শনিবার, ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৯

সিদ্ধাচার্য-উত্তর মগ্ন সাধক সুকুমার বড়ুয়া

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
সিদ্ধাচার্য-উত্তর মগ্ন সাধক সুকুমার বড়ুয়া

বাংলা সাহিত্যে ছড়ার স্থান উজ্জ্বল এক জ্যোতিষ্কের মতো। নেপাল রাজদরবারে প্রাপ্ত পুঁথি ঘেঁটে এ কথা বলা যায়, বৌদ্ধগান ও দোঁহা হতে ছড়ার সূচনা হয়েছে বাংলা সাহিত্যে। চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয় বা চর্যাপদের চর্যাগুলো মূলত তত্ত্বজ্ঞান বর্ণনাকারী ছড়াবিশেষ। সেই ঐতিহ্যের স্রোত এসে আজও প্রবহমান বাঙালির শোণিত ধারায়। এই ঐতিহ্য স্রোতে অবগাহিত হয়েছেন স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশের কালজয়ী ছড়াকার, শিশু সাহিত্যিক সুকুমার বড়ুয়া।

সুকুমার বড়ুয়ার জন্ম ১৯৩৬ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান থানার মধ্যম বিনাজুরী গ্রামে। ছোটবেলায় তাঁর মামা বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ছড়ার বই ‘হাসিখুশী’ তিনি সম্পূর্ণ মুখস্থ করে ফেলেন। সেই হতে ছড়ার সাথে তাঁর জীবন সাত পাকে বাঁধা পড়ে গেলো। ইদিলপুরে বড়ো বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে তিনি সকলের অনুরোধে ‘হাসিখুশী’ হতে ছড়া শোনাতে শোনাতে ছড়ার ছন্দ ও অন্ত্যমিল বিষয়ে অবহিত হন। ইদিলপুরে ‘মনসার পুঁথিপাঠ’ শুনে তিনি ছড়ার ছন্দ ও তার অন্ত্যমিল বিষয়ে আরও ব্যাপক ধারণা লাভ করেন। মনসার পুঁথিতে ‘তোমার গান তুমি গাইবা উপলক্ষ আমি/অশুদ্ধ হইল মাগো লজ্জা পাইবা তুমি--এ ধরনের ছন্দ শুনে তিনি আরও ঋদ্ধ হন। ১৯৪৬ সালের দিকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন পশ্চিম বিনাজুরি ‘শ্মশান বিহার’ নামক বৌদ্ধ বিহারে অবস্থানের সময় বৌদ্ধ শ্রমণেরা উৎসাহ দিলে তিনি নজরুলের ‘লিচু চোর’ কবিতাটি বারবার অভিনয় করে দেখাতেন। এর পাশাপাশি গ্রাম্য খেলা, হা-ডু-ডু, ধাঁধা বা হেঁয়ালি, রোদ ডাকা, বৃষ্টি থামানো ইত্যাদি চর্চাতেও তিনি ছড়াকে পেয়েছেন ওতপ্রোতভাবে। এভাবেই

পল্লির আলো-বাতাস, আচার-আচরণ হতেই ছড়া ঢুকে গেছে তাঁর মস্তিষ্কের নিউরনে। বিচিত্র বিষয়ে, বিচিত্রভাব নিয়ে তিনি সরস ও তীক্ষ্ণ, স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল ছড়া রচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ হতে শুরু করে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ছড়া, হাতি, বাঘ-ভালুক হতে শুরু করে টাউট-বাটপার সকল বিষয়ে তিনি সাবলীল ও প্রাণবন্ত সাহিত্য রচনা করে চলেছেন। সমকালীন ও সামাজিক বিষয় নিয়ে তিনি তীব্র শ্লেষ মাখিয়ে রচনা করেছেন বহু ছড়া।

