শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:২২

অনামিকার দুঃস্বপ্ন

মিজানুর রহমান রানা
অনামিকার দুঃস্বপ্ন

পৃথিবীটা আলো-ছায়ার একটা খেলা। কখনও আলোর দিন, আবার কখনও অন্ধকারের রাত। রাতের অন্ধকারে মানুষ ভয় পায় আবার দিনের আলোতে মানুষ সাহস বুকে সঞ্চার করে পথচলা শুরু করে।

অনামিকা ক্লাস ফাইভের ছাত্রী। সে খুব মিষ্টি মেয়ে, পড়াশোনায় ভালো, গান গাইতে ভালোবাসে। কিন্তু তার একটা সমস্যা আছেÑসে প্রায়ই রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে। কখনো অন্ধকারে অদ্ভুত ছায়া, কখনো ভয়ঙ্কর শব্দ, আবার কখনো মনে হয় কেউ তাকে তাড়া করছে।

সেদিন রাতেও অনামিকা ঘুমোতে গেল। জানালার বাইরে চঁাদের আলো ঝলমল করছে। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে সে দেখলÑএকটা বিশাল কালো ছায়া তার সামনে দঁাড়িয়ে আছে।

ছায়াটা বলল, “আমি অন্ধকার। তোমার ভয়। তুমি আমাকে কখনোই জয় করতে পারবে না। তুমি হারিয়ে যাবে আমার মাঝে।”

অনামিকা ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল। মা এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। মা বললেন, “ভয়কে ভয় পেলে সে আরও বড় হয়। সাহস দেখালে ভয় ছোট হয়ে যায়। বুঝতে পারছো সোনা মনি?”

পরদিন স্কুলে অন্তরা নামের একজন শিক্ষক ক্লাসে একটি গল্প বলছিলেন। সেই গল্পের নাম “সাহসী রাজকন্যা”র গল্প। অনামিকা শিক্ষকের বলা গল্পটি খুবই মন দিয়ে শুনল। গল্পে রাজকন্যা ভয়ঙ্কর দানবকে পরাজিত করেছিল নিজের বুদ্ধি আর সাহস দিয়ে।

অনামিকা ভাবল, তাহলে আমিও তো নিজের বুদ্ধি আর সাহস দিয়ে অন্ধকারকে ভয় না পেয়ে জয় করতে পারি। যদি আমার দুঃস্বপ্নে কোনো দানব আসে, আমি তাকে বলবÑতুমি আমার কিছুই করতে পারবে না। এই দেখো আমি তোমাকে ভয় পাই না।

সেদিন রাতে আবার অন্ধকারের মাঝে দুঃস্বপ্নটা ফিরে এল। এবার অনামিকা দেখল সে এক অদ্ভুত দেশে চলে গেছে। চারদিকে অন্ধকার, গাছগুলো কেমন যেন বঁাকা হয়ে আছে, আকাশে কালো মেঘ।

হঠাৎ সেই ছায়া আবার হাজির হলো। “তুমি আবার এসেছো?” ছায়া বলল।

অনামিকা সাহস করে উত্তর দিল, “হ্যঁা, আমি এসেছি। তুমি যত বড়ই হও, আমি ভয় পাব না। আজ তোমাকে আমি শেষ করেই ছাড়বো।”

ছায়া হেসে উঠল ভয়ঙ্কর হাসি দিয়ে। তারপর অনামিকার দিকে আস্তে আস্তে তার কালো হাতগুলো দিয়ে ভীষণ ভয় দেখাতে লাগলো।

কিন্তু এবার অনামিকা পালাল না। সে হেসে উঠলো, তারপর বললো, ‘নিশ্চয়ই অন্ধকারের পরই আলো আসে, রাত শেষ হলেই ভোর হবে, সূর্য উঠবে আর অন্ধকার দূর হয়ে যাবে।’

সে চারদিকে তাকিয়ে দেখল হঠাৎ করেই অন্ধকারের মধ্যে ছোট ছোট আলো জ্বলছে।

আলো থেকে বেরিয়ে এল ছোট ছোট চরিত্রÑএকটা হাসিখুশি পাখি, একটা দুষ্টু খরগোশ, আর একটা বুদ্ধিমান বিড়াল।

তারা বলল, “আমরা তোমার বন্ধু। ভয়কে জয় করতে আমরা তোমাকে সাহায্য করব। তুমি কি আর ভয় পাবে?”

