শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৭

শতাব্দীর দ্বিধা ও একটি পূর্ণিমার গল্প

ক্ষুদীরাম দাস
শতাব্দীর দ্বিধা ও একটি পূর্ণিমার গল্প

অরণি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলো। আজ পূর্ণিমা। আকাশের ওই চাঁদটাকে দেখে ওর মনে হচ্ছিলো, চাঁদটা যেন সারা দুনিয়াকে আলো মেখে দিচ্ছে। কিন্তু অরণির নিজের জীবনের আকাশে মেঘ আর রোদ্দুরের খেলাটা বেশ জটিল। কয়েক বছর আগে অরণি যখন মাস্টার্স শেষ করে একটা বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলো, তখন ওর চোখে অনেক স্বপ্ন ছিলো। ও ভেবেছিলো জীবনের প্রতিটি মোড়ে ও এভাবেই জয়ী হবে। কিন্তু বিয়ের পর সমীকরণটা বদলে যেতে শুরু করলো।

অরণির স্বামী নীল পেশায় একজন আর্কিটেক্ট। মানুষ হিসেবে ও খুব ভালো, কিন্তু ওর ভেতরেও কোথাও একটা সনাতন সংস্কার গেঁথে আছে। অরণি যখন সকালে অফিসের জন্যে তৈরি হয়, তখন নীলের চোখে এক ধরণের নীরব প্রশ্ন ও দেখেছে। নীল হয়তো সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু অরণির মনে হয় নীলের পরিবার যেন ভাবছে—মেয়েটি কী শুধু চাকরিই করে যাবে? ঘর-সংসার সামলানোর দায় কি ওর নয়?

অরণির শ্বশুরবাড়ির লোকেরা খুব রক্ষণশীল না হলেও তাদের ধারণা ছিলো যে, বাড়ির বউ মানেই সে রান্নাবান্না আর ঘরদোর গুছিয়ে রাখবে। অরণি যখন প্রথম প্রথম অফিসে যেতো, তখন শাশুড়ি আমলা দেবী কিছু বলতেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর কথায় খোঁচা আসতে শুরু করলো। একদিন সকালবেলা ডাইনিং টেবিলে বসে নীল চা খাচ্ছিলো। অরণি তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আমলা দেবী তখন বললেন, ‘বউমা, আজ তো নীল বলছিলো ওর কিছু বন্ধু আসবে। তুমি কি একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবে? আসলে বাইরের খাবার তো আর ঘরের মতো হয় না।’

অরণি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ওর হাতে সময় খুব কম। ও মৃদুস্বরে বললো, ‘মা, আজ একটা ইমপর্টেন্ট মিটিং আছে। ফিরতে একটু দেরি হতে পারে। আপনি যদি রেবা মাসিকে দিয়ে একটু কাজ করিয়ে নেন, তবে সুবিধা হয়।’ আমলা দেবীর মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেলো। তিনি নিচু স্বরে বললেন, ‘সবই বুঝলাম। কিন্তু সংসারের শ্রী তো গিন্নির হাতে। চাকরি করলে কি আর ঘরের শ্রী থাকে?’

অরণি কোনো উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে গেলো। বাসে বসে ও ভাবছিলো—কেন এই প্রশ্নটা শুধু নারীদেরই করা হয়? পুরুষরা যখন চাকরি করে, তখন তো কেউ বলে না যে তাদের জন্যে সংসারের শ্রী নষ্ট হচ্ছে। নারী শিক্ষা ও কর্মজীবনে প্রবেশ গত কয়েক দশকে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানসিকতার পরিবর্তন কি আদৌ হয়েছে?

অফিসে কাজের চাপে অরণি সব ভুলে গিয়েছিলো। ও একজন দক্ষ প্রজেক্ট ম্যানেজার। ওর অধীনে বিশজন কর্মী কাজ করে। অফিসের ডেস্কে বসলে ও হয়ে ওঠে এক অন্য মানুষ—দৃঢ়চেতা ও আত্মবিশ্বাসী। অথচ ঘরের চৌকাঠ পেরোলেই ওকে এক অদৃশ্য চাপের মোকাবিলা করতে হয়। অফিসের লাঞ্চ ব্রেকে ওর সহকর্মী মিতুর সাথে কথা হচ্ছিলো। মিতুও বিবাহিত এবং তার একটি বাচ্চা আছে। মিতু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘জানিস অরণি, মাঝে মাঝে মনে হয় চাকরিটা ছেড়ে দিই। বাচ্চাটাকে কাজের লোকের কাছে রেখে আসতে বুকের ভেতরটা ফেটে যায়। আবার ভাবি, এত কষ্ট করে পড়াশোনা করলাম শুধু কি রান্নাবান্না করার জন্যে? আমাদের তো দুই কূলেই টান।’

