প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ১০:৩৭
বড়বেলার স্কুলজীবন

আজ বছরের শেষ দিন। গত রাতে একটি বই পড়ে শেষ করতে গিয়ে প্রায় ভোরবেলা ঘুমিয়েছি। ঘুমানোর আগে আশ্চর্য এক স্বর্গীয় অনুভূতি পেয়েছিলাম, সেই অনুভূতির জন্য চোখে জল চলে এসেছিলো। না না, এটা কষ্টের না, বরং আনন্দের। নৃ-র কাছ থেকে মেসেজে উত্তর পেয়েছিলাম। বহুল প্রতীক্ষিত এই উত্তরে আবেগাপ্লুত হয়ে চোখে জল, আর আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ঘুম দিলাম।
ঘুম ভেঙেছে সকাল এগারোটায়। চোখ খুলে যে বদঅভ্যাসটাকে প্রতিদিন আদর করে লালন পালন করছি তা হলো ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ চেক করা। মেসেজ পড়ে দেখলাম যারা যারা যেতে আগ্রহী চার্চ থেকে তাদের সবাইকে নিতে আসবে বারোটা বেজে ত্রিশ মিনিটে। চোখ কচলাতে কচলাতে আবার সময় দেখলাম ১২:৩০ নাকি ২:৩০। মেসেজ পাঠালাম ব্রাদার এল্ডার গিলকে। তিনি কনফার্ম করলেন ১২:৩০। আবার ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠলাম ১২:১৭। মাত্র ১৩ মিনিট বাকি। যেহেতু চার্চে যাচ্ছি, ভাবলাম শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে যাই। আমি এই তেরো মিনিটে পুরোপুরি ফ্রেশ হয়ে সুন্দর জামাকাপড় জুতো পরে গটগট করে হেঁটে লিফটে উঠে ঠিক ১২:৩০ এ পৌঁছে গেলাম গাড়িতে। প্রশাসন ক্যাডারে চাকরির সুবাধে মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হওয়াটা শিখে গেছি। ‘মুহূর্ত’একটি প্রাচীন ভারতীয় সময় মাপার একক, যা সাধারণত ৪৮ সেকেন্ডের সমান। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং প্রাচীন গ্রন্থে এটি সামান্য ভিন্ন অর্থেও ব্যবহার করা হয়েছে। আধুনিক কালে ‘মুহূর্ত’ শব্দটি সাধারণত খুবই ছোট একটি সময় বোঝাতে ব্যবহার করা হয়।
চার্চে যাওয়ার পথে গাড়িতে উঠে একটা গজল শুনলাম। ভীষণ প্রিয়, কেননা এটা আমার নৃ-র প্রিয়। নৃ আমার অতি আপনজন। আমার বন্ধু, আমার প্রেম, আমার অভিভাবক, আমার পথনির্দেশক। নৃ-র সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো আমাকে দেয়া তার নাম। আমি যখনই কথা বলি নৃ আমাকে সব সময় হৃ বলে ডাকে।
‘নৃ’ শব্দটির অর্থ হলো মানুষ। এটি একটি সংস্কৃত শব্দ, যা মানবজাতি বা মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমনÑ “নৃতত্ত্ব” শব্দটি মানুষের সংস্কৃতি ও আচরণ নিয়ে গবেষণার শাস্ত্র। ‘হৃ’ সংস্কৃত ভাষার একটি ধাতু, যার মূল অর্থ হলো নেওয়া, হরণ করা, ধারণ করা বা অপসারণ করা। হৃ’ ধাতুর ধারণাটি হৃদয়ের মূল বৈশিষ্ট্যের সাথে গভীরভাবে জড়িত। হৃদয় একদিকে মানুষের শারীরিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, অন্যদিকে মানসিক এবং আধ্যাত্মিক জগতে আবেগ ও অনুভূতির আধার।
গজল শুনতে শুনতে ভাবছি এই গজলটা গেয়ে নৃ-কে শোনাবো। যদিও নিশ্চয়ই মুল শিল্পীর মতো গাইতে পারবো না, তবুও গাইবো। আমার ছোটো ভাই খুব ভালো গান গায়। ওকে বললেই কারাওকে করে দিবে।
