বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৮

কল্পতরু!

রিপন কুমার সাহা
কল্পতরু!

স্বর্গের নন্দন কাননের কল্পবৃক্ষ নয়, স্পর্শ গুণে চৈতন্য সৃষ্টির রহস্যই কল্পতরু, বাস্তবে যাঁর স্পর্শে মানবের চৈতন্য আসে তা-ই কল্পতরু। সাধক রামপ্রসাদের সঙ্গীতে এর ব্যাখ্যা রয়েছে,

“আয় মন বেড়াতে যাবি কালী কল্পতরু মূলে চারি ফল কুড়াইয়া পাবি।” ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ--এই চারটি বিষয় প্রাপ্তির সাধনা বা কামনা মানবের হলেও মূলেতে মোক্ষ লাভ।

১ জানুয়ারি কলিকাতার কাশীপুরের বাগান বাড়িতে দর্শনের জন্যে অপেক্ষারত ভক্তদের সমাবেশে দোতলা থেকে সবুজ কোট ও কানঢাকা টুপি পরে অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণ নেমে আসলেন ভক্তের ভগবান হয়ে। নেমে এসে দেখেন গিরিশ ঘোষসহ জনা ত্রিশেক ভক্ত বাগানের খোলা মাঠে বসে রয়েছেন। তিনি তখন গিরিশ ঘোষকে বলেন, তুমি যে আমায় ভগবান- টগবান ও অবতার বলে বেড়াও! বাস্তবে তুমি আমার সম্বন্ধে কী জেনেছ?

যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেবের প্রশ্নের উত্তরে গিরিশ ঘোষ নতজানু হয়ে বলেন, “ব্যাস ও বাল্মিকী যাঁর ইয়ত্তা করতে পারেননি, আমি তাঁর সম্বন্ধে কী বলতে পারবো।”

গিরিশের মুখে এমন উত্তর শুনে শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবাবিষ্ট হয়ে বলেন, “আমি আর কী বলবো, আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন্য হউক।”

এই চৈতন্য শব্দটি বলার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত ভক্তদের হৃদয় মাঝে এমন এক অনুভূতি প্রকাশিত হয় যে, তারা তাদের জাগতিক সকল কিছু ভুলে যান এবং সে সময়ে অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণকে স্পর্শ করা ও প্রণাম করা বারণ থাকলেও তারা সেটা ভুলে গিয়ে তাঁকে স্পর্শ ও প্রণাম করতে থাকেন। সে সময়ে স্পর্শ গুণের কারণে ভক্তদের মধ্যে এক আধ্যাত্মিক শক্তি প্রকাশিত হয়ে কেউ কান্না করতে থাকেন, কেউ চিৎকার করে ডেকে ডেকে বলেন, “কে কোথায় রয়েছে, দেখ আজ ঠাকুর কল্পতরু হয়েছেন?”

সে সময়ের অনুভূতি সম্পর্কে শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদক অক্ষয় কুমার সেনের পুঁথির স্মৃতিচারণ থেকে পাওয়া যায়--

“কানে কিবা বলিলেন, আছয়ে স্মরণে--

মহামন্ত্র বাক্য তাই রাখিল গোপনে।

কি দেখিনু কি শুনিনু নহে কহিবার,

মনোরথ পূর্ণ আজি হইল আমার।”

এখানে ঐশী শক্তির সঙ্গে অলৌকিক শক্তির যে তফাৎ তা পরিলক্ষিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদক শব্দ ‘তোমাদের চৈতন্য হউক’, এমন ভাবনায় তাঁর আত্ম প্রকাশপূর্বক অভয় দান। যেমন করে স্বামীজি বলেছেন, মানুষের অন্তর্নিহিত দেবত্ব প্রকাশের নামই ধর্ম। সেই দেবত্বটাই যখন মানুষের মধ্যে জেগে উঠে, তখন মানুষ সচেতন হয়ে উঠে তার কর্মাকর্ম নিয়ে। সেটাই শ্রীরামকৃষ্ণের স্পর্শে সেদিন উপস্থিত ভক্তদের জেগে উঠেছিলো।

আগে সচেতনতার মাধ্যমে মানুষ হতে হয়, তারপর দেবত্ব লাভের মাধ্যমে ঈশ্বর লাভ হয়ে থাকে-- এটাই কল্পতরুর রহস্য। কিন্ত বর্তমান সময়ে কি আমরা কল্পতরু বৃক্ষের ‘মোক্ষ’ নামক ফল প্রাপ্তির জন্যে চেষ্টা করছি, না অতীতে কেউ করেছে?

ত্রেতায় ভগবান শ্রীরামও একবার কল্পতরু হয়েছিলেন এবং তাঁর দান প্রদানের দায়িত্ব হনুমানকে দিয়েছিলেন। সেদিন যে যা চেয়েছেন, তা-ই তালিকানুযায়ী হনুমানজি ব্রাহ্মণদের দিয়েছেন, আর দান দেবার সময়ে হনুমান প্রত্যেক দান গ্রহণকারীকে ভেংচি দিয়ে অবজ্ঞা করেছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যার পূর্বকাল পর্যন্ত কোনো দানগ্রহণকারীই হনুমানের এমন ব্যবহারে বিরক্তবোধ করেননি বা প্রশ্নও করেননি। ঠিক সন্ধ্যার সময়ে এক চতুর ব্রাহ্মণ দান গ্রহণকালে হনুমানের এমন আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে শ্রীরামের কাছে অনুযোগ করেন এবং দানগ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন। ব্রাহ্মণের অনুযোগে হনুমানকে ডেকে পাঠান এবং এমন শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ সম্পর্কে জানতে চান।

হনুমানজি শ্রীরামের আদেশের প্রতি নতজানু হয়ে বলেন, প্রভু এরা সব মূর্খ এবং লোভী। কেবল নিত্য বস্তু লাভের আকাক্সক্ষায় অনিত্য বস্তু লাভ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসা-যাওয়ার আবর্তনে ঘুরপাক খাচ্ছে, বস্তুত জীবের চাহিত অনিত্য বস্তু মোক্ষই কাম্য। কিন্তু আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যারা আপনার কল্পতরু অবস্থায় এসেছেন তারা কেউই মোক্ষ কামনা করেননি, তাই আমি সকলকে দান প্রদানকালে সকলকে ভেংচি কেটে কটাক্ষ করেছি। হনুমানজির এমন জ্ঞানলব্ধ বক্তব্যের পরই সেই চতুর ব্রাহ্মণের চৈতন্য ফিরে আসে এবং সকল নিত্য ও পার্থিব দান গ্রহণ ত্যাগ করে শ্রীরামের চরণে নিজেকে সমর্পণের মাধ্যমে মোক্ষ বা মুক্তি কামনা করেন।

বাস্তবে জীব যখন মোক্ষ লাভের জন্যে অবতার পুরুষের সান্নিধ্য লাভে ব্যাকুল হয়ে উঠেন, তখনই অনিত্যবোধে আনন্দ লাভের পরম সুখ অনুভব করেন বা নিত্যানন্দ ধামে অবস্থান করেন। সেই নিত্য ও অনিত্য বোধ নিয়ে গিরিশ ঘোষের সঙ্গীতে আমরা পাই, “আর ঘুমাইও না মন, তা ঝড়ে অনিত্য ধনে নিত্যানন্দ হেলো প্রাণে।”

অবতার পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের কৃপায় আমার এই মানব জীবনে অন্যদের মত চৈতন্যের উদয় হোক--এটাই কাম্য।

-রিপন কুমার সাহা : সভাপতি, শারদাঞ্জলি ফোরাম, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়