বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:০৪

গবেষণায় বৈশ্বিক উৎকর্ষ ও শেকড়ের টানে মানবসেবায় অধ্যাপক ড. শায়ের গফুর

উজ্জ্বল হোসাইন
গবেষণায় বৈশ্বিক উৎকর্ষ ও শেকড়ের টানে মানবসেবায় অধ্যাপক ড. শায়ের গফুর

একটি দেশের প্রকৃত রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার উচ্চশিখরে পেঁৗছানোর পেছনে কাজ করে কিছু অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী সাধনা। যঁারা শুধু দেশীয় অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং নিজেদের প্রজ্ঞা, উদ্ভাবনী মেধা এবং একনিষ্ঠ গবেষণা দিয়ে বৈশ্বিক দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন, তঁাদের অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। একইসঙ্গে উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করেও যঁারা নিজেদের জন্মমাটি, শেকড় এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হন না, তঁারাই হন সমাজের প্রকৃত রূপকার। বাংলাদেশের স্থাপত্যশিক্ষা, নগর পরিকল্পনা এবং বৈশ্বিক মানের গবেষণায় এমনই এক অনন্য আলোকবর্তিকা অধ্যাপক ড. শায়ের গফুর।

তিনি একাধারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর স্থাপত্য ও নগর অঞ্চল পরিকল্পনা অনুষদের সম্মানীয় ডীন, বিশিষ্ট স্থাপত্য গবেষক এবং চঁাদপুর ডায়াবেটিক সমিতির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের স্থাপত্য শিক্ষাকে আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গবেষণার স্বাক্ষর রেখেও নিজ জেলা চঁাদপুরের মানুষের চিকিৎসাসেবা ও জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন তা আধুনিক বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল দিকনির্দেশনা।

অধ্যাপক ড. শায়ের গফুরের জীবনের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, সততা এবং দেশপ্রেমের মূল ভিত্তিটি তৈরি হয়েছিল তঁার পারিবারিক সংস্কৃতি ও আবহ থেকে। চঁাদপুর জেলার এক আলোকপ্রাপ্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে তঁার জন্ম। তঁার পরিবারে শিক্ষা, মানবসেবা এবং সমাজকল্যাণ কেবল কোনো অলংকার ছিল না বরং তা ছিল বংশানুক্রমিক জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তঁার পিতা আলহাজ ডা. এম. এ. গফুর ছিলেন চঁাদপুরের চিকিৎসা জগতের এক কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব এবং প্রথিতযশা সমাজসেবক। চঁাদপুরের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি চিকিৎসাসেবা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তিনি চঁাদপুর ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জেলার চিকিৎসাসেবাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। তিনি ও তঁার স্ত্রী অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন বহু মূল্যবান জমি দান করে চঁাদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় অনুকরণীয় হয়ে আছেন। নিঃস্বার্থ জনসেবা এবং আর্তপীড়িত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তঁার জীবনের ব্রত।

অন্যদিকে, ড. শায়ের গফুরের মা মাহমুদা খাতুন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ হওয়ার পাশাপাশি তিনি সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেও ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তিনি শুধু শিক্ষার আলোই ছড়াননি বরং চঁাদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালের জমিদাতা ও আজীবন সদস্য হিসেবে সমাজসেবামূলক উদ্যোগে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে গেছেন। মা-বাবার এই শিক্ষা, নীতিজ্ঞান এবং সেবার দৃষ্টিভঙ্গি ড. শায়ের গফুরের মনোজগতে সমাজকল্যাণ ও দায়িত্ববোধের এক গভীর বীজ রোপণ করে দিয়েছিল।

কেবল পিতৃকুলই নয়, তঁার মাতৃকুলের ইতিহাসও বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে অত্যন্ত গৌরবময়। তঁার মাতুলালয় চঁাদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার আশ্বিনপুর গ্রামে। তঁার নানা মরহুম শাহেদ আলী পাটোয়ারী ছিলেন পূর্ব বাংলা তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাজনীতির এক অবিসংবাদিত নেতা, প্রখ্যাত আইনজীবী এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পীকার। তৎকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদীয় গণতন্ত্রের সুরক্ষা দিতে গিয়ে অধিবেশন চলাকালে সরকারি ও বিরোধী দলের অভূতপূর্ব সংঘর্ষে আহত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাজনৈতিক ইতিহাসে এই মর্মান্তিক ও ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। এমন এক মহৎ ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে ড. শায়ের গফুর পারিবারিক সূত্রে লাভ করেছেন ন্যায়বোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সুদৃঢ় নৈতিক চরিত্র।