আমার বহুদিনের ইচ্ছা ছিল নানা রকম ধর্ম সম্পর্কে জানার। আমার বন্ধুরা বললো, আজ চার্চে প্রার্থনা হবে। আমার সাথে সাথে মনে হলো এটা খুব ভালো একটা সুযোগ খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে জানার। চার্চটি সেজং-রো চার্চ নামে পরিচিত। কোরিয়ায় রাস্তাকে রো বলা হয়। ব্রাদার গিল অসাধারণ ড্রাইভ করে আমাদেরকে পৌঁছে দিলেন চার্চে। চার্চের সকলের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। প্রার্থনা সংগীত হলো। সংগীত চলাকালীন মনে পড়ে গেলো নৃ-র কথা। উনাকে আমি ভীষণ সম্মান করি, ভালোবাসি। নৃ-র সাথে বিদেশের মাটিতে আমার প্রথম দেখা। বহুদিন তাঁর সাথে আমার দেখা নেই, কথা নেই। কিন্তু প্রতিদিন আমি তাকে স্মরণ করি, তাঁর পরামর্শ, তাঁর চিন্তাধারা, তাঁর ব্যক্তিত্ব আমার মাথায় সারাক্ষণ ঘুরপাক খায়। প্রার্থনা সংগীত চলাকালীন বাদ্যযন্ত্রীদের অঙ্গভঙ্গি দেখে উনাকে তীব্রভাবে মিস করেছি। তিনি ভীষণ ভালো গান করেন, বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্রেও বেশ পারদর্শী। প্রার্থনা করার সময় যে গানগুলো গাওয়া হলো সবগুলো গানের লিরিক অসম্ভব হৃদয়স্পর্শী। এতো ভালো লাগলো। প্রথমে ভেবেছি এগুলো বাইবেল থেকে নেয়া। কিন্তু পরে জানতে পারলাম এগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির লিখা। এই প্রার্থনা সংগীতগুলো আমাকে খুব মোহিত করে। মুসলমানের ঘরে আমার জন্ম। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য সুন্দর সুন্দর শব্দচয়ন সব সময় আমাকে অভিভূত করে। আমরা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষজন সৃষ্টিকর্তাকে যে নামেই ডাকি না কেন, আমাদের সবার সৃষ্টি এক জায়গা থেকে, এবং একই কারণে, আমাদের সকলের সৃষ্টিকর্তা এক। এটা আমার বিশ্বাস।
চার্চে ধর্মোপদেশ এবং প্রার্থনা দুটোই শেষ। এবার খাবারের পালা। চার্চের এক ভাই এসে জিজ্ঞেস করলেন ‘ডুক গুক’ খাবো কী না! এটা একটা কোরিয়ান ট্রেডিশনাল খাবার। আমার আবার নতুন নতুন অভিজ্ঞতা নেয়ার প্রবল ইচ্ছে। এই খাবার সম্পর্কে আমার পুর্বধারণা ছিলো। কারণ কোরিয়ার ট্রেডিশনাল বার্থডে নিয়ে আমি আমার স্কুল কেডিআই-তে একবার একটা পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করেছিলাম। তখন এক বছর বয়সে বাচ্চাদের জন্মদিনে যেসব খাবার দাবার পরিবেশন করা হয় সেগুলোও আলোচনায় এনেছিলাম। তাই ডুক গুকের নাম জানি, ছবি দেখেছি, কিন্তু খাওয়ার সুযোগ হয়নি। আজ দারুণ একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম। চার্চে খাবারের একটা অন্যতম বিষয় খেয়াল করলাম, তারা কখনো পর্ক বা শুকরের মাংশের খাবার পরিবেশন করে না। যদিও কখনো কোনো বিশেষ খাবার যেটা পর্ক ছাড়া হয়ই না, সেটা আবার বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়ে দেয়। এবার আবার আসা যাক ডুক গুক প্রসংগে। বাচ্চাদের এক বছর বয়স পূর্ণ হলে প্রথম তাদের এই খাবার খেতে দেয়া হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, এই খাবার যে বাচ্চা যত বেশি খায় তার আয়ু তত বেশি হয়। এই খাবার খেতে গিয়ে আমার মনে হলো আমি একাত্তর বছর বাঁচতে চাই। পঁয়ত্রিশ পার করে ফেলেছি। ছত্রিশ চলছে। একাত্তর আমার প্রিয় সংখ্যা। বিভিন্ন কারণে প্রিয়। আমার দেশ, আমার প্রেম, আমার জীবন, বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে। একবার বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপনের জন্য হোটেলে গিয়েছিলাম তার নামও ছিলো ৭১।