অনামিকা ভীষণ খুশি হয়ে তাদের সঙ্গে হঁাটতে লাগল। তারা তাকে শেখাল :

-ভয়কে জয় করার জন্য গভীর শ্বাস নিতে হয়।

-মনে মনে বলতে হয়: আমি সাহসী, আমি পারব।

-অন্ধকারে আলো খুঁজে নিতে হয়।

হঠাৎ আবার সেই ছায়া এসে হাজির হলো। এবার সে আরও ভয়ঙ্কররূপে কর্কশ কণ্ঠে বললো, “তুমি আমাকে হারাতে পারবে না!” এই বলে অন্ধকারের ছায়ামূর্তিটা চিৎকার করে ভীষণ গর্জে উঠল।

অনামিকা বন্ধুরা পাশে দঁাড়াল। অনামিকা জোরে বলল, “তুমি আমার ভয় নয়। আমি অনেক সাহসী। আমি তোমাকে মেরে ফেলবো।”

তারপর সে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। মনে মনে বলল, আমি পারব। হঠাৎ চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ল। অন্ধকারের কুৎসিত ছায়াটা ছোট হতে হতে চিৎকার করে মিলিয়ে গেল।

অনামিকা ঘুম ভেঙে দেখলÑসকালের সূর্য উঠেছে। মা হাসিমুখে বললেন, “আজ তুমি একেবারে শান্তিতে ঘুমিয়েছো।”

অনামিকা খুশি হয়ে বলল, “মা, আমি আমার দুঃস্বপ্নকে জয় করেছি। ভয়কে আর ভয় পাই না।”

মা প্রশ্ন করলেন, ‘কেন, কী হয়েছে সোনামনি?’

“মা ভয়কে জয় করার উপায় হলো সাহস। অন্ধকার যতই বড় হোক, আলো সবসময় জয়ী হয়। বন্ধু, পরিবার আর নিজের আত্মবিশ্বাস আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ঠিক না?’

“ঠিক তাই সোনামনি। যতই ভয় পাবে ততোই ভয় তোমাকে অঁাকড়ে ধরবে, আর যেদিন সাহস করে পথ চলবে সেদিন অন্ধকার নিজেই ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে, তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। জীবনের অন্ধকারগলিগুলো পেরিয়েই মানুষ সূর্যের আলোর দেখা পায়।”

ছবি : ৩৫

টুনটুন আর আকাশের চিঠি

জাফরিন জাকারিয়া

টুনটুন ছিল খুব কৌতূহলী আর হাসিখুশি একটা ছোট মেয়ে। সে থাকে এক শান্ত ছোট্ট শহরে, যেখানে সকালে পাখির ডাক শোনা যায় আর বিকেলে আকাশে রঙিন মেঘ ভেসে বেড়ায়। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে টুনটুন জানালার ধারে দঁাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “আজ আকাশটা কেমন গল্প বলবে?”

একদিন সকালে স্কুলে এসে টুনটুন শুনল একটি বড় খবর। আগামী রবিবার শহরের শিশুদের জন্য পত্রিকায় একটি বিশেষ শিশুপাতা বের হবে। সেখানে ছোটদের লেখা গল্প ছাপা হবে।

শিক্ষক হাসিমুখে বললেন, “যে কেউ চাইলে নিজের লেখা পাঠাতে পারো।”

টুনটুনের বুকটা আনন্দে লাফিয়ে উঠল। সে ভাবল, আমার গল্প যদি পত্রিকায় ছাপা হয়!

কিন্তু বাড়ি ফিরে সে একটু চিন্তায় পড়ে গেল। কারণ তার গল্প লেখার খাতাÑযেটাতে সে প্রতিদিন নতুন নতুন গল্প লিখেÑসেই খাতাটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না।

ওই খাতাটার মলাটে অঁাকা ছিল নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর একটা ছোট পাখি।

টুনটুন খাটের নিচে দেখল, টেবিলের ড্রয়ার খুলল, বইয়ের তাকের পাশে তাকালÑকিন্তু খাতা নেই।

তার চোখে পানি চলে এলো।

মা কাছে এসে বললেন, “কী হয়েছে টুনটুন?”

টুনটুন কঁাপা গলায় বলল, “আমার গল্পের খাতাটা হারিয়ে গেছে। ওটাই দিয়ে আমি পত্রিকায় পাঠাব।”

মা আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “চলো, ধীরে ধীরে ভাবি। শেষ কবে খাতাটা সঙ্গে নিয়েছিলে?”

টুনটুন একটু ভেবে বলল, “গতকাল লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম।”

মা বললেন, “তাহলে লাইব্রেরিতেই একবার খেঁাজ নিই।”

বিকেলের দিকে টুনটুন আর মা লাইব্রেরিতে গেল। লাইব্রেরিটা ছিল খুব শান্ত। চারদিকে বইয়ের গন্ধ, বড় বড় তাক আর জানালার পাশে বসে থাকা কয়েকজন শিশু।

হঠাৎ টুনটুন দেখল তার সহপাঠী রিমা একটা টেবিলে বসে তার গল্পের খাতাটাই উল্টে উল্টে দেখছে!

