শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ০৯:২১

ধারাবাহিক উপন্যাস-৪৬

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

‘আপনাদের পক্ষে কোনো উকিল কী আছে?’

‘জি না মাননীয় আদালত।’

‘আপনারা নিজের মামলা নিজেই লড়তে পারবেন না। আপনারা প্রত্যেকে সরকারি চাকুরে ছিলেন তাই আইনি প্রক্রিয়া তো আপনাদের ভালো জানার কথা।’

‘জি।’

‘আপনাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের পক্ষে কোনো দলিলাদি কী আছে যা আদালতে পেশ করতে পারেন?’

‘না নেই।’

‘মাননীয় আদালত নেই বলতে আমাদের দলিলাদি সংগ্রহ করে নিতে হবে।’

‘আপনারা এই কয়টা দিনে সেগুলো সংগ্রহ করতে পারেননি?’

‘মাননীয় আদালত উনাদের কাছে কোনো কিছু থাকলে তো পেশ করবেন। আমাদের কাছে যা কিছু আছে তা আমি এই আদালতে পেশ করেছি আপনার সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

‘অভিযোগকারী আদালতে হাজির হয়েছেন কী?’

‘জি না মাননীয় আদালত।’

‘উনি অভিযোগ করেছেন অথচ নিজে হাজির হননি এটা কী করে হয়? অভিযোগকারীকে আদালতে হাজির থাকতে হবে। আদালতের আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের উকিল প্রয়োজন এবং তাদের প্রত্যেককে নিজের সাফাই পেশ করার সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। তাই আপনাদের একজন উকিল নিয়োজনের জন্য বলছি এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আপনাদের কাছে পেশ করার মতো কোনো নথিপত্র থাকলে আদালতের সামনে হাজির করবেন। বাদী পক্ষের উকিল আপনি আপনার ক্লায়েন্টকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য বলবেন। আগামী মাসের সাত তারিখ পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হইল।’

আদালতে হাজিরা দেওয়ার আগে কেমন একটা ভয় কাজ করছিল। কীসের ভয় তা জানা নেই। কাঠগড়ায় এই জীবনে প্রথম দাঁড়ালাম। আইনি প্রক্রিয়া যেমন তেমন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আমাদের বিচারকের সম্মুখীন হতে হবে এটা ভাবিনি কখনো। সাধারণ জীবনযাপন করা মানুষগুলো কখনো কোনো ভেজালে জড়াতে চায় না। চারটে ডাল-ভাত আর আত্মসম্মান নিয়ে কোনোরকম জীবনটা পার করতে পারলেই সোনায় সোহাগাÑসেখানে এমন কিছু জটিলতা তাদের জীবন প্রণালিতে আসা কোনো প্রকারেই কাম্য নয়। সাধারণ মানুষগুলো সবকিছুতেই সাধারণ থাকতে চায় তাই ভেজাল এড়িয়ে নিজেকে আগলে রাখে। আদালত প্রাঙ্গন ত্যাগ করার পর এখন আর সে ভয়টুকু নেই। নিজের অজান্তেই সাহস বুকে ভর করেছে। অনিমেষ কেন যে খোঁজ করে নিজেদের জন্য একটা উকিলের ব্যবস্থা করতে পারেনি সেটাই বুঝতে পারছি না। আমাদের জীবনে যেন বিপদের কাল মেঘ ভর করে বসেছে। কারো মনে তেমন একটা প্রশান্তি নেই কারণ আমরা প্রত্যেকে জানি আমাদের অবস্থান আর এখন যদি নিকুঞ্জ নিকেতন ছাড়তে হয় তাহলে অসহায় এই মানুষগুলোর কী হবে। কোথায় যাবে এরা যেখানে পরিবার পরিজন থেকে বহুদিন দূরে। আবার কী ফিরে যাবে? যাওয়া উচিত আর গেলেও তারা কী আগের মতো আগলে ধরবে নাকি দূরদূর করে তাড়িয়ে দেবে? আবার ভাবছি যদিও গ্রহণ করে তাহলে এই মানুষগুলোকে জঞ্জাল মনে করবে না তো? প্রশ্নগুলো আছে ঠিকই যথার্থ উত্তর জানা নেই।

