রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৩

মাটি কাটার বিরুদ্ধে আদালতের ঐতিহাসিক স্বপ্রণোদিত মামলা

অনলাইন ডেস্ক
মাটি কাটার বিরুদ্ধে আদালতের ঐতিহাসিক স্বপ্রণোদিত মামলা

ইটভাটাসহ নিচু স্থান ভরাট ও নানা উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের জন্যে মাটির তীব্র প্রয়োজনীয়তা মেটাতে চলছে মাটি কাটার মহোৎসব। এ বিষয়টি বিশেষ করে কৃষি জমির উর্বর উপরাংশ (টপ সয়েল) কাটা যে দেশের প্রচলিত আইনে সম্পূর্ণ অবৈধ, সেটা নিয়ে যেনো কারো অবকাশ নেই। সেজন্যে এ মাটি কাটা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদেরও কমতি নেই। চাঁদপুর জেলার সব উপজেলায় ব্যাপকভাবে মাটি কাটা হয়, এমনটি কিন্তু নয়। তবে ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপকভাবে মাটি কাটা হয়। যে কারণে চাঁদপুর কণ্ঠে শীর্ষ সংবাদ হয়েছে ‘ ফরিদগঞ্জে মাটি কাটার মহোৎসব’। এমন সংবাদে উপজেলা প্রশাসন নড়েচড়ে বসে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা পর্যাপ্ত নয়। ফরিদগঞ্জে মাটি কাটা ও কেনায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিছু অনুমোদনহীন ব্রিক ফিল্ড, যেগুলো সকল মহলকে ম্যানেজ করতে করতে তাদের হাত অনেক লম্বা করে ফেলেছে। তারা সড়কের পাশের মাটি কেটে নিয়ে ইট বানানোর সাহস প্রদর্শন করে চলছে। যে ঘটনায় দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠসহ সহযোগী দৈনিক চাঁদপুর দর্পণ ও অন্যান্য পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ ব্যাপারে চাঁদপুর কণ্ঠের সংবাদে লিখা হয়েছে যে, চাঁদপুর সেচ প্রকল্প (সিআইপি) বাঁধ সড়কের মাটি ইটভাটার জন্যে কেটে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। সিআইপি বাঁধের ফরিদগঞ্জ উপজেলা সুবিদপুর পূর্ব ইউনিয়ন কামতা ও গল্লাক সড়কের মধ্যবর্তী সুবিদপুর এলাকায় স্থানীয় কবির পাটোয়ারী ও জাহাঙ্গীর পাটোয়ারীর মালিকানাধীন নাফিস ব্রিকফিল্ড এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। ইতোমধ্যেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন সরেজমিন পরিদর্শন করে এর সত্যতাও পেয়েছে। জানা গেছে, নাফিস ব্রিকফিল্ডের লোকজন ইটভাটার পাশ দিয়ে যাওয়া সিআইপি বাঁধ সড়কের স্লোপ কেটে ইটভাটায় নিয়ে যাাচ্ছে এ ধরনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। স্থানীয় যুবক আরিফ হোসেন শুক্কুর জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ সড়কটি মানুষদের রক্ষাকবচ হয়ে রয়েছে। কিন্তু রোববার (৪ জানুয়ারি ২০২৬) সকালে আমি বাজারে যাওয়ার পথে দেখি সরকারি রাস্তাটির সাইড কেটে বিশাল গর্ত করে ফেলেছে নাফিস ব্রিকফিল্ড মালিকরা। পরে আমি প্রতিবাদ করে ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করি । ইটভাটাটি কাগজ পত্র ও অনুমতিবিহীন দীর্ঘ বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। গত ২০২৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি না থাকায় চাঁদপুর পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথবাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করে ইটভাটাটি বন্ধ করে দেয়। পরে তারা ইটভাটাটি চালু করে। এই বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়াকে জানালে তিনি আমি সংবাদ পেয়ে খোঁজ নিয়ে সত্যতা জেনে চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করতে বলেছি। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডে কর্মরত মো. আলমগীর হোসেন জানান, ‘আমাদের ঊর্ধ্বতন স্যারের নির্দেশে আমি সরজমিনে গিয়ে দেখি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন বেড়িবাঁধ সড়কটির স্লোপ কেটে মাটি সরিয়ে ফেলেছে নাফিস ব্রিকফিল্ড। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী মাটি ভরাট করে দিবেন বলে জানান। আমি সরজমিনে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে রির্পোট দিবো। অফিস পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করবে।

এমন সংবাদ আদালতের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যে কারণে আদালত স্বপ্রণোদিত মামলা করেছে। মামলা সংক্রান্ত সংবাদ গতকাল চাঁদপুর কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে। এ সংবাদে লিখা হয়েছে, ফরিদগঞ্জ উপজেলায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন সরকারি ও জনস্বার্থসম্পৃক্ত ওয়াপদা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় সড়কের মাটি অবৈধভাবে কাটার ঘটনায় বিবিধ মামলা গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ফরিদগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল আমলী আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট শাহাদাতুল হাসান আল মুরাদ বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি ২০২৬) এই আদেশ দেন। আদালতের আদেশে বলা হয়, চাঁদপুর দর্পণ নামের একটি দৈনিক পত্রিকায় গত ০৭/০১/২৬ তারিখে প্রকাশিত সংবাদ ও সংযুক্ত আলোকচিত্র পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, ফরিদগঞ্জ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে মাটি কাটা হচ্ছে, যা জনসাধারণের চলাচল ও সরকারি সম্পদের জন্যে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। আদালত উল্লেখ করেন, সংবাদে বর্ণিত ঘটনাগুলো ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ১৯০(১)(সি) ধারার ক্ষমতাবলে আদালতের নজরে আসায় ও আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার প্রাথমিক উপাদান বিদ্যমান থাকায় এটি বিবিধ মামলা হিসেবে রুজু করা হয়। আদেশে আরও বলা হয়, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০১০ এবং মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বার্থযুক্ত ভূমিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাটি কাটা ও কাঠামো নির্মাণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এ প্রেক্ষিতে ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ঘটনার প্রকৃত অবস্থা উদ্ঘাটন, দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং গৃহীত আইনগত ব্যবস্থা সম্পর্কে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, চাঁদপুর কর্তৃপক্ষকে সংশ্লিষ্ট সরকারি সম্পত্তি ও জনস্বার্থসম্পৃক্ত সড়ক ও অবকাঠামো রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ সম্পর্কে আদালতকে অবহিত করার নির্দেশ দেয়া হয়।

আমরা ফরিদগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল আমলী আদালতের সিআইপি বেড়িবাঁধ সড়কে মাটি কাটার বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত মামলাকে চাঁদপুরে স্মরণকালে ঐতিহাসিক মামলা হিসেবে আখ্যায়িত করতে চাই। এ মামলার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক সড়কে মাটি কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা তথা বিলম্বের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। এ বিলম্ব যে দেশের অন্যতম বৃহত্তম চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের জন্যে ও বেড়িবাঁধ সড়কের জন্যে কতোটা ক্ষতিকর হতে পারে সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যতোটা অনুধাবন করেছে, তারচে’ আদালতের পর্যবেক্ষণে সেটা বেশি ধরা পড়েছে। সেজন্যে আদালত স্বপ্রণোদিত মামলা করেছে, যেটা খুবই ইতিবাচক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা। এ ঘটনায় যদি পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্য সকলে মাটি কাটার বিরুদ্ধে পূর্বের চেয়ে বেশি তৎপর না হয়, সাঁড়াশি অভিযান না চালায়, তাহলে সেটা হবে চরম দুর্ভাগ্যজনক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়