পারিবারিক শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ঘটে ড. শায়ের গফুরের শিক্ষাজীবনে। শৈশব থেকেই অত্যন্ত মেধাবী এই স্থপতি ১৯৮৯ সালে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট থেকে স্থাপত্য বিষয়ে ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার (ই.অৎপয) ডিগ্রি অর্জন করেন। বুয়েটের কঠোর ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা তঁাকে স্থাপত্য শৈলীর প্রথাগত ও আধুনিক ধারণাগুলোর ওপর সুদৃঢ় দখল এনে দেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে বিশ্বমানের গবেষণা ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তঁাকে থমকে দঁাড়াতে দেয়নি। উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা ‘অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি’ (ঙীভড়ৎফ ইৎড়ড়শবং টহরাবৎংরঃু) থেকে তিনি পিএইচডি (চযউ) ডিগ্রি অর্জন করেন।

যুক্তরাজ্যে তঁার গবেষণাকালীন অভিজ্ঞতা তঁাকে আধুনিক নগরায়ন, উন্নত বিশ্বের নগর পরিকল্পনা এবং গ্লোবাল সাউথের (এষড়নধষ ঝড়ঁঃয) উন্নয়নশীল দেশগুলোর আবাসন সংকট সম্পর্কে এক বিস্তৃত ও বিশ্বমানের দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এই বৈশ্বিক শিক্ষা তঁাকে কেবল একজন দক্ষ স্থপতি হিসেবে গড়ে তোলেনি বরং তাকে রূপান্তর করেছে এক দূরদর্শী নগর পরিকল্পনাবিদ ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষকে।

যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ড. শায়ের গফুর বেছে নিয়েছিলেন নিজ দেশে ফিরে এসে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে কাজ করার পথ। ১৯৯০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে প্রভাষক হিসেবে তঁার শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন।

তঁার নিবেদিতপ্রাণ পাঠদান পদ্ধতি, নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটানোর সামথর্য এবং শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক প্রদেয় সহায়তার কারণে তিনি অতি দ্রুতই বুয়েটের শিক্ষার্থীদের প্রিয় শিক্ষকে পরিণত হন। কর্মদক্ষতা, বিশ্বমানের গবেষণা ও একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮ সালে তিনি বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি স্থাপত্য বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় কোভিড-১৯ মহামারীর কঠিন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তিনি বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রমকে নিরবচ্ছিন্ন রাখা, অনলাইন ও হাইব্রিড শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উদ্যোগ নেন।

পরবর্তীতে তিনি বুয়েটের স্থাপত্য ও নগর অঞ্চল পরিকল্পনা অনুষদের ডিন (উবধহ) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি এই পদে আসীন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন, গবেষণার অবকাঠামোগত প্রসারণ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর সাথে সেতু বন্ধন তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের শিক্ষকতা জীবনে তিনি হাজার হাজার স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও গবেষক তৈরি করেছেন, যারা আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে নেতৃত্বদানকারী পদে থেকে সুনাম কুড়াচ্ছেন।

অধ্যাপক ড. শায়ের গফুর কেবল একজন অ্যাকাডেমিক নন তিনি বিশ্বমানের গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একজন শীর্ষ প্রতিনিধি। তঁার গবেষণার মূল ক্ষেত্রসমূহ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সংকট ও সম্ভাবনার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। তঁার গবেষণার প্রধান দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে : জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কীভাবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করা যায়। পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নগর স্থানগুলোর নান্দনিক ও কার্যকর বিন্যাস। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দ্রুত বিকাশমান ও সংকটাক্রান্ত শহরগুলোর নগরায়নের ধরণ ও তার টেকসই সমাধান।

জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন এবং আবাসন সংকট দূরীকরণে তঁার গবেষণা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত একাডেমিক জার্নালগুলোতে তঁার বহু গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

তঁার জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন আসে ২০০০ সালে। আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত ও মর্যাদাপূর্ণ নগর গবেষণা সাময়িকী ঐধনরঃধঃ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ-এ প্রকাশিত একটি অসাধারণ গবেষণাপত্রের জন্য তিনি সম্মানজনক ‘অটো কয়েনিগসবার্গার অ্যাওয়ার্ড’ (ঙঃঃড় কড়বহরমংনবৎমবৎ অধিৎফ) লাভ করেন। এই পুরস্কার অর্জন বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নগর গবেষণা ও বুয়েটের সুনামকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ ডীন বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষকদের সামাজিক ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত হতে কম দেখা যায়। কিন্তু ড. শায়ের গফুর এখানে এক ব্যতিক্রমী উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও একাডেমিক ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ভুলে যাননি জন্মমাটির ঋণ এবং বাবার গড়ে তোলা স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটির কথা।