আমাদের এখন পার্কে তেমন একটা যাওয়া হয় না। আদালতের বিষয়টা সামনে আসায় প্রত্যেকের মনোবল ভেঙে গেছে। বৃদ্ধ বয়সের শেষ পরিণতি কী হয় এখন সেটাই দেখার পালা। আমাদের মধ্যে সৌহার্দবোধটা আগের তুলনায় এখন আরও প্রবল হয়েছে। শুনেছি বিপদে পড়লে নাকি ভয়ে মানুষের মনের মধ্যে শুভ্রবোধের উদয় হয়। আমাদের বেলায় এখন এমনটাই ঘটেছে। সকাল তখন এগারোটা হঠাৎ আমাদের মাঝে বিশাখার আগমন।

‘অনিমেষ আংকেল আপনারা কী রাজীবের সাথে কোনো যোগাযোগ করেছিলেন?’

‘না তো! আমরা ভাবছিলাম রাজীবকে বিষয়টা জানাব।’

‘রাজীব বিষয়টা জানে আর সে আগামী শুনানিতে দেশে থাকবে।’

‘যাক ভালোই হয়েছে। রাজীব থাকলে আমাদের টেনশন আর করা লাগবে না। সে এই সম্পদের মালিক উত্তরাধিকার সূত্রে তাই তাকে নিয়ে আদালতে হাজির করলে বাদী পক্ষের লোকেরা হিমশিম খাবে।’

‘বিশাখা, রাজীব কবে নাগাদ এসে হাজির হবে সেটা কী বলতে পার?

‘না আংকেল আমাকে তেমন কিছুই বলেনি। শুধু বলেছে আমি আসছি আগামী শুনানিতে।’

যথারীতি আমরা পরবর্তী শুনানিতে হাজির হই। রাজীব তখনো নিকুঞ্জ নিকেতনে আসেনি। যদি সে বাংলাদেশে এসেই থাকে তাহলে এখানে আসেনি কেন? আমরা সকলে এই একটা প্রশ্নে অবাক হই। আদালতে হাজির হলে যথারীতি বিচারক এসে আদালতের কার্য শুরু করেন। আমাদের ডাকা হয়েছে আর আশরাফ সহ আমরা চারজন এক এক করে হাজির হই। জজ সাহেব যখন আমাদের বলে আপনাদের পক্ষের উকিল কোথায় তখন আমরা সকলে অনিমেষের দিকে তাক করে আছি যেন সে কিছু বলুক। উকিলের বিষয়ে তাকে বলা হয়েছিল আরও আগে তাই এখন কী করতে পেরেছে সেটাই দেখার পালা। আমরা সকলে নিশ্চুপ ছিলাম আর এরই মধ্যে লম্বাটে গঠনের এক সুশ্রী মহিলা এসে কোর্টে হাজির হয়।

‘আমাকে ক্ষমা করবেন মাননীয় আদালত শহরের জ্যামের কারণে আমার আসতে একটু দেরি হয়েছে। আমি সুপর্ণা দত্ত বিবাদী পক্ষের উকিল।’

‘বাদী পক্ষের উকিল সাহেব আপনার ক্লায়েন্ট কী আদালতে হাজির হয়েছেন?’

‘জি মান্যবর উনারা এখনি চলে আসবে পথে আছেন।’

‘আদালতের কার্যক্রম তাহলে শুরু করা যায়।’

আদালতে বাদী বিবাদী পক্ষের উকিলরা একে অপরের বিভিন্ন যুক্তি তর্কে মামলার কার্য পরিচালনা করছে। বাদী পক্ষের উকিল বাড়ির মালিকের পক্ষে যথাযথ নথিপত্র পেশ করে। আমরা সকলে অবাক হয়ে যাই ওদের কাছে জমি সংক্রান্ত এত তথ্য এসেছে কোথা থেকে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়