বাঙালির অনন্য অর্জন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি ‘মুক্তিসেনা’ ছড়ায় লেখেন, ‘ধন্য সবাই ধন্য/ অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে/মাতৃভূমির জন্য’। তাঁর ছড়ার ভাষা শিশুর পক্ষে অতি কোমল। ফলে মনে হয় এ যেন কোনো শিশুর মন হতে আওড়ানো বুলি। তিনি যখন বলেন, ‘দেশের তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে/শক্ত হাতে ঘায়েল করে/সব হানাদার সৈন্য/ধন্য ওরাই ধন্য’--তখন আমাদেরও গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি-বীরত্বের কথা চিন্তা করলে। কোমলমতি শিশুদের সঠিক ইতিহাস রপ্ত করানোর এ’ এক ঋদ্ধ উপায়।

পিঠাপিঠি ভাইবোন থাকলে ঘরে মারপিট যেমন বাড়ে তেমনি মিল-মিশও বেশি হয়। সুকুমার বড়ুয়ার ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’ গ্রন্থে এ রকম একটি ঘরের ছবি পাই যাতে পিঠাপিঠি দুই বোনের খুনসুঁটি ফুটে উঠে। ‘চন্দনা আর রঞ্জনাতে আচ্ছামতো মিল/ বুকভরে পায় আদর সোহাগ/ পিঠ ভরে খায় কিল’--এই বলে তিনি চন্দনা-রঞ্জনার মধ্য দিয়ে প্রতিটা ঘরের অন্দরের চিত্র তুলে ধরেছেন।

তাঁর আর একটি ছড়া ‘আনিকা ও শারিকা’। এই ছড়াতে তাঁর অন্ত্যমিল ব্যবহারের মুন্সিয়ানা লক্ষণীয়।

তিনি অন্ত্যমিলের খোঁজে ঐতিহ্যের খাবারের সন্ধান কিংবা মাথায় মাথায় ঢুশ্ লাগিয়ে ছেড়েছেন। সবার দৃষ্টি কেড়ে নিয়ে তিনি যেন আঙ্গুল নির্দেশ করে বলেছেন, ‘ওই আমাদের আনিকায়/ মিষ্টি বাখরখানি খায়/ সর্দি হলে বরফ দিয়ে/ গরম গরম পানি খায়।’ এতোটুকু শুনলেই বাখরখানি খেতে যেমন মন চায় তেমনি বরফ দিয়ে গরম পানি খাওয়ার উপমা মুহূর্তেই হাসির উদ্রেক ঘটায়। আবার, ‘তার যে সাথি শারিকায়/ ভাত দিয়ে তরকারি খায়’ শুনলে অন্ত্যমিলের অপূর্ব মিলে মনের মধ্যে সহজ স্বস্তি পাখা মেলে।

শিশু মনের দারুণ আগ্রহ বিবিধ জীব-জন্তুতে। তিনি তাঁর ছড়ার মাধ্যমে যেন সবাইকে নিমিষে ঘুরিয়ে আনেন চিড়িয়াখানা হতে। ‘হাতি’ ছড়াটি চিড়িয়াখানা ঘুরে এসে গল্পবলা কোনো শিশুর মুখে শুনতে পাওয়া যেন। এত্তোটুকুন হাতিটার/ অত্তোবড়ো দাঁত/ শাক খায় না মাছ খায় না/ খায় না গরম ভাত। এটুকুন পর্যন্ত ছড়াটি শুনে মনে মনে উৎসাহ জাগে, কৌতূহল হয়, হাতি তাহলে কী খায়। যারা স্কুলে যায় তাদের কাছে ভালো লাগে না শৃঙ্খলা, তাই যেন দুপুরের টিফিন ছুটির জন্যে সবার প্রতীক্ষা। সুকুমার বড়ুয়া স্কুলের এই জীবন নিয়েও মজা করতে ভোলেননি--’ক-শাখা/খ-শাখা/গ-শাখা/ঘ-শাখা/ দুপুরের ছুটিতে / নুন দিয়ে শশা খা’।

কম্পিউটার নিয়ে সকলের বিস্ময়ের অন্ত নেই। তাতে ডাটা প্রসেস করতে করতে পেরেশান হয়েছেন অনেকেই। তিনি এই ডাটাকে তরকারির ডাটার সাথে মিশিয়ে আমাদের দিচ্ছেন ‘ডাটা সংবাদ’ : ‘পুঁইয়ের ডাটা লাউয়ের ডাটা/ বায়োডাটার ঝোল/ ডাটা প্রসেস করতে হলে কম্পিউটার খোল’। গবেষকের ডাটার যে তারতম্য আছে তাও তিনি বলেছেন। ‘ডালের সাথে মাছের সাথে/ যেমন ডাটা চলে/ গবেষকের ডাটা আবার/ অন্য কথা বলে।’ তাঁর এই ডাটার সংবাদে অনেকের জিভে জল চলে আসে।