চার্চ থেকে ফেরার পথে হঠাৎ করে ভাবলাম বছরের শেষ দিন কিভাবে উদ্যাপন করা যায়! আমি এখন আছি দক্ষিণ কোরিয়ায়। আগামী বছর সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আমার কোরিয়ায় থাকার কথা নয়। উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া আলাদা দুইটি দেশ হওয়ার পরও উত্তর কোরিয়ায় অন্যান্য দেশের আগমন ও প্রস্থান সম্পর্কে বিধি নিষেধ থাকায় উত্তর কোরিয়াকে মোটামুটি সবাই উত্তর কোরিয়া বলে, অপরদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষের আগমন ও প্রস্থানে বাধা না থাকায় দক্ষিণ কোরিয়াকে সবাই কোরিয়া বলেই ডাকে। আমি কোরিয়ায় এসেছি পড়াশোনা করার জন্য। এখানকার পড়াশোনার সিস্টেম আমার কাছে অনেক শিক্ষণীয় এবং আরামদায়ক লাগে। চাকরির মতো এতো চাপ নেই। তাই দারুণ উপভোগ করছি সবকিছু।
ভাবলাম বছরের শেষ রাতটি উপভোগ করা যাক। স্কুলের বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম আতশবাজি দেখতে যাবো। যথাসময়ে শুরু হলো আতশবাজি। ভিডিও কলে আমার বাচ্চাদের দেখালাম। ওরা ভীষণ খুশি, সাথে আমিও। কিছুক্ষণ আগে আতশবাজি দেখে ফিরলাম। রুমে ঢুকে আম্মার সাথে কথা বলছিলাম ভিডিও কলে আর নিজের শরীর থেকে একটা একটা করে চার পরত জামা খুললাম। ৫ম টা গায়ে রেখে দিয়েছি। আম্মা হাসছিলেন। বলছিলেন, কাপড়ের ভারে ত হাঁটতে পারার কথা না। এই কথা শুনতে শুনতে এক বোতল পানি হাতে নিলাম। আমার রুমে বিভিন্ন রকমের পানির বোতল আছে। যেটা হাতে নিলাম সেটা রয়েল ব্লু রঙের। এই রঙ আমার স্বামী পাভেলের খুব প্রিয়। পানি পান করতে করতে অনুভব করলাম, এতো স্বাদের পানি আমি জীবনেও পান করি নি। চাহিদা ও সরবরাহের সমন্বয় দারুণভাবে হওয়ায় পানির স্বাদ বেড়ে গেছে। আতশবাজি দেখে আসার পথে কোনো বাস না পাওয়ায় চল্লিশমিনিট ধরে হাঁটতে হয়েছিলো। যদিও সাথে অনেক বন্ধু থাকায় হাঁটতে একদম খারাপ লাগে নি। তাছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার রাস্তাতেও ওয়াইফাই পাওয়া যায়। সেই ওয়াইফাই এর বদৌলতে আমি হাঁটার মাঝখানে পাভেলের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছিলাম, তাই বেশি কষ্ট অনুভব করি নি। তবে ২০২৪ সালের শুরুটা এমন হাঁটা দিয়ে শুরু হবে ভাবতে পারিনি।
