প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২২:১৫
স্থানীয় সরকার নির্বাচন : সম্ভাব্য প্রার্থীর মুখোমুখি-৭৩
নির্বাচিত হলে ইউনিয়ন পরিষদকে দুর্নীতিমুক্ত, জনবান্ধব ও আধুনিক সেবা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করবো
---------------শাহাদাত হোসেন মিয়াজী

মো. শাহাদাত হোসেন মিয়াজী। ‘মিয়াজী ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মতলব দক্ষিণ উপজেলার ৩নং খাদেরগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ১৬০নং পুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি তাঁর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। এ ব্যাপারে চাঁদপুর কণ্ঠের মুখোমুখি হয়ে তিনি কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন, যা নিচে তুলে ধরা হলো--
|আরো খবর
চাঁদপুর কণ্ঠ : আপনি কেনো ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চান? আপনার রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত পরিচিতি সম্পর্কে বলুন।
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চাই এ জন্যে যে, মানুষের সমস্যা শুধু শুনতে নয়, দায়িত্ব নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নিতে চাই। ইউনিয়নের উন্নয়ন, নাগরিক সেবা ও মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতেই মূলত আমি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চাই। আমি একজন ব্যবসায়ী। ছাত্ররাজনীতির পর বর্তমানে ৩নং খাদেরগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এছাড়া ইউনিয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, গ্রামীণ উন্নয়নসহ মানবতার সেবায় নিবেদিত অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন ‘মিয়াজী ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। এসব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ইউনিয়ন পরিষদ গড়তে চাই। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সবার জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করাই আমার অন্যতম লক্ষ্য। জনগণের আস্থা ও সহযোগিতা পেলে চেয়ারম্যানের পদকে ব্যক্তিগত মর্যাদা নয়, মানুষের কল্যাণে নিবেদিত একটি দায়িত্ব হিসেবে পালন করবো এবং ‘স্মার্ট ইউনিয়ন’ গড়ে তুলবো—এই প্রত্যাশায় নির্বাচন করতে চাই।
চাঁদপুর কণ্ঠ : নির্বাচিত হলে ইউনিয়নের উন্নয়নে আপনার প্রথম তিনটি অগ্রাধিকারমূলক কাজ কী হবে?
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : একটি ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। ইউনিয়নের প্রধান সড়ক এবং বাজারসংলগ্ন এলাকাগুলোর ভঙ্গুর সড়কগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার ও পাকা করা হবে।
বর্ষা মৌসুমে যেনো এই ইউনিয়নের প্রধান ও গ্রামীণ সড়কগুলোতে পানি না জমে, সেজন্য পরিকল্পিত ড্রেনেজ ও কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। রাতের বেলা জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়কের মোড়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত ল্যাম্পপোস্ট বা স্ট্রিটলাইট স্থাপন করা হবে। জনগণের মৌলিক অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে সেখানে নিয়মিত ডাক্তার, নার্স এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ পরিষদের সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের নিয়মিত মাসিক সভার ব্যবস্থা করা হবে। সেখানেই ইউনিয়নের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পরিষদের সব কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
চাঁদপুর কণ্ঠ : আপনার ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? তা সমাধানে আপনার পরিকল্পনা কী?
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মাদক ও কিশোর গ্যাং বা কিশোর অপরাধচক্র, যা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এই ইউনিয়নে কিশোর গ্যাং নেই বললেই চলে। তবে এই ইউনিয়নের আশপাশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদক কারবারিদের আনাগোনা রয়েছে। যার প্রভাব পরিবার ও সমাজে পড়ে। যেহেতু মাদকের বিষয়ে রাষ্ট্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থান জিরো টলারেন্স, সেক্ষেত্রে এই সমস্যা সমাধানে আমার পরিকল্পনা হচ্ছে, প্রথমে মাদকাসক্তদের শনাক্ত করা এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে মাদকাসক্তদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ থেকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে সুন্দর জীবনযাপনের পথ তৈরি করা।
চাঁদপুর কণ্ঠ : ইউনিয়নের রাস্তাঘাট, যোগাযোগব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে আপনার পরিকল্পনা কী?
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : ইউনিয়নের প্রতিটি কাঁচা রাস্তা পর্যায়ক্রমে কার্পেটিং বা সিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে পাকা করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ও খানাখন্দে ভরা প্রধান সড়কগুলো দ্রুত মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করা হবে।
রাতের বেলা যাতায়াত নিরাপদ করতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত (সোলার) স্ট্রিটলাইট স্থাপন করা হবে। স্থানীয় হাটবাজারগুলোর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশন, শেড নির্মাণ এবং বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও গণশৌচাগার নির্মাণ করা হলে ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। আর আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব উন্নয়নকাজ ত্বরান্বিত করবো, ইনশাআল্লাহ।
চাঁদপুর কণ্ঠ : ইউনিয়নের মাদক, জুয়া, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যা দূর করতে কী পদক্ষেপ নেবেন?
