মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৭

ধারাবাহিক স্মৃতিকথা

বড়বেলার স্কুলজীবন

হীরামনি
বড়বেলার স্কুলজীবন

পূর্ব প্রকাশিতের পর

জানালায় একটা টোকা শুনতে পেলাম। কথা বললাম না। আরেকটা টোকা। পরপর অনেকগুলো। এবার বাধ্য হয়ে জানালাটা খুললাম। ও মা, এ কি! হুড়মুড় করে রোদ ঢুকে পড়লো। দাঁড়িয়ে আছে অসহায়ের মতো। আমি বললাম বসো, না না, শুয়ে পড়ো। রোদ বললো, কোথায়? কোথায় আবার? বিছানায়। আমার কথামতো রোদ বিছানায় শুয়ে পড়লো। আমিও পুরো প্রস্তুতি নিয়ে এসে ভীষণ মাখামাখি করলাম রোদের সাথে একই বিছানায়। এতো প্রেম! এতো প্রেম কেন ওর সাথে, ভেবে পাই না। ভীষণ ভালোবাসি ওকে। এতো মিষ্টি, আলতু আলতু, আরাম আরাম, তুলতুলে রোদ। জীবনে অসম্ভব ভালোলাগার রোশনাই এনে দেয় রোদ। পুরো আমিটাকে ঝকঝকে করে তুলে, তাই এতো ভালোবাসি ওকে। রোদের সাথে প্রেম চলাকালীন প্রেমের গান শুনতে বেশ ভালো লাগে। তাই পাশেই গান চালিয়ে দিলাম। “ছু কার মেরে মনকো, কিয়া তুনে কিয়া ইশারা” অদ্ভুত ভালোলাগায় ভালোবাসায় মন উপচে পড়ছে। এবার শুনছি “দিল মে এক লেহের সে উঠি হে আভি”। দারুণ লাগছে সবকিছু। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি মনে মনে জীবনকে এতো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখার জন্য।

রোদের আদর খেতে খেতে হঠাৎ মনে পড়লো একটা প্রজেক্ট কনসেপ্ট পেপার (পিসিপি) বানাতে হবে। কিন্তু পিসিপি নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবার পর আর ইচ্ছে করছে না। মনে হলো বই পড়ি। ইবনে খালদুন এর “মোকাদ্দিমা” পড়ছি নরম কম্বলের নিচে শুয়ে শুয়ে। বইয়ের প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিলাম। পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। বই পড়তে গেলেই অধিকাংশ মানুষের ঘুম আসে। আমারও একই অবস্থা হয়। আরামে আরামে ঘুমাচ্ছি আর ঘুম এর মাঝে আল্লাদে আদুরে আদুরে স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নকে আমরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করি। ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখলে আমার সব সময় মনে হয় আমার ঘুমের ডিস্টার্ব হচ্ছে। ঘুম পরিপূর্ণ হচ্ছে না। তাই সাধারণত আমি ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না। আজ আমার হাতে অফুরন্ত সময় আছে, তাই স্বপ্ন দেখাটা খারাপ হবে না, এই ভেবে ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখতে থাকলাম। স্বপ্ন দেখছি আর আরাম করে ঘুমাচ্ছি।

ঘুম ভাঙলো সন্ধ্যা বেলায়। ঘুম থেকে উঠে মনে হলো যে বইটা পড়ছিলাম সেটা শেষ করতে হবে। বই শেষ করে মনে হলো বাচ্চাদের সাথে কথা বলি। দুই মেয়ে আমার। তাদেরকে কোরিয়ায় নিয়ে আসার কথা থাকলেও বিশেষ কারণে আমার সাথে নিয়ে আসা হয় নি। তবে দুই মাস পরেই তারা আমাকে দেখতে আসবে। তাদের বাবা নিয়ে আসবে তাদের। বড় মেয়ের বয়স ১২, আর ছোটোর বয়স ৫। আমি কোরিয়ায় আছি প্রায় সাড়ে ৪ মাস, কিন্তু এই সাড়ে ৪ মাসে তারা অনেক বড় হয়ে গেছে। তারা এমনভাবে আমার খেয়াল রাখে মনে হয় যেন তারা আমার মা, আর আমি তাদের মেয়ে। প্রতিদিন আমাকে জিজ্ঞেস করবে, আমি খেয়েছি কী না, কী খেয়েছি, পড়াশোনা ঠিকমতো করছি না। আমি অবাক হয়ে যাই। এসব কথা আমার ওদেরকে জিজ্ঞেস করার কথা কিন্তু ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করে। মাঝে মাঝে মনে হয় এই দূরত্বটা হয়তো দরকার ছিলো যা ওদেরকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছে। তবে বাংলাদেশে থাকাকালীনও আমার দুই মেয়ে প্রতিযোগিতা করে আমাকে আদর করতো। অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর আমি ফ্রেশ হয়ে কোন ড্রেস পরবো, কী খাবো, কখন ঘুমাবো সব তারা খেয়াল করে আমাকে প্রতিটি কাজে সাহায্য করতো। আমার বড় মেয়ে ইউশা জেহনেসিব। সে আজ হঠাৎ করে বললো, আম্মি, আমি আগামীকাল থেকে হিজাব পরে স্কুলে যাবো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কেন হিজাব পরতে চাও? হিজাব পরলে কী হবে? তার উত্তর শুনে আমি অবাক। সে বলে, আমি মুসলমান আর মুসলমানদের পর্দা করতে হয়। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এটা কোত্থেকে শুনেছো? সে বললো, নানমনের কাছে শুনেছি। নানমন হলো তার নানী, আমার আম্মা। সে আরও বললো, আমার বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজনও হিজাব পরে। আমার বড় মেয়ের ডাক নাম জেহনেসিব। জেহনেসিব বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানতে খুবই আগ্রহী। আমিও তাকে সাহায্য করি যতটুকু সম্ভব। আমরা জন্মগতভাবে একটা ধর্ম পেয়ে যাই। আমাদের পিতা-মাতার ধর্মই আমাদের ধর্ম হিসেবে পালন করি। কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে জেনে তার পছন্দের ধর্ম বেছে নেওয়ার মতো স্বাধীনতা থাকা উচিত। তাছাড়া প্রচলিত কোনো ধর্মকে তার পছন্দ না হলে সে তার নিজের ধর্ম নিজেই সৃষ্টি করতে পারে।

মিথুন দাদা সব সময় খাবারের প্রতি খুবই যত্নশীল। তিনি নিরামিষভোজী। আজ দাদা কোত্থেকে যেন কলাপাতা যোগাড় করেছেন। আমরা ঠিক করলাম কলাপাতায় ভাত খাবো। মজার ব্যাপার, কোরিয়ায় কলাপাতায় খাচ্ছি। খাচ্ছি সব মুখরোচক নিরামিষ খাবার। দাদার রান্না অসাধারণ। যেমন সুগন্ধি তেমন স্বাস্থ্যসম্মত। কলাপাতায় করে দুজনে পেট পুড়ে খেলাম।

হীরামনি : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান।

(চলবে, পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়