মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৭

ধারাবাহিক স্মৃতিকথা বড়বেলার স্কুলজীবন

হীরামনি
ধারাবাহিক স্মৃতিকথা বড়বেলার স্কুলজীবন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

হঠাৎ একটা টাওয়ারের মতো দেখতে পেলাম। লন্ডনে অহরহ যে টাওয়ারগুলো দেখা যায় তেমন। আমরা ওখানে গেলাম। গিয়ে দেখি সবাই ছবি তুলছে। ভিতরে ঢোকার সময় শেষ। দুইজন অসম্ভব সুন্দরী কোরিয়ান কিশোরী হ্যানবক পোশাক পরে একে অপরের ছবি তুলে দিচ্ছে। আবার দুইজন মিলে ছবিগুলো দেখছে। অপূর্ব দৃশ্য। এদেরকে দেখে আমার দুই মেয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। আমি টাওয়ারের ছবি তুলতে গিয়ে অনিচ্ছায় বা ইচ্ছায় হউক ওদের ছবি তুলে নিয়েছি। আমি নিজেও ইসাডোরার স্বামীকে অনুরোধ করলাম আমার ছবি তুলে দেয়ার জন্য। আমার ছবি তোলা শেষ। কিশোরী মেয়ে দুজনকে দেখে মনে হলো ওরা ওদের নিজেদের ছবি দেখে বেশ আনন্দিত। ওরা সেলফি তুলছে। আমি ওদেরকে ডেকে বললাম, চলো তোমাদের ছবি তুলে দেই। ওরা রাজি হয়ে সাথে সাথে ওদের ফোন আমার হাতে তুলে দিলো। আমি ওদের ছবি তুলে দিলাম। খুব সুন্দর ছবি উঠেছে ওদের। আমি ওদেরকে ফোন ফেরত দিয়ে চলে আসলাম। ফেরার সময় অসম্ভব রকমের মানসিক শান্তি লাগছিলো। মেয়ে দুজনকে হয়তো আর জীবনেও দেখবো না। কিন্তু ওদের জন্য এতো মায়া লাগছে কেন! ভাবতে ভাবতে আমার সাথে আসা অন্যদের সাথে যোগ দিলাম। এবার হঁাটতে হঁাটতে আরেকটা গেইট দিয়ে একটা জায়গায় ঢুকলাম। এখানেও একটা মিউজিয়াম। অনেক ধরনের চা পানের কাপ পিরিচ। অসম্ভব সুন্দর ফিনিশিং, রঙও বেশ আকর্ষণীয়। দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। আরও দেখতে পেলাম বিভিন্ন ধরনের গহণার বাক্স, হ্যান্ডপেইন্ট করা হাত পাখা, জানলার পর্দা, বিভিন্ন রকম ব্যাগ, টেবিল ল্যাম্প, আরও অনেক কিছু। মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ে উঠলাম। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সারা গ্রাম দেখা যাচ্ছিলো। গ্রামের নাম জনজু হ্যানক ভিলেজ। শত শত হ্যানক, খাড়া খাড়া ঘরগুলো তীব্র আকর্ষণীয়। ১৭০০ বছরের পুরনো হ্যানকগুলোকে যুবতী মেয়ের মতো দেখাচ্ছে। যেকোনো জিনিসের প্রতি কোরিয়ানদের যত্ন করার যে মনোভাব ও তারা যেভাবে যত্ন নেয় সেটা অনুসরণীয়।

সন্ধ্যা হয়ে আসলো। বের হয়ে গেলাম চুসন ডাইনাস্টি থেকে। গাড়ি পার্ক করার জন্য মেইন গেইটের কাছে এসেও পার্কিং এর জায়গা না পাওয়ায় আরও দুই কিলোমিটার ঘুরে একটা জায়গায় গাড়ি পার্ক করা হয়েছে। এখানে সব মানুষ গাড়ি ব্যবহার করে। প্রতিটি পরিবারেই গাড়ি আছে। এখানে যারা পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করেন তারাও গাড়ি ব্যবহার করেন। তারা নিজেরাও ঝকঝকে থাকেন এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ করে ঝঁা চকচকে গাড়িতে করে বাড়িতে চলে যান। যেখানেই যাই না কেন প্রচুর গাড়ি দেখা যায়। ঘুরাঘুরি শেষ করে গাড়িতে উঠতেও হঁাটতে হলো প্রায় দশ মিনিট। কারণ গাড়ির পার্কিং প্লেস বেশ দূরে। হঁাটা এখন একটা স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রথম যখন কোরিয়ায় এসেছিলাম হঁাটার কারণে পায়ে ব্লিস্টার হয়ে যেতো। অর্থাৎ পায়ে ফুস্কা। এখন আর এমন হয় না, অনেক রাস্তা হঁাটতে পারি। গাড়িতে চড়েই আবার শুরু করলাম অডিওবুক। এবার গন্তব্য ডিনারের জন্য একটা রেস্টুরেন্ট।

