মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৬

শিক্ষা আনন্দময় করতে প্রয়োজন নির্দেশ না মোটিভেশন

মাছুম বিল্লাহ
শিক্ষা আনন্দময় করতে প্রয়োজন নির্দেশ না মোটিভেশন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের খেলার ছলে শিক্ষাদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে! এটি কি আসলে নির্দেশের বিষয়? এটি অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা, ডেডিকেশন, মোটিভেশন, নিজ থেকে আনন্দ পাওয়া আর গবেষণার বিষয়! সরকার থেকে নির্দেশনা দেওয়া হলো আর সবাই খেলার ছলে পড়াশোনা শেখানো শুরু করে দেবেন, বিষয়টি কি তাই? পড়াশোনা আনন্দের মাধ্যমে করানো কোনো নির্দেশের বিষয় নয়। একজন শিক্ষক সেটি করতে পারেন তিনি যখন এই পেশায় প্রচুর সময় দিতে পারেন, প্রফেশনে নিজকে ডেডিকেট করতে পারেন, নিজ আগ্রহে নতুন কিছু করার উদ্দীপনা তৈরি করতে পারেন। বিভিন্ন মেধার ও ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে একটি ক্লাসে। তাদের স্বাভাবিকভাবে পড়াতেই হিমশিম খেতে হয় একজন শিক্ষককে, সেখানে নির্দেশ পেলেই আনন্দে পড়াশোনা শুরু করে দেয়ার মতো কতজন শিক্ষক আছেন, সেটিও আমাদের দেখতে হবে।

শিক্ষকদের যদি নির্দেশ দেওয়া হয় তাহলে তারা সেটি করবেন সেটা ভাবা কতটা বাস্তবসম্মত? আওয়ামী লীগের শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সময়ে আমরা দেখেছি কারিকুলাম পরিবর্তনের নামে আর আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষার নামে সব স্কুলে যাচ্ছেতাই চলেছে দুই বছর কারণ শিক্ষকরা তো বুঝতে পারছিলেন না কি তাদের করতে হবে। তাদেরকে শুধু বলা হয়েছিল লেখাপড়া হবে আনন্দের মাধ্যমে, চাপের মধ্যে নয়। তাই যে যেভাবে বিষয়টি বুঝেছে, সে সেভাবেই দুটি বছর কাটিয়েছে। একটি শ্রেণিকক্ষকে আনন্দময় করে তোলা কি কোনো সাধারণ শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব? অনেক মেধাবীরা এই পেশাকে বিদায় জানিয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

শিক্ষার্থীদের সময়মতো বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ঝড়ে পড়া রোধে ছবি আঁকা, মাটির কাজ ও বিভিন্ন উপকরণ তৈরির মাধ্যমে ‘খেলার ছলে শেখা’ কার্যক্রম পরিচালানার নির্দেশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। নির্দেশনায় বলা হয়, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বা আনন্দময় শিক্ষা’ কর্মসূচির আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমানে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রণীত প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির চারু ও কারুকলা বিষয়ে শিক্ষক সহায়িকা রয়েছে। এসব সহায়িকার আলোকে শ্রেণিভিত্তিক বিভিন্ন ছবি আঁকতে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ তৈরি করাতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের তৈরি শিল্পকর্ম শ্রেণিকক্ষে প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করতে হবে, যাতে তারা উৎসাহিত ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, বিভাগীয় উপপরিচালক, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নির্দেশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এগুলো অনেকটা সমর্থনযোগ্য কাজ। কারণ, স্পেসিফিক কিছু কাজ শিক্ষকদের করতে বলেছেন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিউরিসিটি বা অনুসন্ধানের ইচেছ কিন্তু একটি বড় মোটিভেশন যেটি আমরা বিশিষ্ট ভারতীয় কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও শিক্ষাতাত্ত্বিক সুগাতা মিত্রের গবেষণা থেকে পাই। যার গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে ‘মিনিম্যালি ইনভ্যাসিভ লার্নিং’। তিনি দিল্লির একটি বস্তির মুখে একটি দেয়ালের গর্তে একটি কম্পিউটার রেখে দিয়েছিলেন। সেটির সাথে ইন্টারন্টে সংযোগ ছিল কিন্তু ছিল না কোন শিক্ষক কিংবা ইন্সট্রাকটর। একটি গোপন ক্যামেরা ফিট করে রেখেছিলেন দেখার জন্য, শিশুরা কী করে। শিশুরা নিজেরা নিজেরা এলোমেলো চালাচালি করে কম্পিউটার খোলা-বন্ধ, ইন্টারনেট সংযোগ ঘটানো এবং সেই সঙ্গে বিভিন্ন কিছু দেখে নিজেরা নিজেরাই শিখেছিলেন। ঘটনাটি ২০০০ খ্রিস্টাব্দের। শিশুদের আগ্রহ, কিউরিসিটি এবং নিজেরা নিজেরা সময় ব্যয় করে কোনো ধরনের শিক্ষক ছাড়াই শিখেছিল কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবহার। তারা কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশের এবং নেট চালাতে যেসব আইকন পর্দায় ভেসে উঠেছিল সেগুলোর নাম নিজেরাই দিয়েছিল। কোনটাকে বলছে সুঁই, কোনটিকে ইঁদুর ইত্যাদি। এই মডেল তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বস্তিতে এবং পিছিয়ে পড়া এলাকায় সেট করে একই ফল পেয়েছেন।