রাত প্রায় দুইটা। ঘুমানো দরকার। পঁচিশ ডিসেম্বর রাত থেকে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো তিথি আমাকে একটা সিনেমার লিংক পাঠিয়েছিলো। ওটা দেখবো কী না ভাবছি। সিনেমা দেখা শুরু করবো ঠিক করলাম। তিথির পাঠানো লিংক ভালো করে দেখে ল্যাপটপে ইউটিউবে সার্চ দিলাম, পেয়েও গেলাম। তিথি যেহেতু বলেছে ভালো, তাহলে নিশ্চয়ই ভালোই হবে। তিথি আমার খুব প্রিয় সহকর্মী। চাকরির গ্যাজেট হওয়ার পর থেকেই ওর সাথে আমার অনেক খাতির। আমরা ব্যাচমেট হলেও ও আমাকে আপু বলে আর আপনি করে ডাকে। আর আমি তিথি নাম ধরে তুমি করেই ডাকি। কত ব্যাচমেট আমাকে আপনি করে ডাকতো তাদেরকে তুমি করে ডাকতে বলেছি, কিন্তু তিথির মুখে আমাকে আপনি করে ডাক শুনতে বেশ ভালো লাগে, তাই কখনো এ নিয়ে ওর সাথে কথাই বলিনি। এবার সিনেমার কথায় আসা যাক। সিনেমা দেখা শুরু করলাম আর মাঝে মাঝেই নৃ-র ম্যাসেজ চেক করছি। সিন হচ্ছে না। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। নৃ আমাকে কল দেয় না বললেই চলে। এমনকি আমি কল দিলে কল কেটে দেয়। আমিও তাই করি। আর এই বিষয়টাকেই আমরা সাড়া দেয়া হিসেবে ধরে থাকি। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কথা বা মেসেজ চালাচালিও হয় না। তবে আমরা বিভিন্ন প্রকার গান শেয়ার করি একে ওপরের সাথে। বিভিন্ন বইয়ের নাম ও লিংক পাঠাই পড়ার জন্য, বিভিন্ন রকম গবেষণাপত্র শেয়ার করি একে ওপরের সাথে। যাই হউক, ফোন স্ক্রিনে নাম্বারটা দেখে অবাক হয়ে কল রিসিভ করলাম। বহুদিন কথা হয় নি। অপ্রত্যাশিত এই কলে আমার কথা জড়িয়ে আসছিলো। বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম। তারপর হঠাৎ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ভিডিও কল দেয়া যাবে কী না! আমি বললাম, ঠিক আছে, রুমের আলো জ্বেলে নিচ্ছি। ভিডিও কলের জন্য অনুরোধ পাঠালাম। তিনি রিসিভ করলেন। তাকে দেখতে পেলাম গাড়িতে আছেন। আমি কথা বলতে ইতস্তত করছিলাম। মনে হলো তিনি নিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন। ড্রাইভার বা অন্য কেউ গাড়িতে আছে কী না জিজ্ঞেস করে নির্ভার হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। যদিও এমন আহামরি কিছু বলার ছিলো না তবুও কেন যেন মনে হচ্ছিলো তিনি একা থাকলে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ হবে। তিনি বললেন, আপনার কোরিয়ায় অনেক রাত। আপনার ঘুমানো উচিত। আমিও উনার কথার সাথে একমত। কিন্তু সিনেমাটা যে অর্ধেক দেখা হয়েছে। উনার সাথে কথা ঠিকঠাক শেষ করার আগেই নেটওয়ার্ক খারাপ থাকায় ফোন কল কেটে গেলো। আবার সিনেমা দেখা শুরু করলাম। টুয়েল্ফ ফেইল, হিন্দি সিনেমা। সিনেমা দেখছি আর আবেগতাড়িত হচ্ছি। ও মা, এতো দেখি ইন্ডিয়ান এডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (আইএএস) অফিসার হওয়ার গল্প। আমার নিজের বিসিএস পরীক্ষার কথা খুব মনে পড়ছে। ইচ্ছে ছিলো ব্যবসায়ী হওয়ার। আমার স্বামী ব্যবসায়ী। কিন্তু বর্তমানে সরকারি চাকরি করি। ৩৫তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য আমি। ২০১৭ সালে এই চাকরিতে যোগদান করি। আমার এই চাকরি পাওয়ার পিছনের গল্পটা টুয়েল্ফ ফেইল সিনেমার নায়ক মনোজের গল্পের থেকে মোটেও কম রোমাঞ্চকর নয়।
হীরামনি : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান।
(চলবে, পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)