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : এসব সমস্যা সমাধানে প্রতিটি ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সমন্বয়ে গতিশীল এবং জনসচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের যৌথ প্রচেষ্টা ও পুলিশের নিয়মিত টহলের মাধ্যমে এসব সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদে একটি অভিযোগ বক্স স্থাপন করা হবে। মাসিক সভায় অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করবো। সরকারি জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ (জরুরি সেবা), ৩৩৩ (জাতীয় তথ্য ও সেবা) এবং ১০৯ (নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ) সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার জন্য প্রচারাভিযান চালানোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
চাঁদপুর কণ্ঠ : ইউনিয়নের দরিদ্র, অসহায়, প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আপনার কী পরিকল্পনা রয়েছে?
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : প্রথম পদক্ষেপেই ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে জরিপ চালিয়ে প্রকৃত দরিদ্র, অসহায়, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করবো, যাতে প্রকৃত অর্থেই যাঁরা সহায়তা পাওয়ার যোগ্য, তারা যেনো সরকারি অনুদান বা সুবিধা থেকে বাদ না পড়েন। ইউনিয়নের দরিদ্র, অসহায়, প্রতিবন্ধী এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্যে আমার একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা রয়েছে।
চাঁদপুর কণ্ঠ : কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে কী ধরনের উদ্যোগ নিতে চান?
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : কৃষকদের মধ্যে কম খরচে আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে স্বল্প সুদে জামানতবিহীন কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা হবে। ইউনিয়নের রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও মেরামতসহ উন্নয়ন প্রকল্পে এক্সেভেটর ব্যবহার না করে কাবিটা ও কাবিখা প্রকল্পের ওপর গুরুত্ব দেবো। ফলে স্থানীয় শ্রমিকেরা তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাবেন।
ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা এবং সমবায়ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কাজ করবো, ইনশাআল্লাহ।
চাঁদপুর কণ্ঠ : জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিক সনদসহ ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সেবা দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে নিশ্চিত করবেন কীভাবে?
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি)কে শতভাগ কার্যকর ও আধুনিকায়ন করে জনবল বাড়ানো হলে জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ ও নাগরিক সনদ প্রাপ্তি সহজ হবে।
বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার আবেদন সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে এসব সেবাগ্রহীতাকে পরিষদে এসে হয়রানির শিকার হতে হবে না বা অযথা সময় ব্যয় করতে হবে না। এতে সেবাপ্রাপ্তিও সহজ হবে বলে আশা করি।
চাঁদপুর কণ্ঠ : ইউনিয়ন পরিষদের সেবা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে কী পদক্ষেপ নেবেন?
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকারের সর্বশেষ স্তর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান। একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রায় ৮০ থেকে ৮২ ধরনের সেবা দেয়া এবং বিভিন্ন সেবা খাতে বরাদ্দ দেয়া সম্ভব। কিন্তু জনগণ ক'টি সেবা বা সেবা খাতের বরাদ্দ পায় তা ৯০ শতাংশ জনগণই জানে না। আর জানেন না বলেই সাধারণ জনগণকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
আমি দুর্নীতিমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন সেবা প্রদানের অঙ্গীকার নিয়েই চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চাই। আমি নির্বাচিত হলে খাদেরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদকে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত করবো ইনশাআল্লাহ।
চাঁদপুর কণ্ঠ : ভোটাররা কেনো আপনাকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করবেন বলে আপনি মনে করেন? তাদের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী?
শাহাদাত হোসেন মিয়াজী : আমাকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করলে এলাকার উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সাধারণ মানুষের সেবা করার জন্য সততা ও জবাবদিহির সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি ইউনিয়ন পরিষদকে একটি দুর্নীতিমুক্ত, জনবান্ধব ও আধুনিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করবো। পরিষদের প্রতিটি কাজের হিসাব ও অনুদানের সঠিক ব্যবহারের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত রাখবো। কোনো ধরনের দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় দেবো না। তাই এলাকার উন্নয়নে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ চাই। আগামী নির্বাচনে আপনাদের দোয়া ও মহামূল্যবান ভোট প্রার্থনা করছি। আপনাদের সুখে-দুঃখে আমি সবসময় পাশে ছিলাম, এখনও আছি, আগামীতেও বিশ্বস্ত সেবক হয়ে পাশে থাকতে চাই। ধন্যবাদ সবাইকে।