আমাদের সরকার ক্লাসরুমে কম্পিউটার দিয়েছে, শিক্ষক আছে কিন্তু শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার শিখছে না। এখানে কয়েকটি বিষয় জড়িত। সুগাতা মিত্রের গবেষণা, একটি প্রকৃত গবেষণার উদাহরণ।

আমাদের শিক্ষকরা গবেষণার ফান্ড নেই, তাই গবেষণা করেন না! তাদের গবেষণা সব কাগজকলম ভিত্তিক, বাস্তবে তেমন কোন কাজ নেই, সবই কাগজপত্রে লেখা। দ্বিতীয় হচ্ছে, এসব গবেষকরা এবং অনেক কলামিস্টের শিক্ষা বিষয়ক লেখাও দেখি। তারা সবাই শুধু সরকারকে এটি করতে হবে, সেটি করতে হবে এ ধরনের সব সাজেশন আর রিকমেন্ডেশন দিয়ে ভর্তি করে রাখেন তাদের সেই লেখা ও গবেষণাপত্র। ভাবখানা এমন যে, সরকারে যারা আছেন তারা এগুলো কিছুই বুঝেন, না! আপনাদের এতসব সাজেশনের তো দরকার নেই। আপনার দরকার পথ বাতলে দেওয়া।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জিপিএ-এর পেছনে ছুটছে কারণ জিপিএ দিয়েই তাদের মেধা যাচাই হচ্ছে, জিপিএ দিয়েই সামাজিক বিচার, উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, চাকরি ইত্যাদি সব কিছুতেই অর্থাৎ বাস্তব জীবনের সবকিছুই নির্ধারিত হচ্ছে জিপিএ-৫ দিয়ে তখন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দোষ দিয়ে লাভ কী? রাষ্ট্র যদি এমন জিপিএ পাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে পারে যে, জিপিএ-৫ পাওয়া মানে তাকে নিয়ে আর কোন প্রশ্ন নয়। সলিড নম্বর, সলিড জিপিএ, জিপিএ প্রাপ্তির দ্বারাই যেন বুঝা যায় একজন শিক্ষার্থী কতটা মানবিক, কতটা সৃজনশীল, কতটা উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন ও কতটা ইনোভেটিভ। আমাদের পরীক্ষার প্রশ্নের সাথে এসের কোন সংযোগ নেই, মিল নেই। সেই সংযোগটি কিভাবে করতে হবে আমাদের সেই পথ বাতলে দিতে হবে। শুধু ওপরে ওপরে সাজেশন দিলে হবে না। সীমিত সম্পদ, হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যে যদি কার্যকরিভাবে নতুন কিছু কেউ করে দেখাতে পারেন, সেটিই হচ্ছে প্রকৃত ইনোভেশন, সেখানেই শিক্ষার্থীরা আনন্দ পাবেন। সুগাতা মিত্র কিন্তু সরকারকে বলেনি যে, এই বস্তিতে একশত কম্পিউটার দিতে হবে, একটি কম্পিটার ল্যাব বানাতে হবে, পাঁচজন টেকনিশিয়ান দিতে হবে, দুজন ট্রেইনার থাকতে হবে, তবেই না বস্তির শিশুরা কম্পিউটার ও নেট চালানো শিখতে পারবে। যেটি তাদের নিজেদের এবং রাষ্ট্রের কাজে লাগবে। আমাদের গবেষক ও লেখকরা শুধু বিশাল ফর্দ দিয়েই খালাস!