বিবিমভাপ হলো কোরিয়ার প্রধান একটি খাবার। পরিকল্পনামাফিক আজ আমাদের ডিনারের মেন্যু বিবিমভাপ। আধ ঘন্টা ড্রাইভ করার পরে পেঁৗছে গেলাম বিবিমভাপ রেস্টুরেন্টে। গাড়ি থেকে নেমেই চোখে পড়লো দুই বাটি বিবিমভাপের বিশাল ডামি। ছবি তুলে নিলাম বিবিমভাপের সাথে। ডামি দুইটা দেখে মনে হচ্ছিলো একদম সত্যি। দেখে এতো লোভনীয় লাগছিলো, মনে হচ্ছিলো খেয়ে নিই। ঢুকলাম রেস্টুরেন্টে। খাবার অর্ডার করা হলো। আবার সেই সাইড ডিস। আমার প্রিয় সাইড ডিসগুলো চলে আসলো। এবার আসলো বিবিমভাপ। বিবিমভাপ খাবারটা একটা বড় বাটিতে খেতে দেয়া হয়। বাটির তলারদিকে থাকে ভাত। ভাপ শব্দের অর্থ হলো ভাত। ভাতের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে। এবার ভাতের ঠিক মাঝখানে থাকে একটা ডিম পোচ। ডিম পোচের চারপাশে আছে নানা রকমের সবজি। সবজিগুলো খুবই রঙিন। যেমন - গাজর, মুলা, সবুজ শাক, লাল শাক, সী উইড। এছাড়াও সয়াবিন স্প্রাউট, রঙিন আচার, মাংস এসবও আছে। এগুলো সব একসাথে মিশিয়ে সাথে মিশাতে হয় বিভিন্ন রকমের সস। তারপর খাওয়া শুরু। সাইড ডিস আছে মোট ছয় রকমের। এক ধরনের সবুজ শাকের কিমচি, মাশরুমের আচার, বাধাকপির কিমচি, একটা মনে হলো লাউ ডগার মতো কিছুর আচার, বেগুনের কিমচি এবং সয়াবিন স্প্রাউট ভিজানো পানি। লাউ ডগার আচারটা আর সয়াবিন স্প্রাউটটা সবচেয়ে মজার ছিলো। বিবিমভাপটাও দারুণ। তবে পেটে বেশি জায়গা ছিলো না, দুপুরে সয়াবিন স্যুপ খেয়ে পেট টইটম্বুর ছিলো। তবুও খেতে চেষ্টা করছিলো। স্বাদ সত্যিই অসাধারণ। খাওয়া শেষ করে রওনা করলাম ডর্মিটরির দিকে। ফিরতে লাগবে দুই ঘন্টা। গাড়িতে উঠে আবার শুরু করলাম অডিওবুক শোনা। শুনতে শুনতে ফিরছি আপন গন্তব্যে। ইসাডোরার স্বামী গাড়ি চালাচ্ছেন আর গল্প করছেন। উনার গল্প করার বাতিক আছে, গল্প না করে তিনি চুপচাপ থাকতে পারেন না। আমি কিছু একটা শুনছি তিনি বুঝতে পেরেছেন। তিনি আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি গান শুনছি কী না। আমি অডিওবুকের কথা বললাম। তাকে বইটি শোনার পরামর্শ দিলাম। ইংরেজিতে লিখা বই শুনে তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করলেন। তিনি তার জীবনের কিছু গল্প বলতে শুরু করলেন। আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছি। তার মা আত্মহত্যা করেছিলেন। তখন তিনি খুব হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তার ভাই বোনদের কথাও বললেন। দুই ভাই তাদের স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছেন। ডিভোর্স দেয়ার পরপরই দুইজন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হতাশাগ্রস্থ হয়ে তিনি একদিন খ্রিস্টধর্মের গোস্পেল পেয়েছেন। তারপর থেকে তিনি খুব সুন্দর জীবন যাপন করছেন। এসব গল্প করতে করতে আমারা গন্তব্যে পেঁৗছে গেলাম। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। ইসাডোরার স্বামী ক্যাম্পাস ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত দঁাড়িয়ে থেকে হাত নাড়িয়ে তাকে বিদায় দিলাম।

আমার এক আত্মীয় ফোন করেছেন। উনার সাথে কথা বলছি। উনার রাজকীয় বাড়ি, গাড়ি, ব্রান্ডের পোশাক, দামী রেস্টুরেন্টে খাবার দাবার ভীষণ পছন্দ। আমি বললাম, আমার এমন কোনো স্বপ্ন নেই কেন? তিনি বললেন, “বিকজ, ইউ ড্রিম বিগ”। আমি বললাম, সেটা কেমন? উনার উত্তর শুনে আমি সত্যিই অবাক। ঠিক, একদম ঠিক।

হীরামনি : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান।

(চলবে, পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়