সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ১৩:২৮

নিরব ভালোবাসা

রফিকুর রহমান পাটওয়ারী
নিরব ভালোবাসা

জাকির সাহেব ঢাকাগামী লঞ্চে উঠে প্রথম শ্রেণীর একটি সিটে বসে ঝিমাচ্ছেন। প্রায়ই চঁাদপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াত করতে হয়। অলসতা আর ঝিমানি কাটাতে পকেট থেকে মোবাইলটি বের করে দেখছেন নিজের অতীত। কোন পত্রিকায় কলাম লিখেছেন; কোন মঞ্চে মানবাধিকার নিয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছেন। মোবাইলে নিজের অতীত দেখে ভাবাক্রান্ত হয়ে যাওয়ায় রুম থেকে বের হয়ে নদীতে জেলেদের ইলিশ মাছ ধরা দেখছেন। কেবিনের সামনে ইলিশ ধরা, খেয়া পারাপার আর বিভিন্ন লঞ্চের দৌড়াদৌড়ি দেখতে মানুষ ভিড় জমায়। অনেকে ছবি তোলে, আবার ভিডিও রেকর্ড করে। দৃশ্যটি দেখতে এতই চমৎকার যে, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বহুদূর থেকে মানুষ নৌভ্রমণে আসে এখানে। মেঘনা নদী যেন মানুষকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে আসে। কফি খাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও একা কফি খেতে মন চাইল না। শক্ত করে লোহার রেলিং ধরে নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন। মনে পড়ে গেল দক্ষিণ বাংলায় চাকরির সুবাদে কত স্টিমারে ভ্রমণ করতে হয়েছে। গাজী, অস্ট্রিচ আর মাসুদ স্টিমারগুলো এখন আর নেই। এগুলো এখন জাহাজ ভাঙার কাতারে। আজ জাকির সাহেবকে অতীত চেপে ধরেছে।

অতীতে ডুবে যাওয়া জাকির সাহেবের ধ্যান ভেঙে গেল একজন মহিলাকে কেবিন থেকে বের হতে দেখে। মহিলা একনজরে নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন। ইলিশ বিক্রেতা বারবার জিজ্ঞেস করছে মাছ কিনবেন কি না? জেলেদের কাছে মাছ, ব্যাগ, বরফ সব থাকে। অনেকে মাছ কিনে নেয় তাজা ভেবে। বাতাসের সাথে মহিলার আধা পাকা চুল আর শাড়ি রীতিমতো যুদ্ধ করছে। জাকির সাহেব মহিলার দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, কে এই মহিলা? কিছুটা চেনা, আবার অচেনা। মহিলার দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকায় মহিলা জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলবেন?”

জাকির সাহেব অভয় পেয়ে বললেন, “আপনাকে কেমন জানি চেনা লাগছে। আমি যাকে চিনতাম তাকে শাড়ি পরা অবস্থায় কখনও দেখিনি। অনেকবার বলেছি শাড়ি পরা অবস্থায় দেখাতে। শুধু বলত, একেবারে লাল শাড়ি পরিয়ে দেখাবে। আমার আর ভাগ্য হয়নি দেখার। এখন কোথায় কেমন আছে জানি না। মাঝে মধ্যে স্মৃতিতে ভেসে ওঠে কোনো এক কালের শ্রাবন্তীকে।”

কথাগুলো শ্রাবন্তী শুনে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি জাকির সাহেব?”

জবাব দিতে গিয়ে জাকির সাহেব জানতে চাইলেন, “চিনলেন কী করে?”

প্রশ্ন শুনে শ্রাবন্তী বলল, “আপনাকে চিনব না? যে আমার জীবনকে দোজখ বানিয়েছে। আমি আপনার জন্য কী করিনি? বৃষ্টিতে ভিজে পানিওয়ালা বাজার থেকে ওষুধ নিয়ে এসেছি। চৈত্র মাসের ঘামে ভেজা দেহ নিয়ে আটার রুটি বানিয়েছি। ল’ চেম্বারে মামলার আর্জি, জবাব আর সাক্ষীর জবানবন্দি পড়িয়ে শুনিয়েছি। আমি আপনাকে পরামর্শ দিয়েছি, প্রবাসীর স্ত্রী পরকীয়া প্রেমে ঘর ছাড়লে মামলা করে স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনা যায় না; আইন মানুষের মনকে আটকাতে পারে না। আমি আপনাকে শিখিয়েছি শহরে বড় হওয়া মানুষ কীভাবে গ্রামের পরিবেশের সাথে মিলিয়ে চলতে হয়। পরামর্শ দিয়েছি রাতে ঘুমানোর জন্য একটি ঘর বানাতে। আলমারিতে আইনের বইগুলো আমি যত্নে রেখেছি। আমি যা করেছি তার জন্য আপনি আমার কাছে সারাজীবন ঋণী হয়ে থাকবেন। আমি কী চেয়েছিলাম? আপনি জানতে চাননি একজন নারী কী চায়। প্রথম জীবনে চঁাদপুর লঞ্চঘাটে আপনার সাথে দেখা হওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।”

একটানা অনেকক্ষণ কথা শুনে জাকির সাহেব বললেন, “তুমি থেকে আপনি?”

