সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ১৩:২৯

চাঁদপুরের লেখকদের সিলেট-শ্রীমঙ্গল আনন্দ ভ্রমণ

মোখলেছুর রহমান ভূঁইয়া
চাঁদপুরের লেখকদের সিলেট-শ্রীমঙ্গল আনন্দ ভ্রমণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ভ্রমণ মানুষকে আলোয় আলোকিত করে। ভ্রমণপ্রিয়রা বলে থাকেনÑএকটি ভালো বই আর একটি সুন্দর ভ্রমণ দু’টোই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে। চঁাদপুর সাহিত্য সমাজ-চঁাদপুরের আলোকিত মানুষ, বই যঁাদের নিত্যসঙ্গী এবং আনন্দ-উদ্দীপনা যঁাদের আঠার মতো লেগে থাকেÑতঁাদের নিয়ে ২০২৩ সালে কক্সবাজার প্রথম আনন্দ ভ্রমণ করে। ভ্রমণটি সাহিত্য মহলে বেশ আলোচিত হয়। ভ্রমণটি এতটাই উজ্জীবক ছিল যে, ভ্রমণকাহিনি নিয়ে এখনো আড্ডাস্থলে খৈ ফোটে। আমার একটি প্রবন্ধও কক্সবাজারে লেখকদের আনন্দ ভ্রমণ নিয়ে লেখা দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

২০২৪ সালে অনিবার্য কারণে ভ্রমণসূচি বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সংক্ষিপ্ত ট্রিপ-প্রোগ্রামে প্রায় প্রতিমাসেই নিজ জেলা বা পার্শ্ববর্তী জেলায় সাহিত্য সমাজের বিচরণ থাকে। লেখকদের মাঝে ভ্রমণের খরতাপদাহের তৃষ্ণা মেটাতে একটি পরিপূর্ণ ভ্রমণÑ‘চঁাদপুর-সিলেট-শ্রীমঙ্গল আনন্দ ভ্রমণ-২০২৫’। এক থেকে চার অক্টোবর নির্ধারণে সিলেট ট্যুর (লেখক সমাজ) হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রতিনিয়ত যোগাযোগÑযাতায়াত, থাকা-খাওয়া, দর্শনীয় স্থান নির্ধারণ নিয়ে মতামত চলতে থাকে।

ভ্রমণ হচ্ছে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় সময় ও অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং আনুগত্যপ্রবণ সম্মিলিত সহাবস্থানে সম্প্রীতির বন্ধন। সে লক্ষ্যে ভ্রমণসঙ্গী সদাহাস্যময় সাদ আল আমিনকে দায়িত্ব দিয়ে সবাই সহযোগী হয়ে ভ্রমণের পথচলা সূচিতে মনোনিবেশ করি।

শুরুতেই ট্রেনযাত্রায় বাধাÑবৃহস্পতিবার ঐ রুটে ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে ট্রেনে যাওয়া সম্ভব হলো না। এই বার্তা গ্রুপে দেখা মাত্রই অধিকাংশের প্রথম আনন্দ ফিকে হয়ে যায়। বাসযাত্রা আমার জন্য কখনোই স্বস্তিদায়ক নয়। আমার মতো আরও অনেকে বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাস্তার করুণ অবস্থা তুলে ধরে বাসযাত্রায় অনীহা প্রকাশ করেন।

ফরিদ হাসান মোবাইলে বলেনÑকষ্ট হলেও ট্যুর প্রোগ্রামে থাকতে। তঁার আবেগী কথার মাধুর্যে আমিও বললাম, “যাবো”Ñএবং গ্রুপে জানিয়ে দিলাম। হোটেল বুকিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি পুরোদমে শুরু হয়। চঁাদপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে সময় মিলছে না। উপায়ান্তর হয়ে সাহিত্য সুহৃদ ফরিদগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম ফরহাদ (২০২৩ সালের ভ্রমণসঙ্গী) ফরিদগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে ইজঞঈ বাসের সিট বুকিং কনফার্ম করায় যাত্রা নিশ্চিত হয়।