অরণি বুঝলো এ সঙ্কট শুধু ওর একার নয়। আধুনিক সমাজে নারী এখন আর শুধুই ‘ঘরের মানুষ’ নয়, একজন যোগ্য পেশাজীবী। তবুও পরিবার তাকে ঘর-সংসারের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতেই অভ্যস্ত।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে অরণির সত্যিই দেরি হয়ে গেলো। নীল বন্ধুদের নিয়ে ড্রয়িংরুমে আড্ডা দিচ্ছে। অরণি ভেতরে ঢোকার সময় দেখলো টেবিলটা অগোছালো হয়ে আছে। নীল ওর দিকে একবার তাকালো, কিন্তু সেই চাহনিতে কোনো সহানুভূতি ছিলো না, বরং ছিলো এক ধরণের অভিযোগ। অতিথিরা চলে যাওয়ার পর নীল গম্ভীর গলায় বললো, ‘অরণি, আমার মনে হয় তোমার এবার একটু ভাবা উচিত। আমরা কি অর্থের জন্যেই শুধু দৌড়াচ্ছি? আমাদের কি একটা সুন্দর পারিবারিক জীবনের প্রয়োজন নেই?’

অরণি শান্তভাবে বসলো। ও জানে আজ ওকে কথা বলতেই হবে। ও বললো, ‘নীল, সুন্দর পারিবারিক জীবন বলতে কি তুমি শুধু আমার বাড়িতে থাকাটাকেই বোঝাচ্ছো? আমি যখন অফিসে থাকি, তখন আমি আমার মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে কিছু তৈরি করি। সেটা কি তোমার কাছে কোনো মূল্য রাখে না? তুমি যখন প্রজেক্ট শেষ করে ফেরো, আমি তো তোমাকে অভিনন্দন জানাই। আমি তো বলি না যে তুমি কেন বাড়িতে বসে সময় দিলে না।’

নীল খানিকটা থতমত খেয়ে গেলো। ও বললো, ‘তা নয়। কিন্তু নারী-পুরুষের ভূমিকা তো আলাদা।’

অরণি হাসলো। ও বললো, ‘ভূমিকা সমাজ ঠিক করে দিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন বদলেছে। এখন প্রশ্নটা এটা হওয়া উচিত নয় যে নারী সংসার করবে নাকি চাকরি করবে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—পরিবার ও সমাজ কীভাবে নারীকে তার স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবে। আমি যদি চাকরি ছেড়ে ঘরে বসে থাকি, তবে আমি হয়তো ভালো রাঁধুনি হবো, কিন্তু আমার ভেতরের যে সত্তাটা গত বিশ বছর ধরে গড়ে উঠেছে, সে মরে যাবে। তুমি কি একজন মৃত মানুষকে নিয়ে সংসার করতে চাও?’

নীলের কোনো উত্তর ছিলো না। তবে অরণি দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। ও ঠিক করলো ও চাকরি ছাড়বে না, তবে সংসারের প্রতিও ওর দায়িত্ব ও পালন করবে। কিন্তু সেটা একা নয়, নীলকেও ওর সাথে হাত মেলাতে হবে।

পরের কয়েক মাস অরণির জন্যে খুব কঠিন ছিলো। ও শাশুড়ির সাথে খোলাখুলি কথা বললো। আমলা দেবীকে ও বোঝালো যে, ও যদি আর্থিক ও মানসিকভাবে স্বাবলম্বী থাকে, তবে সেটা পরিবারের জন্যেও ভালো। আমলা দেবী প্রথমে কিছুটা নাখোশ থাকলেও অরণির দৃঢ়তা দেখে কিছুটা নমনীয় হলেন। অরণি অফিসে যাওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব কাজ গুছিয়ে রাখতো, আবার ফেরার পর নীলের সাথে মিলে রাতের খাবার তৈরি করতো। নীল প্রথমে অস্বস্তিতে থাকলেও ধীরে ধীরে ও রান্নাঘরে অরণিকে সাহায্য করতে শুরু করলো।

একদিন দেখা গেলো নীলই অফিস থেকে ফেরার পথে বাজার করে আনছে। আমলা দেবী এটা দেখে প্রথমে অবাক হয়েছিলেন, কিন্তু যখন দেখলেন অরণি ও নীল দুজনেই হাসিখুশি আছে এবং ঘরের পরিবেশও আগের চেয়ে অনেক বেশি জীবন্ত, তখন তিনিও সেটা মেনে নিলেন।