প্রশ্ন শুনে শ্রাবন্তী বলল, “বাড়িতে ঘটক এল; আমাকে পাত্রপক্ষ আংটি পরাল; আপনি দেখেও চুপ! আমার হাতে বান্ধবীরা যখন বিয়ের মেহেদি লাগাচ্ছে, তখন আপনি শুধু চেয়ে দেখলেন। আমি যখন লাল শাড়ি পরে পালকিতে উঠলাম, আপনি একেবারে চুপ। পুকুরপাড় দিয়ে চলছে পালকি; আমি পালকির দরজা খুলে আপনাকে দেখলাম আর বুক ভাসিয়ে কঁাদলাম। আপনি নীরবে দঁাড়িয়ে রইলেন। সবকিছু দেখার পরও পাষাণের মতো দঁাড়িয়ে

২.

ছিলেন। সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করলেন। আমি চেয়েছিলাম আপনি বলবেন, ‘আমাকে ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি?’ প্রশ্ন শুনে আমি সবকিছু ভেঙে চুরমার করে আপনার বুকে মাথা রেখে বলতাম, ‘আমি কোথাও যাব না, বাপের ভিটে ছেড়ে সারাজীবন আপনার পাশে থাকব।’ যেদিন থেকে আপনি আমাকে অবহেলা করলেন, সেদিন থেকে সারাজীবন আমাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিলেন। ‘তুমি’ শব্দটি হারিয়ে গিয়েছে। এখন আমি অন্যের বুকে মাথা রেখে ঘুমাই। এখন আর আমাকে কারও জন্য অতিরিক্ত ভাবনা ভাবতে হয় না। এখন কারও ওষুধ আছে কি না ভাবতে হয় না। ঢাকা থেকে কখন বাড়ি আসবে, আমি একটু দেখব—তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। আমার শরীরে অ্যালার্জি দেখা দিলে এখন কেউ অস্থির হয় না। ঈদ বোনাস হাতের মুঠোয় কেউ এখন আর দেয় না। দেহ-মনের উষ্ণতা এখন আর নেই। এখন সবকিছু আছে, তবুও কী যেন নেই! আমার জীবনে ‘নেই’ শব্দটি এখন আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এখন আমি মাঝে মধ্যে গানটি শুনি—’মনের মানুষ হইয়াও তুমি মনের মূল্য দিলা না’। বিশ্বাস করো বন্ধু, তোমার জন্য এখন আর মায়া লাগে না, চোখের পানি পড়ে না।”

অনেকক্ষণ কথা শোনার পর জাকির সাহেব ভাবছেন, আদালতে একতরফা মামলার রায়ের কথা শুনেছি, কিন্তু একতরফা বাক্যবাণ কখনও শুনিনি। আজ আমাকে শনির দশায় পেয়েছে। আমি কেমন আছি একটুও জানতে চাইল না!

ভগবানকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, এটা তোমার কেমন লীলাখেলা? যাকে রাখলে হৃদয়ে তাকে রাখলে না কপালে; আর যাকে রাখলে কপালে তাকে রাখলে না হৃদয়ে।

“আমি বারবার আপনাকে বলেছিলাম, আমাকে আংটি পরিয়ে বায়না করে রাখুন, আর তা না হলে কোনো এক রাজকুমার রাজপাখির মতো ছেঁা মেরে নিয়ে যাবে। প্রতিকারে জবাবে বলেছিলেন, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে একটু সময় দাও।”

দীর্ঘ একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শ্রাবন্তী বলল, “আরও প্রয়োজন? হলেন সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, গল্পকার, আইনজীবী, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।”

শ্রাবন্তী জাকির সাহেবের দু’হাত চেপে ধরে বলল, “আর প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। আমার আর দেরি সইছে না। অতীতের ব্যর্থতার কথা মনে পড়লে ইচ্ছে করে আপনাকে বুড়িগঙ্গায় ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে।”

শ্রাবন্তীর কথা শুনে জাকির সাহেব বললেন, “ডুবন্ত মানুষের জন্য মেঘনা আর বুড়িগঙ্গা একই। তবুও বলতে পারব প্রিয়ার হাতে শেষ হলাম।”

শ্রাবন্তী একটু শান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখন চলছে কীভাবে?”

