প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৭
যে বর্ষা আর ফিরে আসে না

শহরে বর্ষা নামে খুব নিয়ম মেনে। আবহাওয়া অফিস আগেই জানিয়ে দেয়Ñআজ মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। মানুষ ছাতা নিয়ে বের হয়, গাড়ির কাঁচ তুলে দেয়, দোকানের শাটার আধখোলা রেখে অপেক্ষা করে। তারপর একসময় আকাশ থেকে বৃষ্টি নামে। মুহূর্তেই রাস্তা জলে ডুবে যায়, গাড়ির চাকা কাদা ছিটিয়ে চলে যায়, ফুটপাতের মানুষ আশ্রয় খোঁজে। চারদিকে শুধু ভেজা কংক্রিট, হর্নের শব্দ আর বিরক্ত মুখ।
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সেই বৃষ্টি দেখি। বৃষ্টির ফোঁটা কাঁচ বেয়ে নেমে আসে, কিন্তু মন ভিজে না। কারণ এই বৃষ্টির সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই। এই বৃষ্টি আমাকে ডাকে না। বরং প্রতিবার শহরের বৃষ্টি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বহু দূরের এক গ্রামেÑযেখানে বর্ষা ছিল ঋতু নয়, পরিবারের একজন সদস্যের মতো। যার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করা হতো।
ছোটবেলায় আকাশ কালো হতে দেখলেই বুকের ভেতর কেমন একটা আনন্দ দৌড়ে বেড়াত। দূরে মেঘ গর্জে উঠলেই মনে হতো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবীটা বদলে যাবে। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। নারকেল গাছের পাতা উল্টে যেত। বাঁশঝাড়ে অদ্ভুত এক সোঁ সোঁ শব্দ উঠত। আমরা ভাইবোনেরা দৌড়ে উঠোনে চলে আসতাম। কার আগে কে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখবে, সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত।
তারপর একসময় ঝমঝম করে বৃষ্টি নামত।
আজও চোখ বন্ধ করলে শুনতে পাই টিনের চালের সেই অবিরাম শব্দ। মনে হতো, হাজার হাজার ছোট্ট আঙুল একসঙ্গে টিনের ওপর বাজনা বাজাচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো বাড়ি অন্ধকার হয়ে যেত। মা হারিকেন জ্বালাতেন। সেই হলুদ আলোয় ঘরের দেয়ালগুলো অন্যরকম লাগত। বাইরে শুধু বৃষ্টির শব্দ, ব্যাঙের ডাক আর দূরে কোথাও বজ্রপাতের আলো। ভয়ও লাগত, আবার সেই ভয়ের মধ্যেই ছিল এক অদ্ভুত নিরাপত্তা। কারণ জানতাম, মা পাশের ঘরেই আছেন।
বর্ষার প্রথম দিনের সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল ভিজতে নামা। এখনকার মতো তখন কেউ খুব একটা বাধা দিত না। জামাকাপড় ভিজে গেলে মা হয়তো একটু বকতেন, কিন্তু সেই বকুনির ভেতরেও ছিল মায়া। আমরা মাঠে ছুটতাম, কাদা মাড়াতাম, পা পিছলে পড়ে গিয়ে আবার হেসে উঠতাম। তখন কাদা ছিল না নোংরা; কাদা ছিল খেলনা।
গ্রামের ছোট্ট পথগুলো বৃষ্টিতে ডুবে যেত। সেই পথ দিয়েই আমরা খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতাম। দুই পায়ের আঙুলের ফাঁক দিয়ে কাদা বেরিয়ে আসার যে অনুভূতি, তা ভাষায় বোঝানো যায় না। শহরের চকচকে জুতো পরে হাঁটতে হাঁটতে আজও মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষ যত বড় হয়, ততই মাটির কাছ থেকে দূরে সরে যায়।
বৃষ্টি একটু থামলেই শুরু হতো আরেক উৎসব। কাগজের খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে নৌকা বানানো। কার নৌকা সবচেয়ে দূরে যাবে, তা নিয়ে কত প্রতিযোগিতা! ড্রেন, খাল, কিংবা উঠোনের জমে থাকা পানিতে সেই নৌকা ভাসিয়ে আমরা মনে মনে কত দূরের দেশে চলে যেতাম! তখন একটা কাগজের নৌকাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাহাজ।
পুকুরের পানি উপচে খালে মিশে যেত। গ্রামের বড়রা বলতেন, এখন মাছ বের হবে। আমরা হাতে ছোট জাল, কেউ বাঁশের তৈরি ফাঁদ, কেউ আবার শুধু একটা গামছা নিয়ে ছুটে যেতাম। মাছ ধরা হোক বা না হোক, সেই ছুটে যাওয়ার আনন্দটাই ছিল আসল। ফিরে আসার সময় গায়ে কাদা, মাথায় বৃষ্টি, হাতে হয়তো দু-একটা ছোট মাছÑমনে হতো, বিশাল কোনো যুদ্ধ জিতে ফিরছি।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি একটু থামলে চারদিকে এক ধরনের ধোঁয়াটে আলো ছড়িয়ে পড়ত। গাছের পাতায় জমে থাকা জল টুপটুপ করে পড়ত। দূরে ধানের ক্ষেতে কুয়াশার মতো জলীয় বাষ্প উঠত। সেই সময় মা রান্নাঘরে পেঁয়াজু বা আলুর চপ ভাজতেন। ভাজার গন্ধ পুরো বাড়ি ছড়িয়ে যেত। গরম চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখাÑএমন বিলাসিতা তখন বিলাসিতা বলে মনে হয়নি। কারণ সেটাই ছিল জীবন।
আজ শহরে বৃষ্টি হলে অনলাইনে খাবার অর্ডার করা যায়, দামি কফি খাওয়া যায়, কাঁচের জানালার ভেতর বসে ছবি তোলা যায়। কিন্তু আশ্চর্য, এত আয়োজনের পরও সেই এক কাপ মায়ের হাতের চা আর ভেজা বিকেলের স্বাদ কোথাও খুঁজে পাই না।
সময় মানুষকে শুধু বড় করে না, অনেক কিছু কেড়েও নেয়। আমাদের কাছ থেকে সে কেড়ে নিয়েছে বর্ষাকে উপভোগ করার সরল ক্ষমতাটুকু। এখন বৃষ্টি নামলে প্রথমেই মনে হয়Ñরাস্তা ডুববে না তো? অফিসে যেতে দেরি হবে না তো? ফোনটা ভিজে যাবে না তো? অথচ একদিন এই একই বৃষ্টিতে আমরা ইচ্ছে করেই ভিজতাম, যেন ভিজে না গেলে বর্ষা সম্পূর্ণ হতো না।
হয়তো সেই কারণেই শহরের জানালায় দাঁড়িয়ে যখন বৃষ্টি দেখি, তখন মনে হয় আমি আসলে বৃষ্টি দেখছি না; আমি আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে খুঁজছি। যে শৈশব টিনের চালের শব্দে ঘুমাত, কাদামাখা পায়ে বাড়ি ফিরত, আর বিশ্বাস করতÑবর্ষা এলেই পৃথিবী নতুন হয়ে যায়।