সম্প্রতি তিনি চঁাদপুরের স্বনামধন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চঁাদপুর ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। উল্লেখ্য, এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তঁার মরহুম পিতা ডা. এম. এ. গফুর এবং এর জমিদাতার ভূমিকা পালন করেছিলেন তঁার মা মাহমুদা খাতুন।

পিতার স্মৃতিবিজড়িত ও মায়ের অবদানপুষ্ট এই প্রতিষ্ঠানে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ কেবল একটি পদ পদবী গ্রহণ নয় এটি মূলত পারিবারিক ঐতিহ্য, মানবিক মূল্যবোধ এবং জন্মমাটির প্রতি এক গভীর প্রীতির নিদর্শন। তঁার মতো একজন উচ্চশিক্ষিত, দূরদর্শী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব চঁাদপুর ডায়াবেটিক সমিতির হাল ধরায় চঁাদপুরবাসী এখন এক আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। এটি প্রমাণ করে যে, উচ্চ শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক পদমর্যাদা মানুষের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে কমায় না বরং আরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলে।

আজকের বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। একদিকের দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও নগরায়ন, অন্যদিকে অপরিকল্পিত আবাসন, যানজট, জলাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি—সব মিলিয়ে আমাদের শহরগুলো এক চরম চাপের মুখে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর চঁাদপুর পর্যন্ত—সবত্রই পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন আজ সময়ের দাবি।

এই বাস্তবতায় অধ্যাপক ড. শায়ের গফুরের চিন্তা, গবেষণা ও দিকনির্দেশনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সবসময় জোর দিয়ে আসছেন তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়, বরং প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে আবাসন ও নগর অবকাঠামো নির্মাণ করা। নগরায়নের সুফল যেন কেবল ধনী শ্রেণিই না পায় তা যেনো সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ আবাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে নদীভাঙন, বন্যা ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম স্থাপত্য শৈলী গ্রহণ করা।

তঁার এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশের নীতিনির্ধারক, নগর পরিকল্পনাবিদ ও তরুণ স্থপতিদের জন্য এক কার্যকর রোডম্যাপ নির্দেশ করে।

চঁাদপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নদী বিধৌত এই পলিমাটি যুগে যুগে বহু প্রথিতযশা সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদের জন্ম দিয়েছে। অধ্যাপক ড. শায়ের গফুর সেই গৌরবময় ধারারই এক আধুনিক রূপকার।

তঁার অর্জিত সাফল্য প্রমাণ করে যে, জেলা শহর থেকে উঠে এসেও সততা, একনিষ্ঠতা ও মেধার জোরে বৈশ্বিক একাডেমিক অঙ্গনে সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করা সম্ভব। তিনি চঁাদপুরবাসীর জন্য যেমন এক অনন্য গর্বের প্রতীক, তেমনি সমগ্র বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও স্থাপত্য অঙ্গনের জন্য এক অকৃত্রিম সম্পদ।

নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী, বিশেষ করে স্থাপত্য, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সামাজিক গবেষণায় নিয়োজিত তরুণদের জন্য অধ্যাপক ড. শায়ের গফুরের জীবন একটি আদর্শ পাঠ্যপুস্তক। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি নৈতিকতা ধরে রাখতে হয়; কীভাবে বিশ্ব দরবারে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আবার শেকড়ের মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়।

অধ্যাপক ড. শায়ের গফুর কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতীক। শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি বুয়েটকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানিত করেছেন, গবেষক হিসেবে বিশ্বমানের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং সমাজসেবক হিসেবে পিতা মাতার স্মৃতি ও ত্যাগকে ধারণ করে জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছেন।

একটি আধুনিক, নিরাপদ, সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখি, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ড. শায়ের গফুরের মতো জ্ঞানী, সৎ, কর্মঠ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের নেতৃত্ব ও পরামর্শ অত্যন্ত জরুরি। চঁাদপুর তথা বাংলাদেশের এই কৃতি সন্তানের জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং জনকল্যাণমুখী কর্মধারা আগামী দিনে হাজারও তরুণকে অনুপ্রাণিত করবে এবং একটি টেকসই বাংলাদেশ গড়ার পথকে আরও মসৃণ করবে—এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

লেখক পরিচিতি : লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়