প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৬
স্বপ্নে দেখা সেই মেয়ে

শেষ রাতে ফজরের সময় এলাকার মহল্লার মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে সুমধুর আজানের ধ্বনি, আর ভোরের পাখিদের মধুর কিচিরমিচির সুরের কলকাকলি আলম শেখের দুটি কানে ভেসে আসতেই তার ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল।
তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে মুখ-হাত ধুয়ে ওজু সেরে নামাজ পড়ল। ততক্ষণে প্রভাতের শুভ্র আভা বিকশিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
আলম শেখের বাড়িতে ঢুকতেই সদর দরজা থেকে শুরু করে দুই ধারে গোলাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ লাগানো। তার মধ্য দিয়ে বাড়িতে প্রবেশের মসৃণ ইটের সলিং বসানো পথ। প্রতিদিনের রুটিনমাফিক আজও আলম সাহেব ফুলগাছগুলোতে পানি দিচ্ছেন।
ঢাকা গুলশান রোডের কিলোমিটার দুই ভেতরে পাঁচ শতক জমির ওপর চার কক্ষবিশিষ্ট একতলা ছাদের বাড়ি আলম শেখের। সাথে একটা অতিথিকক্ষ (গেস্ট রুম) আর রান্নাঘর (কুকিং রুম) রয়েছে। বাড়ির সামনে দিয়েই লোক চলাচলের একটি পথ... ভ্যান, রিকশা, মোটরবাইক, ছোট দুই-একটা গাড়ি সে পথ দিয়ে অনায়াসে চলাচল করতে পারে।
আলম শেখের স্ত্রী শেফালী বেগম প্রতিদিনের ন্যায় ফজরের নামাজ পড়ে তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে ঢুকেছেন প্রাতরাশ (ব্রেকফাস্ট) তৈরি করার জন্য। রান্নাঘরে যাওয়ার সময় অর্পিতার ঘরের দরজায় মৃদু ধাক্কা দিয়ে অর্পিতাকে ডাকলেন।
—অর্পিতা! ও অর্পিতা! মা অর্পিতা?
মায়ের ডাকে আলম শেখের একমাত্র মেয়ে অর্পিতার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমজড়ানো চোখে নিস্তেজ দেহের অবসন্নতা দূর করার জন্য একটু আড়মোড়া ভেঙে ঘুমের রেশটা কাটানোর চেষ্টা করে বলল, “জি আম্মু! কিছু বলছ?”
—ওঠ মা, চারদিকে ফর্সা হয়ে গেছে। উঠে হাত-মুখ ধুয়ে একটু বই নিয়ে পড়তে বোস।
তখনও অর্পিতার ঘুমের হাই উঠছিল। হাই তুলতে তুলতে বলল, “হুম, উঠছি আম্মু।” সামনে অর্পিতার অর্থনীতি (ইকোনমিক্স) বিষয়ে অনার্স চূড়ান্ত পরীক্ষা। রাতে জেগে পড়ার কারণে অর্পিতার ঘুমটা পরিপূর্ণ হয়নি। ঘুমের রেশটা এখনো দুটি চোখে যেন রয়ে গেছে।
অর্পিতার মা তাকে ডেকে দিয়ে ব্যস্ততার সাথে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলেন। অর্পিতা ঘুমঢুলু চোখে টলতে টলতে শোবার ঘরের দরজা খুলে প্রক্ষালনকক্ষে (ওয়াশরুম) ঢুকল। ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে দাঁত মেজে চোখে-মুখে পানি দিয়ে সতেজ হয়ে শোবার ঘরে এল। তারপর তোয়ালে দিয়ে হাত-মুখ মুছে পড়ার টেবিলের সামনের চেয়ারটিতে বসে একটি বই মেলে পড়ার ওপর চোখ বুলাচ্ছিল।
হঠাৎ দাদীর কণ্ঠ!
—অর্পিতা! ও অর্পিতা! অর্পিতা দিদিভাই?
অর্পিতা বলল, “জি দিদান?”
—কী করছিস দিদিভাই? পড়তে বসেছিস নাকি?
—হুম, একটু পড়ছি দিদান। কেন, কিছু বলছ?
