রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৪১

সেকালের ঈদ, একালের বাস্তবতা সংকটের সময়ে মুসলমানের করণীয়

ড. আজিজুল আম্বিয়া
সেকালের ঈদ, একালের বাস্তবতা সংকটের সময়ে মুসলমানের করণীয়

ঈদ মুসলমানের জীবনে আনন্দ, কৃতজ্ঞতা, আত্মশুদ্ধি এবং ভ্রাতৃত্বের এক মহিমান্বিত উপলক্ষ। এক মাস সিয়াম সাধনার পর যে দিনটি আসে, তা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি মানবিকতা, সামাজিক সংহতি এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। ইসলামের দৃষ্টিতে ঈদের প্রকৃত অর্থ হলো আত্মসংযমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহর অনুগ্রহের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং সেই আনন্দ সমাজের সব মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।

ইসলামের ইতিহাসে ঈদের যে চিত্র আমরা দেখি, তা ছিলো অত্যন্ত সরল কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে ঈদ মানে ছিলো সমবেত নামাজ, আল্লাহর প্রশংসা, দরিদ্রদের সাহায্য এবং সমাজে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করা। সেখানে বাহুল্য ছিলো না, কিন্তু আন্তরিকতা ছিলো অপরিসীম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সমাজ বদলেছে, অর্থনীতি বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে। সেই সঙ্গে ঈদের রূপও অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা অনেক মানুষের কাছে ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিচ্ছে।

সেকালের ঈদ : সরল আনন্দের উৎসব

বাংলার গ্রামীণ সমাজে একসময় ঈদ ছিলো এক অনন্য সামাজিক উৎসব। ঈদের আগের দিনগুলোতে বাজারে মানুষের ভিড় থাকতো, নতুন কাপড় কেনার আনন্দ ছিলো শিশুদের চোখেমুখে। বাড়িতে সেমাই, পায়েস কিংবা নানা রকম খাবার রান্না হতো।

ঈদের সকালে গ্রামের খোলা মাঠে নামাজ আদায়ের দৃশ্য ছিলো অত্যন্ত প্রাণবন্ত। নামাজ শেষে কোলাকুলি, বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাওয়া, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এসবই ছিলো ঈদের আনন্দের অংশ।

সেই সময়ে মানুষের আয় কম হলেও সামাজিক সম্পর্ক ছিলো শক্ত। ধনী-গরিবের মধ্যে ব্যবধান থাকলেও ঈদের সময় সবাই কোনো না কোনোভাবে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করতো।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী ঈদের আগে ফিতরা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ঠিক এই কারণেইÑযাতে দরিদ্র মানুষও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়।

একালের ঈদ : অর্থনৈতিক সংকটের ছায়া

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অনেক মানুষের জন্যে ঈদের প্রস্তুতি একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।

গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের সংকটের আলোচনা সামনে এসেছে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, অর্থনীতির এই চাপ সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা ছাঁটাইয়ের কারণে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে পরিচিত পোশাক শিল্পও এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের কারণে এই শিল্প খাত চাপের মধ্যে রয়েছে।

পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের অনেকেই অভিযোগ করছেন, তাদের আয় আগের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবারের জন্যে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কিনতেই হিমশিম খাচ্ছেন, তাদের কাছে ঈদের নতুন পোশাক বা বিশেষ খাবারের আয়োজন অনেক সময় স্বপ্নের মতো মনে হয়।

ঈদ বোনাসের অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ঈদের আগে কর্মচারী ও শ্রমিকদের ঈদ বোনাস দেওয়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই বোনাস অনেক পরিবারের জন্যে ঈদের খরচ সামলানোর বড়ো সহায়তা। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান সেই বোনাস দিতে পারবে কি নাÑতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক কর্মজীবী মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এবার ঈদ কিভাবে কাটবে?

সামাজিক অস্থিরতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতাও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশকে প্রভাবিত করছে বলে অভিযোগ উঠছে। কোথাও কোথাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা বা লুটপাটের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

এই ধরনের পরিস্থিতি বিনিয়োগের পরিবেশকে দুর্বল করে দেয়। বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যায়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব

বিশ্ব রাজনীতির ঘটনাগুলোও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকা বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং শেষ পর্যন্ত বাজারের পণ্যের দামে।বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যে এটি একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ।

ইসলামের দৃষ্টিতে ঈদের প্রকৃত অর্থ

এই বাস্তবতার মধ্যে ইসলামের শিক্ষা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। ইসলাম কখনোই ঈদকে আড়ম্বরের উৎসব হিসেবে দেখেনি। বরং ঈদ হলো কৃতজ্ঞতার দিন, সংযমের দিন এবং মানবিকতার দিন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, প্রকৃত ধনী সেই ব্যক্তি নয় যার সম্পদ বেশি; বরং সেই ব্যক্তি যে অন্তরে তৃপ্ত। এই শিক্ষা আজকের সংকটের সময়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মুসলমানের করণীয়

এই পরিস্থিতিতে মুসলমানদের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, সমাজের সচ্ছল মানুষদের উচিত দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যাকাত, সদকা এবং ফিতরার মাধ্যমে সমাজে ভারসাম্য সৃষ্টি করা ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য। দ্বিতীয়ত, ঈদের আনন্দকে সরলতার মধ্যে খুঁজে নেওয়া দরকার। বড়ো আয়োজন না থাকলেও ঈদের আনন্দ থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা বাড়ানো জরুরি। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এবং কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা প্রয়োজন। চতুর্থত, অর্থনৈতিক সংকটের সময় অপচয় থেকে বিরত থাকা উচিত। ইসলাম সবসময় মধ্যপন্থা ও সংযমের শিক্ষা দেয়।

শেষ কথা

ঈদ শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি আত্মসমালোচনা ও মানবিকতারও সময়। সমাজে যখন বৈষম্য বাড়ে, অর্থনৈতিক চাপ বেড়ে যায়, তখন ঈদের প্রকৃত শিক্ষা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সেকালের ঈদ ছিল সরল, কিন্তু মানবিকতার শক্ত বন্ধনে ভরা। আজকের ঈদে সেই চেতনা ফিরে আসতে পারলে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ঈদের প্রকৃত আনন্দ ফিরে আসতে পারে। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে ঈদের সৌন্দর্য বাহ্যিক আড়ম্বরের মধ্যে নয়, বরং মানুষের হৃদয়েÑযেখানে রয়েছে কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য। লেখক : ইংল্যান্ড প্রবাসী কলাম লেখক ও গবেষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়