অনুপ্রাসে সিদ্ধহস্ত সুকুমার বড়ুয়া খুব অনায়াসে বলছেন, ‘রাশবিহারী দাশের নাতি/ হাসপাতালে বাস করে/ মাস ফুরালে দেশে গিয়ে/ খাশ জমিতে চাষ করে।’ এই গল্পে রাশবিহারী দাশের নাতির মতো অনেক কিশোর আমাদের আশেপাশে ঘুর ঘুর করে, ‘যারা পাস করেনি পরীক্ষাতে/ পয়সাকড়ি নাশ করে।’

সুকুমার বড়ুয়া ছড়াকার হলেও রোগ সচেতন। ম্যাড কাউ ডিজিজ নিয়ে তিনি সচকিত হয়ে বলেন, ‘রেডকাউ ম্যাড কাউ ব্যাড কাউরে/ লাউ খেলে করে শুধু হাউ কাউরে।’ এখানে ‘উ’ ধ্বনির অনুপ্রাসে ম্যাড কাউ রোগের কথা ভেবে বাজারে গিয়ে খেই হারান ছড়াকার। তিনি কী কিনতে কী কিনেন ভেবে না পেয়ে বলেন, ‘আজ কিনি না কাল কিনি/ ঝালকাঠিতে চাল কিনি। নীল কিনি না লাল কিনি/ তিল ছেড়ে আজ তাল কিনি।’

ছড়ার ছন্দ-মাত্রার প্রয়োজনে, অন্ত্যমিলের আবাহনে ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া বাংলার মাঝে ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বাংলাকে ঋদ্ধ করেছেন। আবার ইংরেজিকেও ম্লেচ্ছ বলে দূরে রাখেননি। শেয়ালকে ধূর্ত ডাকলেও বাংলার লোকসমাজে তাকে পণ্ডিত আখ্যা দেওয়া হয়। ধূর্ত শেয়ালকে নিয়ে তিনি শিশুদের বলছেন, ‘শেয়াল নাকি লোভ করে না/ পরের কোন জিনিসটার/ কী পরিচয় দিল আহা/ কী সততা কী নিষ্ঠার/ তাইতো শিয়াল বনের মাঝে/ এডুকেশন মিনিস্টার।’ শিয়ালের এডুকেশন মিনিস্টারির কথা শুনে হাসি পেলেও ভালোও লাগে শুনতে। মনে পড়ে যায় কুমিরের সাত ছানাকে বিদ্যা দিয়ে দিগজ করার কথা। বোকা কুমিরও শেয়ালকে বিশ্বাস করে গভীরভাবে। শেয়াল আর কুমিরের আগেকার রূপকথার গল্প বা গ্রাম-বাংলার উপকথা আজকের শিশুরা আর শোনে না । তারা এখন কার্টুনের পাগল। সুকুমার বড়ুয়া এই কার্টুনপ্রিয়তা নিয়েও গজাল মেরেছেন ‘কার্টুনের দেশ’ নামক ছড়ায়। তিনি দুঃখ করে বলেছেন, ‘টম-জেরি হাতোরি/ মিস্টার বিন/ দেখে দেখে কেটে যায়/ রাত আর দিন।’

মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরে অসময়ে মেহমান আসেনি এমন ঘর বিরল। দুপুরে সবাই খেতে বসেছে এমন সময়ে মেহমানের উৎপাত। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার জোগাড় হচ্ছে এমন সময় বেজে উঠে ডোর বেল। মেহমানের এই উৎপাত হতে বাঁচতে সুকুমার ছোট দুরন্ত শিশুটি হয়ে, রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের ডানপিটে ফটিকের মতো প্রাণপণ চেষ্টা করেন। তবুও ত্যাদোড় মেহমান আসবেই। এই ঘটনাই তিনি বলছেন আমাদের--’অসময়ে মেহমান/ ঘরে ঢুকে বসে যান/ বোঝালাম ঝামেলার/ যতগুলো দিক আছে/ তিনি হেসে বললেন/ ঠিক আছে ঠিক আছে।’ মেহমানকে এতেও দমানো গেল না। তবুও ছড়াকার হারবার পাত্র নয়। বলতেই থাকে, ‘ রেশনের মোটা চাল/ টলটলে বাসি ডাল/ থালাটাও ভাঙাচোরা / বাটিটাও লিক্ আছে/ যেতে যেতে জানালেন/ ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ এমন মেহমানের পাল্লায় যদি সত্যি সত্যি কেউ পড়ে তবে কী হয় কী জানি!

এদেশে একটা সময় ছিলো যখন ছিঁচকে চোরের আবির্ভাবে জনমনে স্বস্তি ছিলো না। মসজিদের সামনে থেকে জুতো চুরি হয়ে যায়। মুরগির খোঁয়াড় হতে মুরগি গায়েব হয়। সিঁদ কেটে ঘর লোপাট হয়। এতোসব কিছু দেখে সুকুমার বড়ুয়াই বা বসে থাকবেন কেন হাত গুটিয়ে। তিনি তীক্ষ্ণ শ্লেষ মেখে আমাদের জানাচ্ছেন ছিঁচকে চুরির সংবাদ--দিন দুপুরে ঘর ডাকাতি/ পানি তোলার লোটাও নেই/ সর্ষে-তেলের বোতল গায়েব/ তেল তাতে এক ফোঁটাও নেই। এমনই হা ভাতে সেই চোর, তেলহীন বোতলটাও তার কাছে অনেক কিছু। শেষমেষ পুষিয়ে নিতে দড়িসহ ছাগলটাও চুরি করে নিয়ে যায়। ছড়াকারের জবানিতে আমরা পাই--’ছাগল বাঁধার দড়ি গেছে। দড়ির মাথায় খোঁটাও নেই/ আরেক মাথায় ছাগল ছিল/ এখন দেখি ওটাও নেই।’

ঢাকা রাজধানী হলেও জীবনযাত্রা খুব সুবিধার নয়। এখানে বাস করতে গেলে বড়ো ভাইদের ছত্রছায়া লাগে। এটাকে বুঝাতে গিয়েই তিনি অদ্ভূত সুন্দরভাবে ঢাকা বাসের বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরেছেন ছত্রছায়ায়--’ঢাকার পথে চলতে হলে/ সারা বছর ধরুন ছাতা/ উপর তলার ময়লা পানি / কিংবা কাকের কাণ্ড যা-তা।’ নিচুতলার মানুষের জীবনের যে কষ্ট তা ফুটে উঠেছে ‘কাফন’ ছড়ায় অনন্যভাবে। ঢাকা শহরের বিড়ম্বনা ছাপিয়ে জীবনের বিড়ম্বনা আরও বড়ো। এই জীবনে ফকির আলীর মতো দরিদ্ররা অসহায়। তাদের নিয়েই সুকুমার বড়ুয়া বলেছেন, ‘জ্যান্ত দিতে দানা পানি/ মরণকালে দাফন/ সর্বহারা ফকির আলীর/ কেউ ছিলো না আপন/ বেঁচে থাকার পায় না টিকেট/ মৃত্যুরও নাই সার্টিফিকেট/ উভয় বিপদ জেনেও খোঁজে/ ন্যায্য দামে কাফন।’

ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া একজন আলোক সামান্য শিল্পকারিগর। তাঁর শব্দকুশলতা, অনুপ্রাস, ধ্বনিব্যঞ্জনা, শব্দচয়ন, অন্ত্যমিল ও পংক্তি গাঁথুনি অনন্য ও অপূর্ব। শিশুমনস্তত্ত্ব, দুরন্ত শৈশব, ব্যঙ্গ ও রসিকতা, সমাজ সচেতনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, সমকালীন জীবন ও সমাজমনস্কতা--এই সকল বিষয়ই তাঁর ছড়ার অঙ্গে অঙ্গে ফুটে উঠেছে প্রধান উপজীব্য হয়ে। তাঁর ছড়ার বিষয়ের মধ্যে কী নেই। আন্দোলন-সংগ্রাম, ঐতিহ্য-ইতিহাস, বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও বিড়ম্বনা--এসব বিস্ময়কর বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর সুকুমার বড়ুয়ার সাহিত্য। তাঁর ছড়া গ্রন্থের নামের মধ্যেই ছড়ার উপাদান লক্ষণীয়। ‘ভিজে বেড়াল’, ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ঠুপঠাপ’, ‘চন্দনা-রঞ্জনার ছড়া’ ইত্যাদি নামগুলো বলে দেয়, তিনি শিশুর মনোরাজ্যেও কী নিষ্ঠাবান অভিযাত্রী।

লোকমুখে ক্রমশ বিবর্তিত-আর্বতিত হতে হতে, শ্রুতির ঐতিহ্যের ধারাপাত হয়ে ছড়া এখন একটি গেঁড়ে বসা প্রভাবশালী শিল্প মাধ্যম। বিষয়বস্তু, আঙ্গিক, ছন্দ ও প্রকরণ, চেতনাগত বিবর্তন ইত্যাদির আলোকে ছড়ায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের যাত্রাপথে যাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের ছড়ার এই আধুনিক শিল্পনন্দিত অগ্রযাত্রা, তার অগ্রসেনানী শিশু সাহিত্যিক সুকুমার বড়ুয়া। বাংলায় দুই নয়নের মণি, দুই সুকুমার। একজন ‘পাগলা দাশু’ খ্যাত, হাঁসজারু খ্যাত সুকুমার। আর অন্যজন ‘মুক্তিসেনা’র ছড়াকার সুকুমার। দুজনেরই অবদান শিশু সাহিত্যে গভীর ও ব্যাপক। বাংলার ছড়া শিল্প আজ শিশুর মনে যে স্থায়ী আসন তৈরি করে নিয়েছে তার নির্মাতাদের মধ্যে ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়াও অন্যতম।

ছড়াকার সুকুমার চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যদের উত্তর সাধক। তাঁর সাধনা নিহিত আছে ছড়ার ছন্দে, নতুন শব্দ নির্মাণে, রূপকল্পে। স্বরবৃত্ত আর অনুপ্রাসের নিবিড় গাঁথুনিতে মগ্ন সাধক সুকুমার বড়ুয়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বঞ্চিত হয়েও এমন সব ছড়া লিখেছেন যা ছোটরাতো বটেই বড়োরাও পড়ে তৃপ্ত হয়। বাংলা সাহিত্যে আধুনিক ছড়ার অগ্রসেনানী সুকুমার বড়ুয়া একজন সাদামাটা অতি সাধারণ বাঙালি। বৌদ্ধরা এমনিতেই সহজ-সরল। তার ওপর সুকুমার আরও কোমল, আরও পরিশীলিত। শৈশবের অনটন তাঁর জীবন হতে যা কেড়ে নিয়েছে, বার্ধক্যে তাঁর ছড়া তাকে তা ফিরিয়ে দিয়েছে চতুর্গুণ করে। তাই তিনি তৃপ্ত এক শিল্পকুশলী।

প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ বেশিদূর না আগালেও তাঁর সখের পাঠ, মনের পাঠ ছিলো নিত্য। তারই আলোকে তিনি নবীনদের জানিয়ে দেন, ভালো লিখতে হলে পড়তে হবে। পড়ার কোনো বিকল্প নেই। পড়ার সীমা বাড়লে লেখার গভীরতা ও বিষয় বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। আটাশি-পাড়ি দিয়ে এসেও হাসির নির্মলতায় বড়ো ‘শিশু’ সুকুমার বড়ুয়া দীর্ঘজীবী হোন প্রতিটি শিশুর প্রথম পাঠের ছড়ার মধ্যে। সিদ্ধাচার্যদের মগ্ন উত্তর সাধক সুকুমার বড়ুয়া হোন জীবনজয়ী শব্দযোদ্ধা--এই আমাদের প্রত্যাশা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়