প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৭
মামলা-জটিলতায় যেন মানবিকতা হারিয়ে না যায়

ফরিদগঞ্জের চরমান্দারী গ্রামের ফয়েজ আহমেদের পরিবারের দুর্দশার চিত্র কেবল একটি জমি নিয়ে বিরোধ কিংবা ভবন নির্মাণ বন্ধ থাকার ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের মানবিকতা, আইনের প্রয়োগ এবং অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের এক নির্মম বাস্তবতা। পাকা ঘরের স্বপ্ন নিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করেও আজ একটি পরিবারকে পলিথিনে মোড়ানো ঝুপড়িতে দিন কাটাতে হচ্ছে। ঘরের চালের ফঁাক দিয়ে দিনের আলো আর রাতের জোছনা প্রবেশ করলেও সেই আলো-জোছনা তাদের জীবনে স্বস্তি এনে দিতে পারছে না।
|আরো খবর
একজন শ্রমজীবী বৃদ্ধের দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত সঞ্চয়, প্রবাসী ছেলের ঘামঝরানো উপার্জন আর পরিবারের একটু ভালো থাকার স্বপ্নÑসবকিছু মিলিয়ে নির্মিত হচ্ছিল একটি নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন আজ মামলা ও বিরোধের জটিলতায় আটকে গেছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন পরিবারের শিশু ও বয়োবৃদ্ধ সদস্যরা, যাদের জীবনের নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিত করা সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে তার নিষ্পত্তির জন্য আদালত রয়েছে, আইন রয়েছে। কারও জমির অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তিনি অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। তবে বিরোধের প্রকৃত স্বরূপ নির্ধারণ এবং কার দাবি কতোটা যৌক্তিক, তা নিশ্চিত হওয়া আদালতের দায়িত্ব। সংবাদে উত্থাপিত অভিযোগগুলোরও যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। কিন্তু কোনো বিরোধের জেরে যেন নিরপরাধ ও অসহায় মানুষকে অমানবিক জীবনযাপনে বাধ্য হতে না হয়, সেটিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই কখনোই হামলা, ভয়ভীতি কিংবা প্রতিহিংসার অজুহাত হতে পারে না।
ফয়েজ আহমেদের পরিবারের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, বিরোধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া। আদালতের এখতিয়ার ও নির্দেশনা অক্ষুণ্ন রেখেই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পুলিশ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জমির সীমানা ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে তা যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের সাময়িক মানবিক সহায়তার ব্যবস্থা করাও জরুরি। আইনগত প্রক্রিয়া চলতে পারে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার ফঁাকে যেন একটি পরিবার শীত, বৃষ্টি ও রোগের ঝুঁকিতে অসহায়ভাবে পড়ে না থাকে।
বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। চিকিৎসকদের আশঙ্কা অনুযায়ী, ঝুপড়ি ঘরে বসবাস তাদের ঠান্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শীতের তীব্রতা বাড়ার আগেই পরিবারটির নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য ও অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন কিংবা অবকাঠামোয় নয়; বরং বিপন্ন মানুষের পাশে দঁাড়ানোর মানসিকতায়। ফয়েজ আহমেদের পরিবার যেন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থেকে মানবিক সহায়তা থেকেও বঞ্চিত না হয়। জমির বিরোধের নিষ্পত্তি হোক আইনের পথে, অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হোক নিরপেক্ষ তদন্তে, আর অসহায় মানুষগুলো ফিরে পাক নিরাপদে মাথা গেঁাজার ঠঁাই।
মনে রাখতে হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মানবিকতার সুরক্ষাও রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। মামলা চলতে পারে, বিরোধের নিষ্পত্তিতে সময় লাগতে পারে; কিন্তু একটি বৃদ্ধের অসহায়ত্ব, একটি শিশুর শীতার্ত রাত কিংবা একটি পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকারকে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষায় রাখা যায় না।







