প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৩
ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়
মিলাদুন্নবী উৎসব যুগে যুগে

নবী করীম (দ.) নবুয়ত পরবর্তীকালে নিজেই সাহাবীদেরকে নিয়ে নিজের মিলাদ পড়েছেন এবং নিজ জীবনী আলোচনা করেছেন। যেমন-: হযরত ইরবায ইবনে ছারিয়া (রাঃ) একদিন নবী করীম (দ.)-কে তাঁর আদি বৃত্তান্ত বর্ণনা করার জন্য আরয করলে নবী করীম (দ.)-এরশাদ করেন-“আমি তখনও নবী ছিলাম- যখন আদম (আঃ)-এঁর দেহের উপাদান - মাটি ও পানি পৃথক পৃথক অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ আদম সৃষ্টির পূর্বেই আমি নবী হিসেবে মনোনীত ছিলাম। আমাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) দোয়া করে তাঁর বংশে এনেছেন- সুতরাং আমি তাঁর দোয়ার ফসল। হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর উম্মতের নিকট আমার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তাঁরা উভয়েই আমার সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত ছিলেন। আমার আম্মা বিবি আমেনা আমার প্রসবকালীন সময়ে যে নূর তাঁর গর্ভ হতে প্রকাশ পেয়ে সুদূর সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত করতে দেখেছিলেন, আমিই সেই নূর” (মিশকাত শরীফ)।
এভাবে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রা.), হযরত ওসমান (রা.) , হযরত আলী (রা.) খলিফা চতুষ্টয় নিজ নিজ খেলাফত যুগেও পবিত্র বেলাদত শরীফ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল করতেন এবং মিলাদের ফযিলত বর্ণনা করতেন বলে মক্কা শরীফের তৎকালীন (৯৭৪) বিজ্ঞ মুজতাহিদ আলেম আল্লামা ইবনে হাজার হায়তামী (রা.) স্বীয় রচিত “আন-নি’মাতুল কোবরা আলাল আলম” গ্রন্থে’ উল্লেখ করেছেন।
এছাড়াও অন্যান্য সাহাবীগণ নবীজীর জীবদ্দশায় মীলাদুন্নবী মাহফিল করতেন। উদাহরণ স্বরূপ -
১) হযরত আবু আমের আনসারীর মিলাদ মাহফিল-
হযরত আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত আছে-তিনি বলেন, আমি একদিন নবী করীম (দ.)-এঁর সাথে মদীনাবাসী আবু আমের (রা.) এঁর গৃহে গমন করে দেখতে পেলাম- তিনি তাঁর সন্তানাদি ও আত্মীয়-স্বজনকে একত্রিত করে নবী করীম (দা.)-এঁর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কিত জন্ম বিবরণী শিক্ষা দিচ্ছেন এবং বলছেন যে, “আজই সেই পবিত্র জন্ম তারিখ।” এই মাহফিল দেখে নবী করীম (দ.) খুশী হয়ে তাঁকে সুসংবাদ দিলেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমার জন্য (মীলাদের কারণে) রহমতের অসংখ্য দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাগণ তোমাদের সকলের জন্য মাগফিরাত কামনা করছেন” (আল্লামা জালালুদ্দীন সায়ুতির সাবিলূল হুদা ও আল্লামা ইবনে দাহ্ইয়ার আত-তানভীর-৬০৪ হিঃ)।
(মীলাদের উপর প্রথম গ্রন্থ’ রচনাকারী আল্লামা আবুল খাত্তাব ইবনে দেহিয়া (৬৩৩ হি:) ঈদে মীলাদুন্নবীর উপর লিখিত “আত-তানবীর ফী মাওলিদিল বাশির আন নাযীর” গ্রন্থে এই মতটিকেই গ্রহণ করেছেন। কিতাবুত তানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর, সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদে মোস্তফা (দা.), হাক্বীক্বতে মুহম্মদী ও মীলাদে আহমদী পৃষ্ঠা- ৩৫৫)২। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) কর্তৃক মিলাদ মাহফিল- একদিন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) নিজগৃহে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি উপস্থিত সাহাবাগণের নিকট নবী করীম (দা.)-এঁর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কিত ঘটনাবলী বয়ান করছিলেন। শ্রোতামন্ডলী শুনতে শুনতে মীলাদুন্নবীর আনন্দ উপভোগ করছিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও নবীজীর দরূদ পড়ছিলেন। এমন সময় নবী করীম (দ.) সেখানে উপস্থিত হয়ে এরশাদ করলেন, “তোমাদের সকলের প্রতি আমার সুপারিশ ও শাফাআত অবধারিত হয়ে গেল।” (আদ দুররুল মুনাযযাম)
৩। হযরত হাসসান (রা.) -এঁর কিয়ামসহ মিলাদ : সাহাবী কবি হযরত হাসসান বিন সাবিত (রা.) দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নবী করীম (দ.)-এঁর উপস্থিতিতে তাঁর গৌরবগাঁথা পেশ করতেন এবং অন্যান্য সাহাবীগণ সমবেত হয়ে তা শ্রবণ করতেন। (সপ্তম অধ্যায়ে দেখুন)।
কিয়াম করে মিলাদ মাহফিলে নবী করীম (দ.)-এঁর প্রশংসামূলক কবিতা ও না’ত পাঠ করা এবং সালাম পেশ করার এটাই বড় দলীল। এরূপ করা সুন্নাত এবং উত্তম বলে মক্কা-মদীনার ৯০ জন উলামা ১২৮৬ হিজরীতে নিম্নোক্ত ফতোয়া দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রেরণ করেছেন।
অর্থঃ-“হে মুসলমানগণ! আপনারা জেনে রাখুন যে, মীলাদুন্নবী (দ.)-এঁর আলোচনা ও তাঁর সমস্ত শান-মান বর্ণনা করা এবং ঐ মাহফিলে উপস্থিত হওয়া সবই সুন্নাত। বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসসান বিন সাবিত (রা.) কিয়াম অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (দ.)-এঁর পক্ষে হুযুরের উপস্থিতিতে হুযুর (দ.)-এঁর গৌরবগাথা পেশ করতেন, আর সাহাবীগণ তা শুনার জন্য একত্রিত হতেন।” (ফতোয়ায়ে হারামাঈন) একজনের কিয়ামই সকলের জন্য দলীল স্বরূপ।
হযরত হাসসান বিন সাবিত (রা.)-এঁর কিয়ামের কাছিদার অংশবিশেষ ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ কাছিদায় তিনি রাসূল করীম (দ.) -এঁর আজন্ম নির্দোষ ও নিষ্পাপ হওয়া এবং হুযুরের ইচ্ছানুযায়ী তাঁর আকৃতি বা সুরতে মুহাম্মাদী সৃষ্টির তত্ত্ব পেশ করেছেন। নবী করীম (দ.) তাঁর এই কাসিদা শুনে দোয়া করতেন- “হে আল্লাহ! তুমি জিব্রাইলের মাধ্যমে হাসসানকে সাহায্য কর।” অর্থাৎ আমার পক্ষে আমার প্রশংসাবাক্য সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার তৌফিক দাও। এতে আমার দুশমনগণ ভালভাবে জব্দ হবে। (চলবে)। সূত্র : নূরনবী। লেখক : অধ্যক্ষ এমএ জলিল (র.)।








