি শিক্ষকদের অসামান্য অবদানকে স্মরণ করার পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা ও প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়নের একটি বিশেষ সুযোগ।

১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব ও মর্যাদা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ‘আইএলও/ইউনেস্কো সুপারিশমালা’ গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বিশ্বের শতাধিক দেশে এই দিবসটি উদযাপিত হয়, যার উদ্দেশ্য শিক্ষক সমাজের অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করা।

শিক্ষকদের বলা হয় সমাজ সংস্কারক ও জাতি গড়ার কারিগর। একটি দেশ কতোটুকু সমৃদ্ধ হবে, তা নির্ভর করে সে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর—আর শিক্ষার গুণগত মান নির্ভর করে শিক্ষকের যোগ্যতার ওপর। মা-বাবা সন্তানকে জন্ম দেন, কিন্তু শিক্ষক সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলেন। সত্য বলা, শৃঙ্খলা মানা, দেশপ্রেম ও মানবিকতাবোধ গড়ে তোলার পেছনে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। মুখস্থবিদ্যার বাইরে গিয়ে চিন্তাশীল ও সৃষ্টিশীল নাগরিক গড়ে তুলতে শিক্ষক অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

আজকের ছাত্রই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ কিংবা উদ্ভাবক। তাদের মেধা ও দক্ষতাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে একজন যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন একজন দক্ষ শিক্ষক।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও জীবনধারায় বাংলাদেশে শিক্ষকতায় রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে শিক্ষকতার ধরনে নানা পরিবর্তন এসেছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে অনলাইন শিক্ষা এবং বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর যুগে শিক্ষকদের নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। তবে আধুনিক যুগেও শিক্ষকের বিকল্প প্রযুক্তি হতে পারে না; কারণ মানবিক মূল্যবোধ, সহানুভূতি ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা কেবল মানুষেরই রয়েছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশা আজও কিছু মৌলিক সংকটের মুখোমুখি। প্রথমত মর্যাদার দিক ও উপযুক্ত বেতনের দিকে তাকালে দেখা যায়, উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিকভাবে উপযুক্ত মর্যাদা প্রদান করা হয় না। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ বেতন, সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করা হলেও বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেতন পান ১৩তম গ্রেডে; মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেতন পান ১১তম গ্রেডে এবং বিএড ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর ১০ম গ্রেডে। এছাড়া শিক্ষকতা পেশায় নেই কোনো পদোন্নতি। দীর্ঘদিন যাবৎ একই পদে চাকরি করে অবসরে যেতে হয়। বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা পান নামমাত্র।

তাছাড়া প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই রয়েছে শিক্ষকস্বল্পতা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদের অধিকাংশই শূন্য। ফলে শিক্ষকদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে বছরের পর বছর। তাই শিক্ষকতা মহান পেশা বা ব্রত হলেও এখন আর মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়, অনেকেই শিক্ষকতা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে লোভনীয় চাকরি বিসিএস-এ শিক্ষকতাকে কেউ তার ক্যাডার পছন্দের তালিকায় প্রথমে রাখতে চায় না; পছন্দের তালিকায় তলানিতে থাকে শিক্ষকতা। আবার কারও শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি হলে প্রাণপণ চেষ্টা করে পরের বিসিএসে অন্য ক্যাডারে চলে যেতে।

এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্যের দিকে ভালোভাবে নজর দিলেই অনুধাবন করা যায় যে, বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশাটিকে বাঁচিয়ে রাখা কতোটা জরুরি হয়ে পড়েছে। পরিবর্তনশীল আধুনিক শিক্ষাক্রমের সাথে তাল মেলাতে বাংলাদেশের শিক্ষকদের পর্যাপ্ত ও আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে শিক্ষকদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত পাঠদানের পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত।

তাই একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠন করতে হলে এবং মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষকতা পেশার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মান বাড়াতে হবে :

* মেধাবী তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো ও মর্যাদা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

* আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষণপদ্ধতি ও গবেষণার ওপর শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

* একই সাথে শিক্ষকদেরও নিজেদের জ্ঞান আপডেট রাখা এবং পেশাগত সততা বজায় রাখা আবশ্যক।

শিক্ষক হলেন দীপশিখার মতো, যিনি নিজে জ্বলে অন্যকে আলোকিত করেন। ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এবং তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন। উপযুক্ত মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের ক্ষমতায়িত করা গেলেই একটি উন্নত, শিক্ষিত ও মানবিক সমাজ নির্মাণ করা সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশ একদিন উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

লেখক পরিচিতি : সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি), হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়