শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ১০:৩১

নতুন করে জীবনের বাঁকে

উজ্জ্বল হোসাইন
নতুন করে জীবনের বাঁকে

দিন যায়, মাস যায় জীবনের গতি থেমে থাকে না। কখনো দ্রুত, কখনো ধীরে কিন্তু সে চলতেই থাকে। আমার জীবনও ঠিক তেমনই এগিয়ে যাচ্ছিল, তবে এবার তার ভেতরে এক নতুন সুর বাজতে শুরু করেছে। ওর সাথে কথা বলতে বলতে, দেখা করতে করতে, কখন যে আমাদের মধ্যে একটা গভীর বোঝাপড়া তৈরি হলো তা টেরই পাইনি। প্রথমদিকে সম্পর্কটা ছিল সম্মান আর স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে। সে আমাকে তার শিক্ষক হিসেবে দেখতো, আমি তাকে ছোটবেলার পরিচিত একজন মানুষ হিসেবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই সম্পর্ক বদলাতে শুরু করলো।

আমরা একে অপরের জীবনের গল্প শুনতে লাগলাম কে কোথায় কষ্ট পেয়েছে, কে কীভাবে লড়াই করেছে। আমি তাকে আমার ছন্নছাড়া জীবনের কথা বলতাম, আমার ভুল, আমার স্বপ্ন সবকিছু। আর সে শুনতো মন দিয়ে। একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম আমি ওর সাথে কথা না বলে থাকতে পারি না। দিনের শেষে ওর কণ্ঠ না শুনলে কেমন যেন শূন্য লাগে। ওর হাসি, ওর অভিমান সবকিছু যেন আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তখনই বুঝলাম আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি।

কিন্তু এই ভালোবাসার মধ্যে এক ধরনের ভয়ও ছিল। যদি সে আমাকে সেইভাবে না দেখে? যদি এই সম্পর্কটা ভেঙে যায়? তবুও একসময় মনে হলো এই কথাটা না বললে আমি নিজেকেই ঠকাবো।

এক সন্ধ্যায়, অনেক সাহস জোগাড় করে বললাম “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। সেই নীরবতা যেন আমার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিলো।

তারপর ধীরে ধীরে সে বললো, আমি জানতাম, একদিন আপনি এটা বলবেন। আর আমি আমি আপনাকে না বলতেও পারছি না। সেই মুহূর্তটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি।

এরপর শুরু হলো নতুন এক অধ্যায় আমাদের সম্পর্কের। কিন্তু শুধু আমাদের ইচ্ছা থাকলেই তো হয় না, পরিবারের সম্মতিও দরকার। প্রথমে বিষয়টা সহজ ছিল না। কিছু মিল, কিছু অমিল সব মিলিয়ে পরিবারকে রাজি করানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো। তার পরিবার প্রথমে একটু দ্বিধায় ছিল। তারা ভাবছিল এই সম্পর্কটা কতটা টেকসই হবে? অন্যদিকে, আমার পরিবারও কিছুটা চিন্তিত ছিল আমার স্থায়ী চাকরি নেই, জীবনটা অনেকটা অনিশ্চিত।

কিন্তু আমরা হাল ছাড়িনি।

ধীরে ধীরে, ধৈর্য নিয়ে, ভালোবাসা আর বিশ্বাস দিয়ে আমরা পরিবারগুলোর মন জয় করার চেষ্টা করলাম।

সে তার পরিবারের সাথে কথা বললো, আমি আমার পরিবারের সাথে। মাঝে মাঝে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, তর্ক হয়েছে, মন খারাপ হয়েছে কিন্তু আমরা একে অপরের হাত ছাড়িনি। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার দিন এলো। দুই পরিবারই আমাদের সম্পর্ক মেনে নিলো।

সেই দিনটা যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল। এতদিনের কল্পনা, এতদিনের অপেক্ষা সবকিছু যেন বাস্তব হয়ে উঠলো। বিয়ের দিনটা ছিল এক অন্যরকম অনুভূতির। পরিচিত সেই মেয়েটি, যাকে একসময় ছোট বোনের মতো দেখতাম, আজ সে আমার জীবনসঙ্গী। তার চোখে লাজুক হাসি, মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আমি তাকিয়ে ভাবছিলাম, এটাই কি সেই মানুষ, যার কথা আমি এতদিন কল্পনা করেছি?