সবাই আশা করছেন শিক্ষাকে আনন্দময় করবে সরকার। সরকার তাই নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে শিক্ষা আনন্দময় করতে হবে। শিক্ষাকে আনন্দময় করার কোনো উপাদান বা অনুসঙ্গই যে আমাদের হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত এবং এটি একটি বাস্তবতা সেদিকে আমরা কেউ খেয়াল করছি না। একজন লেখক তাঁর কলামে লিখেছেন, “ শ্রেণিকক্ষকে আনন্দময় করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষকদের শুধু পাঠ্যবই শেষ করার দায়িত্ব দিলে হবেনা, তাকে হতে হবে অনুপ্রেরণার কারিগর। ইন্টারেক্টিভ পেডাগজি, দলভিত্তিক কাজ, গল্পভিত্তিক শিক্ষা, খেলাভিত্তিক শেখা, নাটক, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাঠকে যুক্ত করতে হবে।” আমরা আমাদের শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান ও সার্বিক অবস্থা জানি, এ অবস্থায় শুধু বললাম শিক্ষকদের এসব করতে হবে তাহলেই কি করা হয়ে যাবে?

শিক্ষকদের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন সূত্র থেকে শিক্ষার বিভিন্ন টেকনিক জেনে নেয়া। শিক্ষা বিষয়ক লেখাসমূহ নিয়মিত পড়া, শিক্ষা বিষয়ক জার্নাল পড়া, নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজ শিক্ষার্থীদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা, ভীষণভাবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এগুলোই এক ধরনের আনন্দ। আমরা যদি শিক্ষকদের এ ধরনের মোটিমেশন দিতে পারি, তাহলে কাজ কিছুট হয়তো হবে। শিক্ষার্থীরা না পড়ে পড়ে, কোনো ধরনের কাজ না করে করে প্রতিটি বিষয় থেকে তারা অনেক দূরে অবস্থান করছেন। সেই অবস্থায় পড়াশোনায় তাদের কোন আনন্দ নেই। যারা পড়াচ্ছেন তাদের কাছে একটি শ্রেণিতে ক্লাস নেওয়া মানে পাহাড়সম সমস্যার মতো কারণ শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই বোঝে না, বুঝতে চায় না, তাদের সংখ্যাই অনেক বেশি। দেশের তথাকথিত নামকরা দু-চারটি প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে সেগুলোতে ধরেবেঁধে পড়ানো হচ্ছে, মুখস্থ করানো হচ্ছে, বিষের মতো পড়া গেলানো হচ্ছে যা শিক্ষার কোনো বিজ্ঞানে পড়ে না! বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব করা ছাড়া তাদের কোনো উপায়ও নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত কিছু একটা করছে। বাকিগুলোর অবস্থা করুণ। এই বাস্তবতায় আমরা কেউ কেউ শুধু সারমন দিয়ে যাচ্ছি, উপদেশ দিয়ে যাচ্ছি বর্তমান যুগের সাথে তাল মেলাতে আনন্দময় পড়ার কোনো বিকল্প নেই। কে বাস্তবায়ন করবেন? কিভাবে করবেন?

সবাই শুধু অপেক্ষায় থাকে শিক্ষকদের বিশাল প্রশিক্ষণ হবে আর সব পরিবর্তন হয়ে যাবে। যে পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণগুলো হয় দেশে, তাতে শ্রেণিকক্ষের কোনও পরিবর্তন হয় না। শুধু টাকা ছিটানো ছাড়া খুব একটা লাভ হয় না অন্তত শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষার। যেসব শিক্ষক নিজেদের প্রচেষ্টায় অনেক কিছু জানার চেষ্টা করেন, জানেন এবং নিজ শিক্ষার্থীদের ওপর সেগুলো প্রয়োগ করেন, তারাই প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারেন। এমন কিছু সংখ্যক শিক্ষক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আছেন যারা নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আমাদের জানাচ্ছেন যে, তারা এভাবে ক্লাসে করছেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে কি কি পরিবর্তন আসছে, আসতেছে ইত্যাদি। এটিই প্রকৃত কাজ। প্রশিক্ষণে গিয়ে নিজের কিছু অর্থপ্রাপ্তি ঘটে কিন্তু শ্রেণিকক্ষে তেমন কিছু ঘটে না।

মাছুম বিল্লাহ : ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়