বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:২৭

মৃত্যুহীন প্রাণ বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান

হাসান আলী
মৃত্যুহীন প্রাণ বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান

বীর মুক্তিযোদ্ধা মতি ভাই—পূর্ণ নাম মতিউর রহমান—আজ ৬ জানুয়ারি ২০২৫ (মঙ্গলবার) আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তবে সত্যিকার অর্থে তিনি চলে যাননি; তিনি রয়ে গেলেন মানুষের স্মৃতিতে, সংগ্রামের ইতিহাসে, আর চরভৈরবীর মাটিতে মিশে থাকা অগণিত ভালোবাসায়। তাঁর জীবন ছিলো এক নিরন্তর লড়াইয়ের নাম—অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে, আর মানুষের অধিকারের পক্ষে।

মতি ভাই ছিলেন চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী হাইস্কুলের একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যবইয়ের বাইরেও তিনি ছাত্রদের শিখিয়েছেন ন্যায়, সত্য আর সাহসের পাঠ। তাঁর ফার্মেসি ছিলো শুধু ওষুধের দোকান নয়, ছিলো রাজনৈতিক সচেতনতার এক উন্মুক্ত পাঠশালা। চরভৈরবী বাজারে সেই ছোট্ট জায়গাটিতে বসে দেশ, সমাজ আর মানুষের অধিকার নিয়ে গভীর আলোচনা হতো—যেখানে তিনি যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে আলোকিত করতেন।

১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয়, আর ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮—এই সময়টুকুতে গড়ে উঠে গভীর ঘনিষ্ঠতা। রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘ আড্ডা, মানুষের কথা, নদীর কথা, চরবাসীর দুঃখকথা—সবই ছিলো তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে। তিনি কেবল কথা বলতেন না, মাঠে নামতেন। নদীভাঙ্গন প্রতিরোধ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—এই দেশের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়াতে হলে সাহসী হতে হয়। জলমহাল ইজারাদারদের বিরুদ্ধে জেলেদের পক্ষে দাঁড়িয়ে, ভূমিহীন কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের ন্যায্য অধিকারের সংগ্রামে যুক্ত হয়ে তিনি ছিলেন এক অকুতোভয় সৈনিক।

মতি ভাইয়ের রাজনৈতিক জীবন ছিলো ত্যাগের, নৈতিকতার আর অকপটতার দৃষ্টান্ত। আমার রাজনৈতিক পথচলায় তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা ছিলো এক অমূল্য শক্তি। তিনি কখনো সুবিধার পথে হাঁটেননি; বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে অনেক ঝড় সহ্য করেছেন। তাঁর স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসা আমাকে এবং অগণিত মানুষকে সাহস জুগিয়েছে।

আজ তাঁর প্রয়াণে বুক ভরে ওঠে শূন্যতায়। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এমন এক উত্তরাধিকার, যা কখনো মুছে যাবে না—মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই লড়েন নি; মতি ভাই আজীবন লড়েছেন সমাজের প্রতিটি বৈষম্যের বিরুদ্ধে। সেই কারণেই তিনি মৃত্যুহীন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান আমাদের শিখিয়ে গেছেন—মানুষের পাশে দাঁড়াতে হলে হৃদয় বড়ো হতে হয়, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে থাকতে হয় সাহস। তাঁর জীবন ছিলো এক আলোকবর্তিকা, যা আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে। গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আমরা তাঁকে স্মরণ করি। তিনি নেই—তবু তিনি আছেন, আমাদের চিন্তায়, আমাদের সংগ্রামে, আমাদের হৃদয়ে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়