প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৪২
৬ সন্তানের দরজায় আঘাত, মিললো না ঠাঁই
স্বামীর ভিটায় কুঁড়েঘরের আকুতি ৮৫ বছরের বৃদ্ধার

পেটে ধরেছিলেন ছয়-ছয়টি সন্তান। একসময় যাদের পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন, শৈশবে একটু আঁচড় লাগতে দেননি, জীবনের শেষ বিকেলে এসে সেই গর্ভজাত সন্তানদের বন্ধ দরজার সামনেই অঝোরে কাঁদতে হলো ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা জয়নব ভানুকে। দীর্ঘক্ষণ বদ্ধ দুয়ারে টোকা দিয়েও মিলেনি একটুখানি ঠাঁই। বৃদ্ধ বয়সে সন্তানদের এমন পাষাণ হৃদয় দেখে অঝোরে অশ্রু বিসর্জন দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না এই রিক্তহস্ত মায়ের।
|আরো খবর
শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব কাদরা গ্রামের মৃত সৈয়দ আহমেদের স্ত্রী জয়নব ভানু। বহু বছর আগেই মাথার ওপর থেকে স্বামীর হাতটি সরে গেছে। জীবনের সবটুকু সম্বল আর আশা-ভরসা সঁপে দিয়েছিলেন কলিজার টুকরো ছয় ছেলের ওপর। কিন্তু জীবনের ৮৫টি বসন্ত পার করে এসে আজ তিনি দিশেহারা। দীর্ঘ এক মাস কুমিল্লায় চিকিৎসাধীন থেকে একটু সুস্থ হয়ে যখন নিজের ভিটেমাটিতে ফিরলেন, তখনো তিনি জানতেন না কত বড় নির্মমতা অপেক্ষা করছে তার জন্য।
বাড়িতে ফিরে একের পর এক ছেলের ঘরের দরজায় টোকা দিয়েছেন জয়নব ভানু। কিন্তু কোনো বন্ধ দরজাই খোলেনি মায়ের জন্য। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করে কারও সাড়াশব্দ না পেয়ে অবশেষে বন্ধ দরজার সামনেই ধুলোবালিতে বসে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সন্তানের ভিটায় মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে শেষ পর্যন্ত এক বুক কষ্ট আর চোখের পানি নিয়ে আকুতি জানান—স্বামীর ভিটায় অন্তত একটি কুঁড়েঘর যেন তাকে বানিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে নির্ভাবনায় শেষ নিঃশ্বাসটুকু ত্যাগ করতে পারেন।
ঘটনাটি দেখতে পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন যুবক এগিয়ে এসে ওই বৃদ্ধা মায়ের খোঁজখবর নেন। মায়ের চোখের পানি দেখে বাতাসও যেন ভারি হয়ে ওঠে।
অবশ্য সন্তানদের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই মিলেছে দায়সারা ও অজুহাতের বক্তব্য। মেজো ছেলে আবুল কাশেমের দাবি, মা দীর্ঘ এক বছর কোথায় ছিলেন তা তিনি জানেন না, তবে তিনি নাকি ডেকেছেন। আর বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী এবং সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রীর দাবি, শাশুড়ি কখন এসেছেন বা কতক্ষণ বসে ছিলেন তা তারা খেয়ালই করেননি!
জয়নব ভানুর মেয়ে ঝর্ণা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, “মায়ের এই করুণ অবস্থার কথা শুনেই আমি ছুটে এসেছি। গত ২০ বছর ধরে আমার ভাইয়েরা মায়ের সাথে এই একই রকম নিষ্ঠুর আচরণ করে আসছে। তারা আসলে চায় মাকে যেন সম্পূর্ণভাবে আমার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের খান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “একজন বয়োবৃদ্ধ মায়ের সাথে সন্তানের এই আচরণ অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও লজ্জাজনক। আমরা এলাকাবাসীকে নিয়ে বসে বিষয়টি সামাজিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেব।”
জানা গেছে, জয়নব ভানুর ছয় ছেলের মধ্যে শাহজাহান ও আবুল কাশেম বাড়িতেই বসবাস করেন এবং বাকি চার ছেলে প্রবাসী। তবুও দুবেলা দুটো ভাত আর মাথা গোঁজার একটুখানি জায়গা দমেলেনি কোনো ছেলের ঘরেই।
এ বিষয়ে চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম বেলাল জানান, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বার্ধক্যে এসে একজন গর্ভধারিণী মায়ের এমন করুণ পরিণতি সত্যিই হৃদয় বিদীর্ণ করে। সামাজিকভাবে এই ধরনের কুসন্তানদের বিচার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।”
সন্তানদের ঘরে যখন মানবতার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, তখন শেষ পর্যন্ত অশ্রুসজল চোখে বাধ্য হয়ে বৃদ্ধা জয়নব ভানুকে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে যান তার মেয়ে ঝর্ণা বেগম। নিজ ভিটেমাটিতে সন্তানদের ছাদের নিচে ঠাঁই না পেয়ে এক বুক হাহাকার আর অপমান নিয়ে অবশেষে মেয়ের হাত ধরেই ছায়া ঘেরা সেই পথ ছাড়তে হয় জয়নব ভানুকে।