সবার মাঝে ভ্রমণের উন্মাদনা। ভ্রমণের হাওয়া অস্থিমজ্জায়। সূর্য ডুবে, চঁাদ ওঠে। গণনাপুঞ্জিতে অক্টোবরের প্রথম চঁাদমাখা সন্ধ্যায় ওয়ারলেস মোড়ে সমবেত হই ভ্রমণসঙ্গীরা। ইজঞঈ বাস সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে আসার কথা থাকলেও আসে প্রায় এক ঘণ্টা পরে। মনে হলো চঁাদপুরের মায়াজালে আমাদের আটকে রাখতে চায়। ভালোবাসার মানুষদের সাথে ক্ষণিক সময় কাটানোর মজাই আলাদা।

বাসে নিজ নিজ আসনে বসে পড়ি। বিধিবামÑদুটি আসন ছিল বসার অনুপযোগী। বাস স্টাফদের সাথে কথাবার্তা হয়। সোনার বাংলায় যেমন খঁাটি সোনা পাওয়া কষ্টকর, তেমনি অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করেও যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ। আজকাল প্রায় সব স্তরে অনিয়ম, দায়সারা দায়িত্ব পালন, অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ দেখা যায়। বেশির ভাগ অবহেলার দায় নিচের দিকে গড়ায়। নিরীহ বাসস্টাফদের যাত্রীদের রোষানলে পড়তে হয়।

বাসস্টাফরা রশি দিয়ে ভাঙা আসন জোড়াতালি দিতে দিতে প্রায় সাড়ে ৯টায় বাসের চাকা ঘুরতে শুরু করে।

সুমন দে বাবুরহাট থেকে, শরীফ উল্লাহ আলীগঞ্জ থেকে বাসে ওঠেন। ভ্রমণের বাণীÑএকটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ভ্রমণের অর্ধেক কাজ সমাপ্ত করে দেয়। আলীগঞ্জ পার হতেই আমাদের পরিকল্পনার প্রস্তুতি পরিপূর্ণতা পায়। সবাই নিজ নিজ আসনে স্থির হওয়ায় ‘ছায়া ম্যানেজমেন্ট’ হিসেবে প্রথম তৃপ্তির আবেশে খুনসুটি শুরু হয়।

বাসযাত্রা আমার জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। বসে আছি নিঃশব্দেÑমনে মনে প্রার্থনা করছি শরীরের সুস্থতা ও নিরাপদে গন্তব্যে পেঁৗছানোর জন্য।

বাস চলছে রাস্তার গতিতে। কুমিল্লা পার হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অমসৃণ রাস্তার ধকল ও জ্যামে সবার মাঝে অস্বস্তি। সড়ক ও জনপদ বিভাগের ধারাবাহিক কাজ চলমান না থাকায় রাস্তার গর্তে বাসের সম্মানও যেন টিকে থাকে না।

এদিকে প্রথম তিন ঘণ্টায় প্রকৃতির ডাকে অনেকেরই অবস্থা বেগতিক। মহাসড়কে অন্তত দশ কিলোমিটার অন্তর শৌচাগার থাকাÑসভ্য সমাজের বিধান। শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তা ম. নূর আলম পাটোয়ারী দারুণ শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছেন। সড়ক-মহাসড়কে যাত্রীদের জন্য শৌচাগার থাকলে বিব্রতকর অবস্থা থেকে মুক্তি মিলত। ভ্রমণ হতো আরামদায়ক।

লম্বা পথ পেরিয়ে সড়কের পাশে একটি ফিলিং স্টেশনে সবাই ফ্রেশ হই। বিশেষ করে মহিলা ভ্রমণসঙ্গীরা স্বস্তি বোধ করেন। হালকা বার্গার, ফল-ফ্রুট খেয়ে মোটামুটি চাঙা হয়ে উঠি।

পূর্ণ বাসটি যেহেতু সম্পূর্ণ রিজার্ভ ছিল নাÑপ্রথমে অন্য যাত্রীরা কিছুটা আড়ষ্ট থাকলেও সময়ের সাথে সবাই একাকার হয়ে যায় আনন্দের হই-হুল্লোড়ে। কথার ভেলকিবাজি, সুরের মূর্ছনায় রাতের নীরবতা সরব হয়ে ওঠে।