টুনটুন থমকে গেল।

সে ভয় পেলÑরিমা যদি ভাবে সে খাতা নিয়ে ঝগড়া করতে এসেছে?

কিন্তু তারপর সে সাহস করে এগিয়ে গিয়ে বলল, “রিমা, ওটা আমার খাতা।”

রিমা অবাক হয়ে তাকাল। তারপর লজ্জা পেয়ে বলল, “ওহ! আমি দুঃখিত টুনটুন। কাল চেয়ারের নিচে পড়ে ছিল। নাম লেখা ছিল না, তাই আমি ভেবেছিলাম কেউ রেখে গেছে।”

টুনটুন হালকা হাসল।

“আমি খুব চিন্তায় ছিলাম। এই খাতাটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়।”

রিমা বলল, “তুমি চাইলে তোমার গল্পটা আমাকে একদিন পড়তে দিও।”

টুনটুন খুশি হয়ে বলল, “অবশ্যই।”

খাতা ফিরে পেয়ে টুনটুনের মনটা আবার আলো হয়ে গেল।

সেদিন রাতে জানালার পাশে বসে টুনটুন তার গল্প লিখতে বসল। সে লিখলÑএকটি ছোট পাখি, যে আকাশে উড়ে উড়ে মানুষের কাছে ভালোবাসার চিঠি পেঁৗছে দেয়।

সে গল্পটার নাম দিলÑ‘আকাশের চিঠি’।

লেখা শেষ করে টুনটুন মনে মনে বলল, “আমিও তো আজ একটা চিঠি পেলামÑসাহস আর ভদ্রতার।”

রবিবার পত্রিকায় টুনটুনের গল্প ছাপা হলো।

স্কুলে সবাই তাকে ঘিরে ধরল।

শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, “টুনটুন, শুধু ভালো গল্প লেখাই নয়Ñতুমি খুব সুন্দর মানুষও।”

টুনটুন আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল।

তার মনে হলো, যখন আমরা ভদ্রভাবে কথা বলি আর সাহস নিয়ে সামনে যাই, তখন আমাদের ছোট স্বপ্নগুলোও বড় আকাশ পেয়ে যায়।

শিকড়ের আখ্যান

নাহিম প্রধানীয়া

ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে যখন দম বন্ধ হয়ে আসে, তখন মনের কোনো এক কোণে বেজে ওঠে আমার সেই অতি চেনা মাটির সুর। ছোটবেলার সেই পথ, ধুলোবালি আর প্রথম হঁাটি-হঁাটি পা-পা করার সেই স্মৃতিগুলো যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে আমার শিকড়ে।

১. প্রকৃতির অভিমানী প্রশ্ন

আমি যখন দীর্ঘ বিরতির পর গ্রামে ফিরি, তখন চারপাশের প্রকৃতি যেন আমায় ঘিরে ধরে কৈফিয়ত চায়:

* মাটি বলে : এতদিন কোথায় ছিলে? তোমার পায়ের স্পর্শ ছাড়া আমার বুকটা বড় শুকনো লাগে।

* গাছপালা বলে : আমার ছায়া কি এখন আর শীতল লাগে না? কার মোহে নিজেকে বঞ্চিত করলে আমার এই পরম মমতা থেকে?

* হিমেল হাওয়া বলে : ভোরবেলার সেই স্নিগ্ধতা ছেড়ে কোন ধেঁায়াশায় নিজেকে বন্দি করে রেখেছ?

* পাখিদের অভিযোগ : আমার গানে কি তুমি বিরক্ত? কেন আজ তুমি তোমার জন্মস্থানকে ভুলে দূরে আছো?

২. বাবা-মায়ের অন্তহীন প্রতীক্ষা

সবচেয়ে বড় সত্য তো সেখানে, যেখানে দুটি চোখ সারাদিন দরজার দিকে চেয়ে থাকে। পৃথিবীর সব অর্জন একদিকে, আর মা-বাবার সেই তৃপ্ত হাসির কাছে সব যেন ম্লান। আমরা অর্থের পেছনে ছুটি, সময়ের অজুহাত দেই, কিন্তু তাদের সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই।

শহুরে চাকচিক্যে ভুলেছি পথ, শিকড়কে দিয়েছি ফঁাকি,

সেই মাটিই জানে আমি কার কাছে ঋণী বাকি।

পাখির গানে অভিমান ঝরে, বাতাসে বহে সুর,

ফিরবে কবে পথিক তুমি, কোথায় যাবে এত দূর?

জন্ম যেথায়, মরণও সেথায়Ñমাটির কোলেই শেষ,

শিকড়ের টানেই টিকিয়ে রাখি আমার আসল বেশ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়