বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:২৪

স্মরণকালেও চাঁদপুরে এতোটা ইলিশ সঙ্কট দেখা যায় নি, উত্তরণের উপায় কী?

অনলাইন ডেস্ক
স্মরণকালেও চাঁদপুরে এতোটা ইলিশ সঙ্কট দেখা যায় নি, উত্তরণের উপায় কী?

চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে ইলিশ নেই—এটি নিছক একটি মৌসুমি মন্দা নয়; বরং দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের ভবিষ্যৎ, নদীর স্বাস্থ্য এবং নদীনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। যে চাঁদপুর একসময় পদ্মা-মেঘনার রূপালি ইলিশের প্রাচুর্যের প্রতীক ছিলো, সেই চাঁদপুরের ঐতিহাসিক বড় স্টেশন মাছঘাটে এখন ইলিশের সরবরাহ এতোটাই কম যে, জেলে, আড়তদার, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন সংকট সাম্প্রতিক সময়ে তো বটেই, স্মরণকালে খুব কমই দেখা গেছে। প্রশ্ন হলো—কেন এমন হচ্ছে এবং এর উত্তরণই বা কী?

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, সংকটের পেছনে একটি নয়, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও উদ্বেগজনক কারণ পদ্মা-মেঘনার নাব্যতা সংকট এবং নদীর বুকে একের পর এক ডুবোচর ও নতুন চর জেগে ওঠা। ইলিশ প্রজনন ও খাদ্যের সন্ধানে নদীর উজানে যাওয়ার সময় সাধারণত গভীর পানির পথ অনুসরণ করে। নদীর তলদেশে পলি জমে গভীরতা কমে গেলে এবং স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে ইলিশের চলাচলের পথও বদলে যেতে পারে। ফলে যে নদী একসময় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণের উপযোগী ছিলো, সেটিই ক্রমে তার জন্যে প্রতিকূল হয়ে উঠছে।

এখানে বিষয়টি শুধু ‘নদী খনন’ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নদী একটি জীবন্ত ও গতিশীল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। কোথায় পলি জমছে, কোথায় ডুবোচর তৈরি হচ্ছে, নদীর স্রোতের গতিপথ কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সেই পরিবর্তন ইলিশের অভিপ্রয়াণ ও প্রজননে কী প্রভাব ফেলছে—এসব বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করেই ড্রেজিংয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যত্রতত্র খনন করে সাময়িক গভীরতা তৈরি করা আর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এক কথা নয়। তাই প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক, নিয়মিত ও সমন্বিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং ব্যবস্থাপনা। তবে শুধু নাব্যতা ফিরিয়ে আনলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। ইলিশের সংকটের আরেকটি বড় কারণ নদীতে নির্বিচারে অবৈধ জালের ব্যবহার। অভয়াশ্রমে কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারির মতো নিষিদ্ধ ও ধ্বংসাত্মক জালের ব্যবহার বন্ধে বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি সময়ে অভিযান চালালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কারণ ইলিশ রক্ষার বিষয়টি মৌসুমি অভিযাননির্ভর হলে সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে মাছ ধরার বিরুদ্ধে যেমন কঠোর অবস্থান প্রয়োজন, তেমনি নিষিদ্ধ জাল উৎপাদন, বিপণন ও সরবরাহের বিরুদ্ধেও সমান কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

আরেকটি বড় উদ্বেগ নদীদূষণ। শিল্পবর্জ্য, পৌরবর্জ্য, প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের দূষণ নদীর জলজ প্রতিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়; এটি নদীর সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীর পানির গুণগত মান ও খাদ্যশৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইলিশের ওপর তার প্রভাব পড়বেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, পানির তাপমাত্রার পরিবর্তন, সমুদ্র ও নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনসহ বৃহত্তর কিছু বিষয়। অতএব ইলিশ রক্ষায় আমাদের নীতিও হতে হবে সমন্বিত—শুধু মাছ ধরার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ইলিশের সংকটের সরাসরি আঘাতটি পড়ছে জেলেদের ওপর। নদীতে গিয়ে জ্বালানি, বরফ, শ্রমিক ও নৌকার খরচ তোলার মতো মাছ না পেলে একজন জেলে কীভাবে সংসার চালাবেন? ইলিশ সংরক্ষণের জন্য যখন জেলেদের মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়, তখন তাদের জীবিকার বিষয়টিও রাষ্ট্রকে বিবেচনায় নিতে হয়। প্রকৃত জেলেদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, খাদ্যসহায়তা ও বিকল্প আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করাও কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত প্রকৃত জেলের সংখ্যা, জেলে পরিচয়পত্র এবং সরকারি সহায়তা বিতরণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