জাকির সাহেব বুড়িগঙ্গার জলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওকালতি, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা আর জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসরে যাওয়ায় সরকারি পেনশন—একা মানুষের চলছে কোনোপ্রকারে।”

কথা শুনে শ্রাবন্তী জিজ্ঞেস করল, “বিয়ে করেননি কেন?”

জাকির সাহেব প্রশ্ন শুনে চোখে জল এনে বলল, “নীরবতার সাজা ভোগ করতে। আর যাকে হারালাম তার সম্মানার্থে। এখানেই শান্তি খুঁজে পাই।”

কথা শুনে শ্রাবন্তী একবুক নিশ্বাস নিয়ে বলল, “আমারও একই অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ ডিগ্রি নেওয়া মেয়েটিকে পারিবারিক আর পরিস্থিতির শিকারে বিয়ের মালা পরাতে হলো প্রবাসীর গলায়। বছরের পর বছর হৃদয় জুড়ানো আলিঙ্গনের অভাবে আছে শুধু হৃদয়ে দহন আর দহন। রাতের অন্ধকারে চোখের পানিতে ভেজা বালিশ কখনও শুকায় না। প্রতি মাসে

৩.

টাকা আসে, মানুষ আসে না।” বুকভরা ব্যথা নিয়ে শ্রাবন্তী বলল, “প্রবাস জীবন শেষে যখন দেশে আসে, তখন তাদের স্ত্রীর প্রয়োজন হয় না, শুধুমাত্র সেবিকার প্রয়োজন হয়। নিজেও জীবনে শান্তি পেলেন না, আর আমাকেও শান্তিতে বঁাচতে দিলেন না। মনে হয় এখন আপনাকে কঁাচা খেয়ে ফেলি! আপনি হলেন মেয়েদের হৃদয় ভাঙার কারিগর।”

শ্রাবন্তীর কথা শুনে জাকির সাহেব ভাবছেন, শ্রাবন্তীর বাঘিনী রূপ আগেও দেখেছেন, কিন্তু আজ ভয়ঙ্কর। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, আজ সদরঘাট এত দূরে কেন?

শ্রাবন্তী এতক্ষণ বলার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বলার চেষ্টা করতেই লঞ্চ লম্বা হুইসেল বাজিয়ে জানান দিল যে, আমরা এখন সদরঘাট লঞ্চঘাটে। সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পর শ্রাবন্তী গোছগাছ করে লঞ্চ থেকে নেমে ঘাটের লোহার গেট পার হয়ে জাকির সাহেবকে বলল, “গাড়িতে ওঠেন আর ড্রাইভারকে বাসার ঠিকানা বলেন।”

জাকির সাহেব বুঝলেন, সাইক্লোনের শেষ ধাক্কাটি এবার গাড়িতে হবে। কাকভেজার মতো জাকির সাহেব গাড়িতে উঠে সিটের এক কোণায় বসলেন।

শ্রাবন্তী বলল, “এত দূরে কেন? আরেকটু কাছে এসে আরামে বসুন।” জাকির সাহেব হুকুম তামিল করে বাক্যবাণের অপেক্ষায় রইলেন।

শ্রাবন্তীকে চুপচাপ দেখে জাকির সাহেব ভালো করে নজর দিয়ে দেখলেন, শ্রাবন্তী অঝোরে কঁাদছে। চোখের পাওয়ারের চশমা নামিয়ে শুধু শাড়ির অঁাচল দিয়ে চোখের পানি মুছে কান্না আড়ালের চেষ্টা করছে। আগের সময় হলে জাকির সাহেব শ্রাবন্তীর চোখের পানি মুছে দিতেন, কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এখন পারছেন না।

আগেও শ্রাবন্তী এমনিভাবে বহুবার কেঁদেছে। প্রতিবার জাকির সাহেব চোখের পানি মুছে দিয়ে বলতেন, “সামান্যতেই কঁাদতে নেই।”

জাকির সাহেব চুপে গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন। বিদায়ের বার্তা দিয়ে লাভার ভয়ে আগ্নেয়গিরিতে আর খেঁাচা দিতে চাইলেন না। চোখের সামনে দিয়ে কালো গাড়িটি যাত্রা করল। জাকির সাহেব গাড়িটির পেছনে তাকিয়ে রইলেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়