গল্পের এ মোড়টি বাস্তবতার দাবি। সমাজ বা পরিবার কেউই এককভাবে জয়ী হতে পারে না যদি না পারস্পরিক সহযোগিতা থাকে। অরণি একদিন রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলো। আজ আর ওর মনে কোনো দ্বিধা নেই। ও জানে, নারী হিসেবে ওকে হয়তো আরো অনেক বড় যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হবে, কিন্তু ও আর ভীত নয়। ওর মনে হলো আকাশের চাঁদটা যেন আজ আরো বেশি আলো মেখে দিয়েছে ওর ঘরে।

সেদিন রাতে নীল এসে অরণির পাশে দাঁড়ালো। ও বললো, ‘জানিস অরণি, আজ অফিসে আমার একটা প্রজেক্ট খুব প্রশংসা পেয়েছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কী জানিস? আমি যখন ক্লান্ত হয়ে ফিরছিলাম, তখন মনে হচ্ছিলো আমাদের ছোট ছোট কাজগুলো—যেগুলো আমরা একসাথে করি—সেগুলোই আমাকে বেশি শান্তি দিচ্ছে। তুই ঠিকই বলেছিলি, এটা কোনো লড়াই নয়, এটা হলো একসাথে পথ চলা।’

অরণি নীলের দিকে তাকিয়ে হাসলো। ওর চোখের কোণে এক বিন্দু জল চিকচিক করছিলো। সেটা দুঃখের নয়, পরম তৃপ্তির। আধুনিক সমাজে একজন নারীর সামাজিক অবস্থান এভাবেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। কর্মজীবনে প্রবেশ মানেই সংসারের অবহেলার নয়, বরং নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে সংসারকে সাজানো।

এ যে পরিবর্তন, এটা গত কয়েক দশকে অভূতপূর্ব। আগে নারীরা হয়তো নীরবে সব মেনে নিতো, নয়তো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতো। কিন্তু বর্তমানের নারীরা জানে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। তারা জানে শিক্ষা কেবল ডিগ্রির জন্যে নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে। তারা ঘরকে মন্দির মনে করে, আবার অফিসকে মনে করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণক্ষেত্র।

অরণির এই যাত্রাটা অনেক নারীরই গল্প। প্রতিটি বাড়িতে অরণিরা এভাবেই লড়াই করে। কখনো পরিবারকে বোঝায়, কখনো সমাজকে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা হওয়া উচিত বাস্তব, পরিবার ও সমাজের প্রেক্ষাপটে মিলিয়ে। নারী শিক্ষা ও কর্মজীবনে আসার ফলে সমাজ যে নতুন গতি পেয়েছে, তাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

রাতের নিস্তব্ধতায় অরণি নিজের মনেই বললো, ‘আমি লড়বো। আমি চাকরিও করবো, আবার আমার ভালোবাসার এ ঘরটাকেও আগলে রাখবো। কারণ এ দু’টোর কোনোটাকেই আমি ছাড়বো না।’

চাঁদের আলোয় আলোকিত বারান্দায় দাঁড়িয়ে অরণি আর নীলের ছায়া দু’টো একসাথে মিশে গিয়েছিলো। সেই ছায়া জানান দিচ্ছিলো যে, আধুনিক যুগের নতুন সমীকরণ হবে সহমর্মিতার, প্রতিযোগিতার নয়। নারী তার যোগ্য পেশাজীবী পরিচয় নিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, আর পরিবার হবে তার শক্তির আধার, কোনো বাধার দেয়াল নয়।

এ গল্পের মধ্যদিয়ে আমরা বুঝতে পারি যে, নারীর লড়াই কেবল বাইরের পৃথিবীর সাথে নয়, বরং নিজের চেনা পরিমন্ডলে নিজের অবস্থান বুঝিয়ে দেওয়ার লড়াইও বটে। আর যখন পরিবার সেই লড়াইয়ে অংশীদার হয়, তখনই একটি সুন্দর সমাজ গঠন সম্ভব হয়। অরণি জানে তার সামনে অনেক পথ বাকি, কিন্তু সে আর একাকী নয়। তার হাতের ওপর নীলের হাত আর মনের ওপর নিজের বিশ্বাসের জোর তাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।

এভাবেই শেষ হলো একটি পূর্ণিমার রাত, কিন্তু শুরু হলো এক নতুন দিনের স্বপ্ন। যেখানে কোনো নারীকেই আর এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না যে—সে সংসার করবে নাকি চাকরি? বরং সবাই বলবে, সে নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচবে এবং সমাজ তাকে সেই সুযোগ করে দেবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়