শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ১০:২৮

প্রস্থান পূর্বাভাস

সৌরভ সালেকীন
প্রস্থান পূর্বাভাস

একরকম বিরক্তি নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। বেরোনোর পর বিরক্ত খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি উৎসুক মুখে সূচনা দাঁড়িয়ে। তার চেহারায় অসম্ভব ভালোলাগা কাজ করছে। হাসিটাও ভীষণ প্রাণবন্ত! একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, এ হাসির অর্থ বেশ গভীর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয় বিষয়বস্তু অনুকূলে পেয়ে মানুষ যেমন আনন্দিত হয়, সূচনার মুখে ঠিক তেমনই আনন্দ বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

কোনো উৎসব, অনুষ্ঠান না থাকা সত্বেও, সূচনা আজ ঠিক কি কারণে আনন্দিত, তার ব্যাখ্যা বুঝতে যথেষ্ট বেগ পেতে হলো।

আমার ভাঙাচোরা ঘর আর নিরিহ উঠোনের লজ্জা তাকে উদ্বীগ্ন করেনি। আমাকে অপ্রস্তুত দেখেও তাঁর আনন্দে কমতি নেই। যে অদ্ভুত রোমাঞ্চ তার ভেতরটা তুমুল উৎসাহে আন্দোলিত করছে তা একপ্রকার ঝাপসাই রয়ে যায়। তবুও যেন শেষমেশ স্বপ্ন জয়! যেন এটাই জীবন, এটাই সে রাজা, এটাই তার রাজ্য!

হঠাৎই ভাবনায় ছেদ পড়ে; অপ্রত্যাশিত

মুহূর্তটা সাদা-কালো রঙে খাপছাড়া লাগতে থাকে।

সূচনার আগমন পরবর্তী, ঘর থেকে ঠিক কখন বেরিয়েছি, মনে নেই। ঘরে ফিরে দেখি সূচনা পবিত্র-প্রস্তুত ৷ মেঝেতে জায়নামাজ বিছানো। সে সেখানে বসেনি। জায়নামাজ বিছিয়ে রেখে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, আমার অপেক্ষা! তার অপেক্ষার ভঙ্গিমা একদম স্পষ্ট, উদ্দেশ্যও মহৎ! জায়নামাজ বিছানোর কারণ— প্রার্থনা করবে সে, যুগ্ম প্রার্থনা, আমাকে সাথে নিয়ে।

আমার অনুপস্থিতি কিংবা ফিরতে দেরি; উভয়ই তার প্রার্থনাকে প্রভাবিত করছিল। যেন আমি বিহীন এ প্রার্থনা অসম্পূর্ণ।

শোবার ঘরে ঢুকেই বেশকিছু সময় তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি। স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি দেখে মনে মনে মুগ্ধ হই। কৃতজ্ঞতায় ভাবি, স্রষ্টা যেন তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির সর্বোচ্চ মাধুর্যতা আমার সামনে এনে রেখেছেন৷

সে এক অদ্ভুত মুহূর্ত। যেখানে আমি আমার মায়ের কড়া দৃষ্টি ভুলে যাই, ভুলে যাই ঘরে বসবাস করা বাকি সদস্যদের। বাবা-মা, ভাই কিংবা বোন, কারো কোনো কথাই আমার মনে পড়েনি। মনে পড়েনি এমন মুগ্ধ চোখে সূচনার দিকে তাকিয়ে থাকা ঘটনার ভবিষ্যত বদ-বচন! মনে পড়েনি, মায়ের সামনে লজ্জা পেয়ে চুপসে যাওয়া অস্তিত্বের কথা।

তখন কেবল একটা কথাই মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল, স্রষ্টা কিভাবে এতো সুন্দর মানবী সৃষ্টি করেছেন!

