প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৪
শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা রক্ষাই হোক সংস্কারের মূল লক্ষ্য
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান, মেধার মূল্যায়ন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সরাসরি জড়িত। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (ঘঞজঈঅ) মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন হতে পারে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষকপ্রার্থী, কর্মরত শিক্ষক এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ঘঞজঈঅ-সংক্রান্ত একটি পর্যালোচনা সভার কথিত কার্যবিবরণীর একটি কপি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রচারিত নথির সংশ্লিষ্ট অংশে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী ঘঞজঈঅ এখন থেকে কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে এবং ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না। একই নথিতে ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিয়োগের একটি ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা তৈরি হয় যে, শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব আবার ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরে যাচ্ছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষামন্ত্রী আ.ন.ম. এহসানুল হক মিলন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। তিনি আরও জানিয়েছেন, ঘঞজঈঅ-এর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দর করার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নথিকে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। ঘঞজঈঅ-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটেও শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে।
এখানে মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত: শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, শুধু সেটিই কি মুখ্য? নাকি নিয়োগের পদ্ধতিটি কতটা স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত, সেটিই আসল বিবেচ্য?
নিঃসন্দেহে বর্তমান ঘঞজঈঅ-ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নিবন্ধন পরীক্ষা, শূন্য পদের তথ্য সংগ্রহ, গণবিজ্ঞপ্তি, অনলাইন আবেদন, পছন্দক্রম এবং নিয়োগ সুপারিশের পুরো প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ, বিষয়ভিত্তিক শূন্য পদের অসামঞ্জস্য, প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষক চাহিদার পরিবর্তন এবং প্রার্থীদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ না পাওয়ার মতো সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সংস্কারের দাবি রাখে। কিন্তু একটি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলেই সেটি বাতিল করে এমন একটি পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া সমাধান হতে পারে না, যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে স্বজনপ্রীতি, তদবির, অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল।
ঘঞজঈঅ-ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, অন্তত নীতিগতভাবে, একজন শিক্ষকপ্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতা বা আর্থিক সামর্থ্যের পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একজন প্রার্থী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা হলেও একই পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধার ভিত্তিতে অন্য প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারেন। এই নীতিগত সমতা কোনোভাবেই বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে সরাসরি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সম্ভাব্য ঝুঁকিও অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে যেখানে নিয়োগদাতা ও চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এবং স্থানীয় প্রভাব কাজ করার সুযোগ থাকে, সেখানে যোগ্যতার তুলনায় পরিচিতি, সুপারিশ কিংবা আর্থিক লেনদেন প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রকৃত মেধাবী ও অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল প্রার্থীরা।
শিক্ষক নিয়োগ কোনো সাধারণ চাকরিতে নিয়োগ নয়। একজন শিক্ষক প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থীর জ্ঞান, মূল্যবোধ ও মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখেন। ফলে শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সামান্য অনিয়মের প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদে পুরো সমাজকে বহন করতে হয়। একজন অযোগ্য ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া মানে শুধু একজন যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করা নয়; একই সঙ্গে অসংখ্য শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ওপর ঝুঁকি তৈরি করা।
তাই ঘঞজঈঅ-এর সংস্কার প্রয়োজন হলে সেটি অবশ্যই হওয়া উচিত, কিন্তু সংস্কারের লক্ষ্য হতে হবে আরও শক্তিশালী, দ্রুত, আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত একটি কেন্দ্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রয়োজনে ঘঞজঈঅ-কে পুনর্গঠন করা যেতে পারে। পরীক্ষার কাঠামো আধুনিক করা যেতে পারে, বিষয়ভিত্তিক মেধাক্রম আরও কার্যকর করা যেতে পারে, শূন্য পদের তথ্যকে রিয়েল-টাইমে হালনাগাদ করা যেতে পারে এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও অডিটযোগ্য করা যেতে পারে।
আরও একটি বিকল্প গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (চঝঈ)-এর আদলে একটি স্বতন্ত্র ‘বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে, যা নিবন্ধন, যোগ্যতা যাচাই, পরীক্ষা, মেধাক্রম ও নিয়োগ সুপারিশের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা পরিচালনা করবে। এতে ঘঞজঈঅ-এর বর্তমান কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বাধীন করা সম্ভব হতে পারে।
তবে যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হোক, কয়েকটি বিষয় অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে: শূন্য পদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ, কেন্দ্রীয়ভাবে মেধা যাচাই, স্বচ্ছ মেধাক্রম, অনলাইনভিত্তিক আবেদন ও সুপারিশ, নিয়োগের প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বাধীন ব্যবস্থা। একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাব বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ যাতে না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেহেতু শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে পর্যালোচনা করছে, তাই এ বিষয়ে হঠাৎ কোনো পরিবর্তনের পরিবর্তে শিক্ষক, শিক্ষকপ্রার্থী, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। একটি স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করে তা প্রকাশ্যে জানানোও জরুরি। কারণ অস্পষ্টতা যত বাড়বে, গুজব ও অপতথ্য তত দ্রুত ছড়াবে।
সবশেষে বলা যায়, ঘঞজঈঅ থাকল কি থাকল না, সেটি মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো শিক্ষক নিয়োগে মেধা, যোগ্যতা ও সততার বিজয় নিশ্চিত করা। বর্তমান ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমন কোনো পরিবর্তন করা উচিত নয় যাতে শিক্ষক নিয়োগ আবার প্রভাব, তদবির ও অর্থের কাছে জিম্মি হওয়ার সুযোগ পায়। শিক্ষা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে, আর সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর শিক্ষক। তাই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এক ইঞ্চি অস্বচ্ছতাও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় মূল্য ডেকে আনতে পারে।
সংস্কার হোক, আধুনিকায়ন হোক, প্রয়োজনে নতুন কমিশনও হোক; কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের মূলনীতি একটাই হওয়া উচিত যোগ্যতম প্রার্থীই হবেন যোগ্যতম প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক।
মোহাম্মদ আরিফ ইমাম : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, বেলচোঁ কারিমাবাদ ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।