চাঁদপুরের বড় স্টেশন মাছঘাটের বর্তমান চিত্রও আমাদের ভাবিয়ে তোলার মতো। যে ঘাটে একসময় ইলিশের হাঁকডাক, নিলাম ও বেচাকেনার ব্যস্ততায় মুখর থাকতো, সেখানে এখন নেমে এসেছে স্থবিরতা। স্থানীয় পদ্মা-মেঘনার ইলিশের ঘাটতি পূরণ করতে বাইরের উপকূলীয় এলাকা থেকে মাছ আসছে। এর ফলে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী ইলিশবাণিজ্যের ওপর চাপ পড়ছে এবং সরবরাহ কম থাকায় বাজারে দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ নদীতে ইলিশ কমে যাওয়া শুধু জেলের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ছে ভোক্তা, ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সামগ্রিক স্থানীয় অর্থনীতির ওপর।

এই পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হওয়া উচিত সমস্যাটিকে অস্বীকার না করে এর প্রকৃত কারণ নিরূপণ করা। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা নদীর বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে যে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, তা দ্রুত সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। কোথায় ডুবোচর, কোথায় নদীর গভীরতা কমেছে, ইলিশের চলাচলের সম্ভাব্য পথ কোন্ দিকে পরিবর্তিত হয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেখানে প্রয়োজন সেখানে জরুরি ভিত্তিতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করতে হবে। তবে ড্রেজিংয়ের নামে যেন অর্থ অপচয় না হয়, সে জন্য খননের আগে ও পরে নদীর গভীরতা, স্রোতের গতি, পলি জমার প্রবণতা এবং ইলিশের বিচরণ—সবকিছুর বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ থাকা দরকার। ড্রেজিংয়ের ফলাফলও নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। একবার খনন করে দায়িত্ব শেষ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নদীর নাব্যতা ব্যবস্থাপনাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিতে হবে। শুধু জেলে ধরে জরিমানা করলেই হবে না; নিষিদ্ধ জালের উৎপাদন, মজুত, পরিবহন ও বিপণনের পুরো চক্র ভেঙে দিতে হবে। নদীতে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড এবং জেলে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। চতুর্থত, ইলিশ সংরক্ষণকে নদী রক্ষার বৃহত্তর কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নদীদূষণ বন্ধ, দখল রোধ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ইলিশ রক্ষা করা যাবে না। কারণ একটি সুস্থ নদীই পারে একটি সুস্থ ইলিশভাণ্ডার তৈরি করতে।

সবশেষে সবচেয়ে জরুরি হলো—চাঁদপুরের বর্তমান সংকটকে বিচ্ছিন্ন কোনো স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। পদ্মা-মেঘনা বাংলাদেশের প্রাণপ্রবাহের অংশ। এই নদীগুলোর সঙ্গে ইলিশের জীবনচক্র, লাখো মানুষের জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ; অথচ জাতীয় মাছের আবাসস্থল নদী যদি নাব্যতা হারায়, দূষিত হয় এবং অবৈধ আহরণে বিপর্যস্ত হয়, তবে শুধু ইলিশের প্রাচুর্য নিয়ে গর্ব করার সুযোগ থাকবে না। চাঁদপুরের মাছঘাটে আজ যে নীরবতা নেমে এসেছে, সেটিকে তাই একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই নিতে হবে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে আজকের সংকট আগামী দিনের স্থায়ী বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত ড্রেজিং, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নিষিদ্ধ জাল নির্মূল, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ইলিশের অভয়াশ্রম কার্যকরভাবে রক্ষা এবং প্রকৃত জেলেদের জীবিকা সুরক্ষা—এই ছয়টি বিষয়ের সমন্বিত বাস্তবায়ন।

ইলিশ রক্ষার নামে শুধু জেলেকে নিয়ন্ত্রণ করলে চলবে না; ইলিশের নদীটিকেও বাঁচাতে হবে। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা যদি আবার তার স্বাভাবিক প্রাণ ফিরে পায়, তবেই মাছঘাটে ফিরবে সেই চেনা কোলাহল, জেলের মুখে ফিরবে হাসি, আর সাধারণ মানুষের পাতে ইলিশ পৌঁছাবে তুলনামূলক সুলভে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। চাঁদপুরের ইলিশের এই হাহাকারকে যদি আমরা আরেকটি মৌসুমি খবর হিসেবে পাশ কাটিয়ে যাই, তবে আগামী দিনে হয়তো প্রশ্নটি হবে—ইলিশ কোথায় কমেছে নয়, আমাদের নদীগুলো ইলিশের জন্য আদৌ কতোটা উপযোগী আছে?

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়