মোহাম্মদ হানিফের পরিবেশনায় বাঙালির গল্প-আড্ডায় মুখরোচক খাবারÑচাউল, ডাল, বুট, তিল ভাজাÑছিল সারপ্রাইজ। মজাদার খাবার, চুটাচুটিÑবাসের ভেতরই জমে ওঠে। আবারও দীর্ঘ জ্যামে আটকা। চাকা ঘুরছে শামুকগতিতে। অনেকে ঘুমে আচ্ছন্ন।

আমি জানালা দিয়ে রাতের প্রকৃতি দেখে ভাবনার জগতে ডুবে আছি। গাছগাছালি নুয়ে কুর্নিশ করছে। ভোরের আকাশের অব্যর্থ নকশা চোখে ভাসছে। হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য স্মৃতিফলকে স্থাপিত দৃষ্টিনন্দন স্থানে বাস থেকে নেমে চমৎকার ভোরের প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছু সময় কাটাই। শরীরে সতেজতা ফিরে আসে।

সবুজের গায়ে ফোটা শিশিরে আগমনী ঋতুর বার্তা। বাসের গতির চেয়ে চোখের গতিতে বয়ে যায় শ্যামল দুর পাহাড়-প্রকৃতির সৌন্দর্য। সড়কের পাশে দেখা অবকাঠামো দেখে অনুমেয়Ñবিগত দশকে এসব শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে।

সূর্য মামার আলোয় প্রায় ৮.৩০ মিনিটে কদমতলী বাসস্টপে পেঁৗছি। সিলেট শহরের নীরবতা আমাদের পদযাত্রায় সরগরম হয়ে ওঠে।

সবার মাঝে আনন্দের ঝিলিক। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি শরীরের অবসাদে থাকলেও বিশ্রামহীন সিদ্ধান্তে প্রথমে হযরত শাহজালাল (রাঃ) দরগাহ দর্শনে সমবেত হই আমরা। সকালের নাস্তা খেয়ে নিজ নিজ ইচ্ছেমতো দরগাহে বিচরণ ও মনোবাসনা পূর্ণতায় সৃষ্টিকর্তার কৃপা প্রার্থনায় মশগুল অনেকে। মশগুল থাকা একান্তই স্বাভাবিক। হযরত শাহজালাল (রাঃ) এক আধ্যাত্মিক বুজুর্গ। এই বঙ্গে তিনিই প্রথম ১৩১৩ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তঁার ভক্ত অনুসারী ৩৬০ জন সফরসঙ্গীর কাফেলা নিয়ে ইসলাম প্রচারে এই স্থানে আস্তানা গড়েন। তঁার পূর্বে এখানে ইসলাম ধর্ম প্রসারে অন্য কোনো ধর্মীয় মনীষীর আগমনের তথ্য প্রচারিত নেই। এই অঞ্চলে প্রথম ইসলাম ধর্ম বহুল প্রসারিত হওয়ায় সিলেটকে ৩৬০ আউলিয়ার গনের পূর্ণ ভূমি বলা হয়। এবং হযরত শাহজালাল (রাঃ)-এর দরগা মোবারককে আউলিয়ার গনের তীর্থস্থানের মর্যাদা ধর্মালম্বিদের হৃদয়ে হৃদয়ে। হযরত শাহজালাল (রাঃ)-এর লৌকিক-অলৌকিক স্মৃতিবিজড়িত তীর্থস্থানে সব ধর্মালম্বিরা প্রতিনিয়ত আসেন মনোবাসনা পূরণের আশায়। আমার ১৯৯৮ ও ২০০১ সালে মাজার জিয়ারতে আসা হয়। তখন মাজারের খোলা জায়গায় বর্তমানে শেড নির্মাণ ছাড়া প্রায় সবকিছুই স্থির আছে। ভক্ত দর্শনার্থীদের কোরআন তেলাওয়াত, নামাজ আদায়, হযরত শাহজালাল (রাঃ)-এর কবর জিয়ারতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পরিবেশ বিরাজমান। দর্শনার্থীদের আকর্ষণ বিশাল বিশাল শোল-গজার মাছ দেখা। মাছের গায়ে শেওলা দেখে চোখ ভড়কে ওঠে। আগতরা মনোবাসনায় খাবার দিচ্ছেন। এই পুকুরের মাছ নিয়ে অনেক লোকগল্প শোনা যায়।

[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়