অর্পিতার দাদী একটু জোরে আওয়াজ করে বললেন, “হ্যাঁ রে দিদিভাই, বলছিলাম একটু... আমার ঘরের বিছানায় দেখ, বালিশের পাশে আমার চশমাটা রয়েছে। ওটা একটু দিয়ে যা তো দিদিভাই।”
ফজরের নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে কোরআন পড়ছিলেন অর্পিতার দাদী সায়মা বেগম। বয়স প্রায় আশির ঊর্ধ্বে। বয়সের কারণে দুটি চোখে ছানি পড়ে এখন ঝাপসা দেখেন। তিনশো প্লাস পাওয়ার লাগে তার কাছের জিনিস দেখতে গেলে, আর দূরের জন্য লাগে মাইনাস দুইশো।
সায়মা বেগম একটু কোরআনের ওপর ঝুঁকে অক্ষরগুলো ভালো করে দেখার চেষ্টা করতে করতে ব্যথিত মন নিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, “এখন আর চোখে ভালো দেখতেও পাই না। সব কিছু যেন কেমন কুয়াশার মতো ঝাপসা লাগে।”
অর্পিতা বইটা বন্ধ করে দাদীর ঘর থেকে চশমাটা নিয়ে দাদীর কাছে যেতে যেতে একটু বিরক্তির সুরে বলল, “আচ্ছা দিদান, তুমি তো জানো চশমা ছাড়া তুমি কোরআন পড়তে পারো না, তাহলে রোজ রোজ একই ভুল তুমি কেন করো, শুনি? ওজু করে যখন নামাজে বসো, তখন তো তুমি চশমাটাও একবারে নিয়ে এসে বসতে পারো।”
সায়মা বেগম একটু মুচকি হেসে অর্পিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার দিদিভাইয়ের খুব বিরক্তি মনে হচ্ছে, হুম?”
একটু অভিমানমিশ্রিত বিরক্তির সুরে অর্পিতা বলল, “বারে, বিরক্ত হব না? শুধু একদিন না দিদান, প্রতিদিন সকালে তুমি আমাকে দিয়ে চশমা আনাও। একদিনও তোমার মিস হয় না!”
একটু দুঃখী মনে, মলিন মুখে, অসহায়ত্বের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সায়মা বেগম বললেন, “বয়স হয়েছে তো দিদিভাই, চোখেও ভালো দেখি না, স্মরণশক্তিটাও লোপ পেয়েছে। তাই এখন আর সব কিছু তেমন মনে রাখতে পারি না।”
তারপর মুখে ক্ষীণ হাসির রেখা টানার চেষ্টা করে বললেন, “আমার মতো বয়স হোক দিদিভাই, তখন তুইও বুঝবি...”
অর্পিতা বুঝতে পারল ওভাবে তার দাদীকে কথাটা বলা মোটেও উচিত হয়নি, দাদী মনে কষ্ট পেয়েছেন। তবুও না বোঝার ভান করে মুখে হাসি ফুটিয়ে দাদীর কথার উত্তর দিতে গিয়ে একটু বিস্ময় প্রকাশ করল। দাদীকে জড়িয়ে ধরে হাঁটু গেড়ে বসতে বসতে বলল, “তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে দিদান! তুমি জানো, এখন আমাদের বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু কত? মাত্র ষাট বছর! তাও আবার ত্রিশ বছর পার হতে না হতে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ব্লাড ক্যান্সার, ব্রেইন টিউমার আর হার্টের অসুখে স্ট্রোক করে হঠাৎ করে মৃত্যু তো আছেই। এছাড়া আকস্মিকভাবে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনাসহ নৌকা ও লঞ্চডুবি, সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে নারী, শিশু ও পুরুষ মিলে শতকরা প্রায় ত্রিশ জন। এছাড়া বিভিন্ন ছোটখাটো রোগ তো আছেই। সেই হিসেবে আমি চল্লিশ বছর বাঁচব কিনা সন্দেহ! এখন আবার নতুন করে এক অচেনা রোগ এসেছে—করোনা, যেটা হলে নাকি মৃত্যু সবার অবধারিত। বিশ্বজুড়ে করোনা এক ভয়ানক মহামারী রূপ নিয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশ এখনো এ রোগের প্রতিষেধক তৈরি করতে পারেনি। এবার তুমিই বলো দিদান, তোমার মতো অত বয়স পর্যন্ত কি আর আমি বাঁচব?”
অর্পিতা সায়মা বেগমের খুব আদরের নাতনি। ওর মুখের কথা শুনে বৃদ্ধার চোখ দুটি জলে ছলছল করে উঠল। আঁচল দিয়ে দুই চোখের কোণের জল মুছতে মুছতে অর্পিতার মুখে ও মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “অমন কথা বলিসনে দিদিভাই। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমার চেয়েও তোকে দীর্ঘায়ু দান করেন।”
অর্পিতা দাদীর হাতের ওপর হাত রেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “আচ্ছা হয়েছে, হয়েছে। আমি সারা জীবন তোমাদের মাঝে এভাবে চিরতরুণ হয়ে বেঁচে থাকব, এবার খুশি তো দিদান?”
সায়মা বেগম একটু হেসে উঠে বললেন, “হ্যাঁ, খুশি! আমার পাগলী দিদিভাই যেন সব সময় ভালো থাকে আর বহু বছর বেঁচে থাকে, এটাই আমি সব সময় আল্লাহর কাছে চাই।”