ভাবনার ছেদ পড়ার কথা ছিলো না, অথচ আমার অঘোষিত কালবিলম্ব সূচনাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। আমি তার আনন্দ মাটি হতে দিতে পারি না।

একটুও কথা না বাড়িয়ে আমি তার ইশারা অনুসরণ করলাম। তার চোখ, হাতের আঙুল, মুখ-ভঙ্গিমা, সবকিছুই তখন নানাবিধ নির্দেশ নিয়ে সঞ্চালিত ছিলো। আমি কাছাকাছি আসতেই সূচনা আমায় জায়নামাজ এর দিকে তাকাতে বললো। বাক্য ব্যয় না করে সবকিছু পালনের বাধ্য চেষ্টায় প্রভাবিত হলাম। অবিচ্ছিন্ন দৃষ্টি দিয়ে নামাজের প্রস্তুতি নিতে ইশারা দিল। আমি যেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

এসবের মানে কি, উৎস কি? তাহলে কি আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে? আমরা কি তাহলে সব ধরণের বিধিনিষেধের গণ্ডি পেরিয়ে গেছি। এই সমাজ, এই বাস্তবতা, এই ভয়; এর সবই কি আমরা জয় করতে সক্ষম হয়েছি?

না, সবকিছুই কেমন যেন দুর্বোধ্য মনে হলো।

এসব জয় করার কথা ছিলো না। আমি তো এক যন্ত্রমানবে রূপান্তরিত হয়ে সূচনাকে নিয়মিত আঘাত করেছি। সাফ জানিয়েছি অস্তিত্ব সংকটের কথা। প্রত্যাখ্যান করেছি বিয়ের প্রস্তাব। এ নিয়ে সূচনার অভিমান আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। তবুও, তাঁর প্রতিশোধপরায়ণ মন গোপনে ঠিক কি পুষে রেখেছে তা আমার জানা হয়নি, বোধকরি আর কখনো হবেও না।

তাহলে এসব কি? ও আমার সামনে, আমার শোবার ঘরে, একেবারে একা, কিভাবে? কিভাবেই বা হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। বাবা-মা, ভাইবোন কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই। তাহলে কি এসব পূর্বপরিকল্পিত?

মুহূর্তেই আমার জটিল ভাবনায় ছেদ পড়ে। তাকিয়ে দেখলাম সূচনার নির্মল মুখখানা একদম চুপসে গেছে। ওর চোখের আনন্দ স্ফুলিঙ্গ ক্রমশ দমে যাচ্ছে। যদিও, শরীরের প্রতিক্রিয়া একদমই আগের মতো।

প্রার্থনার প্রস্তুতিও অব্যর্থ প্রকৃতির। দেখে মনে হচ্ছে, এই নামাজের অপেক্ষা তার দীর্ঘ দিনের। আমি বিস্ময়ে নিজের কথা ভুলে যাই। মগজে চাপ দিয়ে একটু ভাবার চেষ্টা করি— আনমনে, কখনো কি আমিও এমন কোনো মুহূর্তের স্বপ্ন দেখেছিলাম? নাহ, কিছু মনে করতে পারছি না। মানুষ যখন ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকা তাঁর প্রিয় কোনো জিনিস বিনা পরিশ্রমে পেয়ে যায়, ঠিক তখন, কয়েক মুহূর্তের জন্য মানুষ চিন্তা করতে ভুলে যায়।

ভাবুক আমার চিন্তায় একপ্রকার বাঁধা দিয়েই, সূচনা তাঁর ইচ্ছের পূর্ণতা দিতে তাড়া দেয়। আমি সবকিছু ভাবা বন্ধ করে নামাজের প্রস্তুতি নেই। একটাই জায়নামাজ বিছানো। একইসাথে দুজন পাশাপাশি বসি। একটু এঁটোসেঁটো হয়ে, কিছুটা কাছাকাছি।

সব প্রস্তুতি শেষ।

নামাজ শুরু করতেই যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির বাহিরে অটোরিকশার হর্ণ শুনতে পাই। হর্ণ শুনে আমি একটু ঘাবড়ে যাই, আমার ঘাবড়ানোর প্রতি মনোযোগ না দিয়ে সূচনা জায়নামাজ ছেড়ে অদ্ভুত দ্রুতি নিয়ে উঠে যায়। সূচনাকে অনুসরণ করে আমি উঠতে চাইলাম কিন্তু পারলাম না। মনে হলো জায়নামাজে আমার হাত-পা আটকে গেছে। নির্ধারিত কাল বিলম্ব না হওয়া অবধি এখান থেকে ছাড়া পাওয়া অসম্ভব। একমুহূর্তে ঘরের দেয়ালগুলো স্বচ্ছ কাঁচের মতো হয়ে গেলো। ঘরের ভেতরে বসেই বাহিরের প্রায় সবকিছু দেখা যায়। আমি ভালো করে লক্ষ্য করতেই ভেতরে একটা শূন্যতা অনুভব করি। ঘরে থেকেই দেখলাম, আমাকে জায়নামাজে বসিয়ে রেখে, এই মাত্র আসা অটোরিকশায় চড়ে সূচনা চলে যাচ্ছে। তার আগমন এবং প্রস্থান উভয়ই নাটকীয়, বোধহীন।

