বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২২

কিশোর অপরাধ ও প্রযুক্তির অপপ্রয়োগ

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার
কিশোর অপরাধ ও প্রযুক্তির অপপ্রয়োগ

কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এখন শুধু কোনো নির্দিষ্ট পাড়া-মহল্লার সমস্যা নয়, এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বৃহত্তর সমাজের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। রাস্তার মোড়, বাজার, অলিগলি কিংবা অন্ধকার নির্জন স্থানে দলবদ্ধ কিশোরদের আড্ডা থেকে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মারামারি ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কখনো কখনো শিশু ও কিশোরদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, অপহরণ বা হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও অপ্রাপ্তবয়স্করা জড়িয়ে পড়ছে ষ সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে তারা সহপাঠীর চাপে, অপরাধী চক্রের প্রভাবে, পারিবারিক অবহেলা, কিংবা সামাজিক বৈষম্যের কারণে আরো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে অন্তত ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, এদের সদস্য সংখ্যা সোয়া ৪ হাজারেরও বেশি, যার মধ্যে ৮০ শতাংশেরই বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। শুধু রাজধানীতেই সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা প্রায় ১৫৯টি এবং সদস্য প্রায় ১,৮১২ জন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী এই কিশোর গ্যাংগুলোর নেপথ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী, স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা, ছাত্রসংগঠন বা যুবসংগঠনের কিছু নেতা এবং ‘বড় ভাই’। এদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোররা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং জমি দখল সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। অপরাধ করে ধরা পড়লে বা বিপদে পড়লে, তাদের পেছনে থাকা তথাকথিত ‘বড় ভাইরা’ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাদের থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে, যা এদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে এই সমস্যার পেছনে ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে কিশোর অপরাধ ও এর ফলে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সম্প্রতি কুমিল্লার স্কুলছাত্র অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকটক ভিডিও বানানো, মোটরসাইকেলের মহড়া এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য গ্যাং তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা ফেসবুক, টিকটক এবং লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে কিশোররা গ্রুপ তৈরি করছে। তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা প্রদর্শন ও ছিনতাইয়ের (যেমন আইফোন বা বাইক ছিনতাই) কারণে গত কয়েক বছরে শত শত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। শুধু কুমিল্লাতেই ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ড মামলার নথিপত্র রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে দেশের মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই শিশু-কিশোর হত্যার সাথে সম্পর্কিত, যার একটি বড় অংশের নেপথ্যে রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ বা বহিরাগত সহিংসতা। এইসব সহিংসতা ছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক ব্ল্যাকমেইল ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অগণিত অঘটন ঘটছে প্রতিনিয়ত। মিডিয়া রিপোর্ট ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধুমাত্র গত এক বছরেই সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব ও সাইবার অপরাধের কারণে দেশে অন্তত ২০৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্লেষকদের মতে সাইবার অপরাধের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (প্রায় ২১.৬৫%) সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাকিং ও বুলিংয়ের সাথে সম্পর্কিত, যার বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণদের দ্বারা পরিচালিত হয় অথবা তারা নিজেরাই এর শিকার হচ্ছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম সব সময় কিশোরদের সহিংস কনটেন্টের দিকে ধাবিত করে ষ পাশাপাশি পারিবারিক নজরদারির অভাব এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করা কঠিন হচ্ছে, যা কিশোর অপরাধ ও মৃত্যুর ঘটনাকে ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে তুলছে।

পরিত্রাণের জন্য কোন কনটেন্ট দেখা যাবে, অপরিচিত কারও সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে, ব্যক্তিগত তথ্য কেন গোপন রাখতে হবে, অনলাইনে হুমকি বা হয়রানির শিকার হলে কাকে জানাতে হবে, এসব বিষয়ে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী ধরনের অনলাইন কনটেন্টে আগ্রহী, তার আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে খোঁজ নিতে হবে। তবে নজরদারি যেন অবিশ্বাস বা অপমানের পর্যায়ে না যায়, বরং সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে সে বিপদে পড়লে ভয় না পেয়ে বাবা-মায়ের কাছে সাহায্য চাইতে পারে। সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞানচর্চা, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে সন্তানের জন্য শুধু খাবার, পোশাক, স্কুল ও স্মার্টফোনের ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়, তাকে সময়, ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে হয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ, যেখানে কোনো শিশু অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে ব্যবহৃত হবে না, কোনো শিশু ভয় নিয়ে রাস্তায় চলবে না এবং কোনো পরিবার সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিদিন উদ্বিগ্ন থাকবে না।

আর বড় ভাই বা গডফাদার নিয়ন্ত্রণে বহুমাত্রিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন: ১. রাজনৈতিক ও আইনি কঠোরতা (মূল পৃষ্ঠপোষকদের টার্গেট করা): পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার: কিশোর গ্যাংয়ের চেয়ে তাদের পেছনে থাকা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, বড় ভাই বা যুবসংগঠনের তথাকথিত নেতাদের আইনের আওতায় আনা সবচেয়ে জরুরি। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে শূন্য সহনশীলতা (তবৎড় ঞড়ষবৎধহপব) নীতি গ্রহণ করতে হবে। কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি: প্রতিটি এলাকায় কোন কিশোর গ্যাং কার ছত্রছায়ায় চলে, তার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। ২. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও সংস্কার: কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার: পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বাড়াতে হবে। আইনের অপপ্রয়োগ রোধ: অনেক সময় প্রভাবশালীরা তদবির করে অপরাধী কিশোরদের থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়। পুলিশের ওপর থেকে এই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ বন্ধ করতে হবে। ৩. সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিরোধ: পারিবারিক সচেতনতা ও দায়িত্ব: সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে এবং তার খরচের উৎস কী, সে বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন থাকতে হবে। সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি। এলাকাভিত্তিক সামাজিক কমিটি: শিক্ষক, অভিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এলাকাভিত্তিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে, যা কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে বাধা দেবে। ৪. কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিক ও শিক্ষামূলক উন্নয়ন: সুস্থ বিনোদন ও খেলার মাঠ: কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পার্ক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের (যেমন: নাটক, বিতর্ক, বই পড়া) সুযোগ তৈরি করতে হবে। কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন: যেসব কিশোর ইতিমধ্যেই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের সরাসরি কারাগারে না পাঠিয়ে সংশোধনাগার বা কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. ডিজিটাল ও সাইবার নজরদারি: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (যেমন: টিকটক, ফেসবুক গ্রুপ) গ্যাং কালচারের প্রচার এবং গ্যাংভিত্তিক কোন্দল রুখতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের নজরদারি বাড়াতে হবে।

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়