প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৫
বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কষ্টের বিনিময়ে ঝুঁকিমুক্ত হোক বাজার

উন্নয়ন মানেই জনদুর্ভোগ বাড়ানো নয়; বরং মানুষের জীবনযাত্রাকে নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও গতিশীল করাই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য। অথচ আমাদের দেশে অনেক সময় উন্নয়নকাজের পরিকল্পনায় সমন্বয়হীনতার কারণে জনসাধারণকে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি ও দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। হাজীগঞ্জ বাজারে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সড়কের পাশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুতের খুঁটিগুলো সরানোর বিষয়টি শুরুতে উপেক্ষিত ছিলো। এমনকি কয়েকটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক খুঁটি সড়কের স্লাব ঢালাইয়ের ভেতরে আটকে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল শুরু হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিষয়টি সময়মতো নজরে না এলে যে কোনো সময় ঘটতে পারত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী সাইফুল ইসলাম সিফাতের পাশাপাশি হাজীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি উপলব্ধি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। বিষয়টি নিয়ে দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠে অন্যতম লিড সংবাদ প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীতে সম্পাদকীয়ও লেখা হয়। পাশাপাশি অন্যান্য গণমাধ্যমেও ধারাবাহিকভাবে লেখালেখি হওয়ায় বিষয়টি জনআলোচনায় আসে। অবশেষে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ খুঁটি স্থানান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এটি নিঃসন্দেহে জনস্বার্থে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগের ইতিবাচক ফল।
তবে এই উদ্যোগের বিনিময়ে হাজীগঞ্জ বাজারের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত টানা ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হবে, তাও ৮ থেকে ১০ দিন। অর্থাৎ একটি জননিরাপত্তামূলক কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, রোগী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, বাসাবাড়ির মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিককে যথেষ্ট ভোগান্তি পোহাতে হবে। বিশেষ করে বাজারের ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে সড়ককে দুর্ঘটনামুক্ত করা এবং মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে সাময়িক এই দুর্ভোগ মেনে নেওয়া ছাড়া বিকল্পও সীমিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দুর্ভোগ কি আরও পরিকল্পিতভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব। কাজের গতি বাড়ানো, পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় আগাম তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে জনদুর্ভোগ অনেকাংশে কমানো যেতে পারে। ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের এ বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হাজীগঞ্জের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে চাঁদপুর শহরের ফরিদগঞ্জ বাইপাস সড়ক, যা সাবেক বঙ্গবন্ধু সড়ক নামে পরিচিত, সম্প্রসারণের কাজও পার্শ্ববর্তী বিদ্যুতের খুঁটি সরানোর উদ্যোগ ছাড়াই শুরু হয়েছিলো। পরবর্তীতে একটি ভারী যানবাহনের ধাক্কায় বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌভাগ্যক্রমে তখন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি কবির হোসেন মিজি সচিত্র সংবাদ প্রকাশ করলে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পৌর কর্তৃপক্ষ ওই সড়কে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড খুঁটিগুলো সরানোর উদ্যোগ নেয়। দুটি ঘটনার মধ্যে একটি অভিন্ন শিক্ষা রয়েছে—উন্নয়নকাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা না হলে উন্নয়নই মানুষের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আমরা মনে করি, সড়ক সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের আগেই সড়কের দুই পাশের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ইন্টারনেট ও অন্যান্য সেবা-সংযোগের অবস্থান নিরূপণ করে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। কাজ চলাকালে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো যেন দুর্ঘটনার কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখার সময়সীমা যথাসম্ভব কমিয়ে এনে গ্রাহকদের ভোগান্তি লাঘব করতে হবে।
চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জের দুটি সড়কে গণমাধ্যমকর্মীদের সময়োচিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রমাণ করেছে, গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষা, প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সম্ভাব্য বিপর্যয় প্রতিরোধেরও শক্তিশালী হাতিয়ার। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গণমাধ্যমের এমন ইতিবাচক ভূমিকা সমাজে তাদের প্রয়োজনীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও সুদৃঢ় করে।
আমাদের প্রত্যাশা, হাজীগঞ্জ বাজারে বিদ্যুতের খুঁটি স্থানান্তরের কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই নিরাপদে সম্পন্ন হবে। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সাময়িক কষ্টকে যথাসম্ভব কমিয়ে এনে বাজারকে করা হবে দুর্ঘটনামুক্ত ও ঝুঁকিহীন। উন্নয়নের সুফল যেন মানুষের জীবনকে নিরাপদ করে, দুর্ভোগ ও বিপদের নতুন কারণ না হয়—সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।