রিকশার একদম সামনেই তার বাবা বসে আছেন। গাম্ভীর্যপূর্ণ মুখ আর চোখ রক্তবর্ণ তার। একদৃষ্টে

তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।

রিকশা ধীর হতে আস্তে আস্তে তীব্রগতি প্রাপ্ত হচ্ছে। সূচনার বাবার কঠিন দৃষ্টি অটোরিকশার দ্রুতির সাথে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু রিকশায় উঠার পর সূচনাকে আর দেখিনি। শূন্যতা অনুভব করা মন, সূচনাকে না দেখতে পেয়ে মনে মনে ক্ষুব্ধ হলো, তুমুল বিরক্তি নিয়ে ভাবলো, অটোরিকশার পেট সমুদ্রসমান বিশাল। তা-না হলে খুব সহজেই সূচনাকে পূনরায় দেখতে পেতাম। যেমনটা দেখেছি তাঁর বাবার রক্তবর্ণ চোখ!

আমি অসহায় জায়নামাজে বসে আছি। সূচনাও চলে যাচ্ছে। আমার যেনো কোনো শক্তিই নেই। মুখে তীব্র জড়তা। চাইলেও জিজ্ঞেস করতে পারছি না, এসব কি হচ্ছে, কেনো হচ্ছে? এসবের মানে কি?

সূচনা কেনোই বা আসলো, কেনোই বা আমাকে জায়নামাজে বসিয়ে অসম্পন্ন প্রার্থনা রেখে চলে গেলো?

আমার অব্যক্ত প্রশ্নসমূহ ধীরে ধীরে মগজের মধ্যে ভারি হতে থাকে, আমি ক্রমশ সুচিন্তাবোধ হারাতে থাকি। আমার চারপাশ ভীষণ ভাবে অন্ধকার হয়ে আসে, আমি বুঝতে পারছি না এসব কি হচ্ছে? আমার দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ নিভে যাচ্ছে যেন। হায় আল্লাহ! আমি কি অন্ধ হয়ে যাচ্ছি? আমাকে কি কেউ দেখছে না? আমাকে উদ্ধার করবে কে? কে-ই বা আমাকে বলে দিবে, এতো সুন্দর অনূভুতিতে ছেদ দিয়ে সূচনার চলে যাওয়া কারণ!

আমি আস্তে আস্তে অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাই। ফের আচমকা বুকের মধ্যে হাতুড়ির আঘাতের মতো হৃদকম্পন অনুভব করি। তুমুল উত্তেজনায় হৃদপিণ্ড বিক্ষোভ করছে। চোখ মেলে দেখি অন্ধকার, মগজের ভারি ভাব চলে গেছে। একটু সময় নিয়ে সবকিছু বুঝতে চেষ্টা করি। না, এতক্ষণ ঘুমের মধ্যে ছিলাম!

অন্ধকারে বিছানা হাতড়ে মোবাইলটা বের করি। পাওয়ার বাটন টিপ দিতেই দেখি, রাত চারটা বেজে এগারো মিনিট!

না এতক্ষণ ধরে যা কিছু ঘটলো তা কোনো বাস্তবতা ছিলো না। সবটাই স্বপ্ন! আমি এতক্ষণ ভুলের মধ্যে ছিলাম।

কিন্তু নামাজ, নামাজের মানে কি? সূচনার নামাজ পড়তে চাওয়া আগ্রহ আর প্রস্থানের কারণ কি? কি-ই বা এর সম্ভাব্য উত্তর?

কে দেবে আমাকে তা, কে দেবে...

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়