প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩২
শর্ট সার্কিট থেকে বারবার আগুন লাগাটা খুবই উদ্বেগের

একটি আগুন পুড়িয়ে দেয় শুধু দোকানের মালামাল নয়, পুড়িয়ে দেয় একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। গ্রামীণ বাজারে গভীর রাতে আগুন লাগার ঘটনা তাই নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে যদি বৈদ্যুতিক ত্রুটি, অপরিকল্পিত সংযোগ কিংবা নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ভূমিকা থাকে, তবে তা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার গৃদকালিন্দিয়া বাজারের ‘মুদি গলি’তে বুধবার (৭ অক্টোবর ২০২৬) দিবাগত রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি আবারও সেই প্রসঙ্গটি সামনে এনেছে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস। আগুনে চারটি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে এবং আরও তিনটি দোকান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে তাদের প্রায় অর্ধকোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত তৎপরতায় আরও বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তাদের এই ভূমিকা প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এমন আগুন বারবার লাগার পরও কেন গ্রামীণ বাজার ও বাড়িঘরের বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
উল্লেখ করা দরকার যে, বৈদ্যুতিক সার্কিটে বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য নির্ধারিত পথের বাইরে অস্বাভাবিকভাবে কম বাধার পথ তৈরি হলে তাকে শর্ট সার্কিট বা বিদ্যুৎ-শর্ট বলা হয়। তারের ইনসুলেশন নষ্ট হওয়া, দুটি পরিবাহীর অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্পর্শ, ত্রুটিপূর্ণ সুইচ-সকেট কিংবা সংযোগস্থলে ত্রুটির কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। এতে মুহূর্তের মধ্যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে প্রচণ্ড তাপ ও স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে। আশপাশে কাগজ, কাপড়, প্লাস্টিক, কাঠ কিংবা অন্যান্য দাহ্য পদার্থ থাকলে সেখান থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সব বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডের কারণ শর্ট সার্কিট নয়। নিম্নমানের তার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, অতিরিক্ত লোড, ঢিলা সংযোগে তাপ সৃষ্টি, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্র এবং যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থার অভাব থেকেও আগুন লাগতে পারে। অনুপযুক্ত ফিউজ বা সার্কিট ব্রেকার এবং দীর্ঘদিন বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা না করাও ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে শুধু ‘শর্ট সার্কিট’ বলেই ঘটনার তদন্ত শেষ করা যায় না; প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডের সরকারি পরিসংখ্যানও বিষয়টির ভয়াবহতা তুলে ধরে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৩৯২টি, অর্থাৎ ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশের কারণ ছিল বৈদ্যুতিক গোলযোগ। একই বছরে আবাসিক ভবনে ৮ হাজার ৭০৫টি এবং দোকানে ১ হাজার ৮০০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বাজারেও ঘটেছে ১ হাজার ৬৭টি অগ্নিকাণ্ড। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা এবং বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অগ্নিঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে এই জাতীয় পরিসংখ্যান দিয়ে শুধু গ্রামীণ এলাকার অগ্নিকাণ্ডের অনুমাননির্ভর কারণ কেবল শর্ট সার্কিটÑএমন দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সে জন্য গ্রামভিত্তিক, স্থানভিত্তিক ও কারণভিত্তিক নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
এখানে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ব্যবহার নিয়ে বিশেষভাবে তদন্ত হওয়া দরকার। গ্রামীণ বাজারে কোথাও কোথাও অদক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন, প্রয়োজনের তুলনায় কম ক্ষমতার তার ব্যবহার, একই লাইনে অতিরিক্ত দোকান সংযুক্ত করা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ তার ও সুইচ-সকেট ব্যবহারের অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু গৃদকালিন্দিয়া বাজারের আগুন নিম্নমানের সামগ্রীর কারণেই ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্ত তদন্তের আগে দেওয়া ঠিক হবে না। প্রকৃত কারণ জানতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে।
এ জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গৃদকালিন্দিয়া বাজারের অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান করে তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে গ্রামীণ বাজার ও বসতবাড়িতে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার একটি পৃথক পরিসংখ্যানভিত্তিক চিত্র তৈরি করতে হবে। কোন্ ধরনের তার, সংযোগ, যন্ত্রপাতি কিংবা স্থাপনাপদ্ধতির সঙ্গে আগুন লাগার সম্পর্ক বেশি, তা শনাক্ত করা গেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ সহজ হবে। নিম্নমানের পণ্য দায়ী হলে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী ও বিক্রেতার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; আর ত্রুটিপূর্ণ স্থাপন বা অতিরিক্ত লোড দায়ী হলে সেসব সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।
শুধু তদন্ত করলেই চলবে না, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। বাজারের বৈদ্যুতিক সংযোগের নিয়মিত পরীক্ষা, অতিরিক্ত লোড নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত তার ও সরঞ্জাম ব্যবহার, উপযুক্ত সার্কিট ব্রেকার স্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্ত তার দ্রুত পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে হবে। দোকান বন্ধ করার আগে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও সংযোগ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আগুন লাগলে দ্রুত খবর দেওয়ার ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার এবং দোকানগুলোর মাঝখানে নিরাপদ চলাচলের পথ রাখাও জরুরি। স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি, জনপ্রতিনিধি ও বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো যেতে পারে।
গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের তদন্তভিত্তিক বক্তব্য, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার নিয়ম এবং আগুন প্রতিরোধের সতর্কবার্তা সহজ ভাষায় নিয়মিত প্রচার করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি গ্রামীণ বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
গৃদকালিন্দিয়া বাজারের আগুন আমাদের জন্য আরেকটি সতর্কসংকেত। আজ কয়েকটি দোকান পুড়েছে; আগামীকাল কোনো বাড়ি, বাজার কিংবা জনবহুল স্থাপনায় আরও বড় বিপর্যয় ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? আগুন লাগার পর ক্ষয়ক্ষতি গুণে দীর্ঘশ্বাস ফেলার চেয়ে আগুন লাগার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা অনেক বেশি জরুরি। বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাকে অবহেলা নয়, নিয়মিত তদারকি ও জনসচেতনতার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রত্যাশাÑশুধু দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও তারা সক্রিয় হবে। কারণ, সময়মতো একটি ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ শনাক্ত করা মানে একটি পরিবার, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি একটি গোটা বাজারকে ভয়াবহ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা।