বিয়ে শেষ হলো, নতুন জীবনের শুরু হলো। আমার ছন্নছাড়া জীবনে একজন নারীর আগমন যেন সবকিছু বদলে দিলো। আগে যেখানে সময়ের কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিল না, এখন সেখানে একটা নিয়ম চলে এসেছে। আগে যেখানে নিজের কথা ছাড়া কিছু ভাবতাম না, এখন সেখানে “আমরা” শব্দটা জায়গা করে নিয়েছে।

সে আমার জীবনে শুধু একজন স্ত্রী হিসেবে আসেনি সে এসেছে একজন বন্ধু, একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে। আমার ভুলগুলো সে ধরিয়ে দেয়, আমার ভালো কাজগুলোতে উৎসাহ দেয়। কখনো কঠিন কথা বলে, আবার কখনো মায়া দিয়ে সবকিছু সহজ করে দেয়। আমি বুঝতে পারলাম সংসার শুধু ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, এটা বোঝাপড়া, দায়িত্ব আর সম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিয়ের এক সপ্তাহ পরেই আমার জীবনে আরেকটা বড় পরিবর্তন এলো। একদিন হঠাৎ একটা ফোন কল পেলাম একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। এতদিন ধরে যেটা নিয়ে ভাবিনি, সেটাই যেন হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালো।

আমি বিষয়টা তাকে জানালাম। সে হেসে বললো “দেখলেন? জীবন কখনো খালি থাকে না। আপনি শুধু একটু দিক ঠিক করলেই, পথ নিজে থেকেই তৈরি হয়।” তার কথাগুলো আমার মনে দাগ কেটে গেলো। আমি চাকরিটা গ্রহণ করলাম। নতুন অফিস, নতুন পরিবেশ, নতুন দায়িত্ব সবকিছুই একদম নতুন। প্রথম কয়েকদিন একটু অস্বস্তি ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এবার আমার জীবনে একটা নির্দিষ্ট গতি এলো।

সকালে অফিস, বিকেলে সংসার, মাঝে মাঝে পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা সবকিছু যেন একটা ছন্দে বাঁধা পড়লো। আমি বুঝতে পারলাম জীবনকে গুছিয়ে নেওয়া এত কঠিন না, যদি পাশে একজন সঠিক মানুষ থাকে। সে আমার প্রতিটি পদক্ষেপে পাশে ছিল।

সকালে অফিসে যাওয়ার সময় তার হাসিমুখ, রাতে ফিরে তার অপেক্ষা এই ছোট ছোট বিষয়গুলো আমার জীবনে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিলো। আমি এখন আর আগের মতো খামখেয়ালি নই। আমি জানি আমার ওপর এখন দায়িত্ব আছে, আমার সিদ্ধান্তের সাথে আরেকটা জীবনের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।

এই উপলব্ধিটা আমাকে আরও পরিণত করে তুললো। একদিন রাতে আমরা ছাদে বসে ছিলাম। হালকা বাতাস বইছিল, আকাশে তারা জ্বলজ্বল করছে। সে হঠাৎ বললো, আপনি কি কখনো ভেবেছিলেন, আমাদের জীবনটা এমন হবে? আমি একটু হেসে বললাম, না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারতো না।

সে মৃদু হাসলো।

সেই হাসির মধ্যে আমি আমার পুরো পৃথিবী খুঁজে পেলাম। আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন বুঝতে পারি জীবনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ভুল, প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

যদি আমি তখন সেই রাতের প্রশ্নগুলো না করতাম, যদি আমি সেই সাহসটা না দেখাতাম তাহলে হয়তো আজ এই জীবনটা পেতাম না। জীবন আসলে কখনো সরল পথে চলে না। এটা বাঁক নেয়, থামে, আবার এগোয়। আর সেই পথচলায় যদি একজন সঠিক মানুষ পাশে থাকে, তাহলে যেকোনো কঠিন পথও সহজ হয়ে যায়।

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়