বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০০:৩৩

জলাবদ্ধতা, শিশুমৃত্যু ও সতর্কতা

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার
জলাবদ্ধতা, শিশুমৃত্যু ও সতর্কতা

বর্ষা এলেই সামান্য বৃষ্টিতে শহরের রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায়। জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। ড্রেনেজব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অনেক স্থানে পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকে। এর মধ্যে ভয়াবহ ঝুঁকি সৃষ্টি করে খোলা ম্যানহোল, ভাঙা ড্রেন ও অরক্ষিত নালা। বর্ষার পানিতে এগুলো দেখা যায় না। ফলে শিশু তো বটেই, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও দুর্ঘটনার শিকার হন। অনেক সময় বাবা-মা কর্মব্যস্ত থাকায় শিশুদের পর্যাপ্ত নজরদারি করা সম্ভব হয় না। কয়েক মিনিটের অসতর্কতাই বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে প্রায় ১৪ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। দেশের একটি বেসরকারি জরিপ অনুযায়ী, এই সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং প্রতিদিন গড়ে ৪৬ জন শিশু মারা যায়। সাধারণত ১ থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি এই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। পানিতে ডুবে মৃত শিশুদের প্রায় ৮৭ ভাগ এই বয়সের। বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরির (বিএইচআইএস) মতে, দেশে অপঘাতে প্রতি বছর ৩০ হাজার শিশু মারা যায়, যার অর্ধেকই প্রাণ হারায় পানিতে ডুবে। অধিকাংশ শিশুই বাড়ি থেকে মাত্র ২০ মিটারের মধ্যে থাকা জলাশয়ে পড়ে প্রাণ হারায়। এ ছাড়া নদীতে ডুবে ২২ ভাগ এবং বন্যার পানিতে ৭ ভাগ শিশুর মৃত্যু ঘটে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সঁাতার না জানার কারণে গত এক যুগে কক্সবাজারে সাগরে ডুবে ৮৫ জন এবং সেন্ট মার্টিনে ১৪ জন পর্যটক মারা গেছেন। ভারী বৃষ্টিপাত, বর্ষার পানি, পাহাড়ি ঢল এবং জলাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে এ পর্যন্ত শিশুসহ মোট অর্ধশতাধিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

গত কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাতে জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন শিক্ষার্থী, অফিসগামী ও সাধারণ মানুষ। মিরপুর ১ ও ১০, শেওড়াপাড়া, কাজিপাড়া, কমলাপুর, মুগদাপাড়া, নিকেতন, মালিবাগ, কারওয়ান বাজার, গ্রিন রোড, শান্তিনগর রামপুরা এবং যাত্রাবাড়ী এলাকার প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে জীবনযাত্রা অনেকটাই স্থবির হয়ে যায়। ধানমন্ডি লেক, বনানী ও কাকলিসংলগ্ন ওভারব্রিজের মুখে শত শত গাড়ি নৌকার মতো ভাসে। বংশাল এবং পুরান ঢাকার শহরসংলগ্ন অধিকাংশ দোকানের মালামাল পানিতে নিমজ্জিত, এয়ারপোর্ট রোড, গুলশান-২, আমেরিকান অ্যাম্বাসির সামনের রোডে পানির স্রোত দেখা যায়। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কোমরপানি ভেঙে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে দেখা গেছে। নিউমার্কেটসংলগ্ন এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দোতলা বাস প্রায় ৮-১০ ঘণ্টা আটকে ছিল। জাহাঙ্গীরনগর এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো পানিতে থইথই করে। ফলে শিক্ষার্থীসহ কর্মমুখী সব মানুষের দুর্দশার কোনো অন্ত থাকে না। বর্ষা এলেই গ্যাসলাইন, পানির লাইন কিংবা রাস্তা উন্নয়নের নামে বিভিন্ন স্থানে কাটাকাটি তো আছেই। এগুলোতে পানি জমে থাকার কারণে দুর্ঘটনা আরও বাড়ছে। অনেক শিশু বাবা-মার অজান্তেই এসব পানিতে সঁাতার কাটতে গিয়ে নিখেঁাজ হয় কিংবা লাশ হয়ে ঘরে ফেরে। কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামে ছোট্ট একটি শিশু তার নানাকে অনুসরণ করতে গিয়ে নালায় পড়ে মারা যায়। চট্টগ্রামের অলিগলি, সড়কপথ, রেলপথ এমনকি এয়ারপোর্টও পানিতে নিমজ্জিত হয়। বন্ধ থাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট।

জলাবদ্ধতার এই চিত্র বহু বছর ধরেই। অথচ সমাধানের জন্য প্রতি বছরই দেশি এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে হাজার কোটি টাকার নানান পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু ফলাফল কী দঁাড়ায়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নতুন সরকারের কাছে এর সমাধান আশা করছে ভুক্তভোগীরা। তবে সাধারণ জনগণকেও সচেতন হতে হবে। যেখানে সেখানে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না। অবৈধভাবে খাল ও নালাগুলো দখল করে থাকলে স্বেচ্ছায় তা অবমুক্ত করি। ভবিষ্যতে যেন আর কেউ দখল না করে সেদিকে খেয়াল রাখি। তবে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা দূর করতে এই পরামর্শগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে : ১. খাল, ড্রেন ও কালভার্ট সম্প্রসারণ : চাহিদা অনুযায়ী ড্রেনের ধারণক্ষমতা ও আকার বাড়ানো। দখল হওয়া খালগুলো উদ্ধার করে খনন ও সংস্কার করা, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে গিয়ে পড়তে পারে। ২. নিয়মিত পরিষ্কার কার্যক্রম : বর্ষার আগে ও সংকট সময়ে ড্রেন, খাল ও বক্স কালভার্টগুলো থেকে পলি ও ময়লা নিয়মিত পরিষ্কার করা। ড্রেনে যাতে পলিথিন ও অন্যান্য বজর্য জমে পানিপ্রবাহ বন্ধ করতে না পারে, যেখানেসেখানে ময়লা ফেলা রোধে কঠোর নজরদারি ও জরিমানা চালু করা। ৩. জলাধার সংরক্ষণ : নতুন ভবন নির্মাণের সময় যেন প্রাকৃতিক জলাশয়, পুকুর বা নিচু জমি ভরাট না হয়, তা নিশ্চিত করা। বৃষ্টির পানি যেন সরাসরি মাটিতে চুইয়ে পড়তে পারে, সেজন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ বা ভূগর্ভস্থ জলাধার নির্মাণ করা ৪. জনসচেতনতা বৃদ্ধি : যথেচ্ছ ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে বজর্য ফেলার জন্য নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে নাগরিকদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ। ৫. কুইক রেসপন্স টিম কিউআরটি : কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিলে দ্রুত পানিনিষ্কাশনের জন্য সার্বক্ষণিক কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখতে হবে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে পুকুর, ডোবা, খালবিল আছে এবং বর্ষা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই ঋতু যেন শিশুদের জন্য মৃত্যুফঁাদে পরিণত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সে লক্ষ্যে নিরাপদ নগর পরিকল্পনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, ম্যানহোল ও ড্রেনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতি বছর বর্ষা আসার আগেই স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের খোলা ম্যানহোল, অরক্ষিত ড্রেন ও ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। লেখাপড়া ও খেলাধুলার পাশাপাশি শিশুদের সঁাতার শেখানোকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে। পরিসংখ্যান বলছে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে (যখন মায়েদের রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির কাজ থাকে) শিশুরা পানিতে বেশি ডুবে থাকে। তাই এই সময়টাতে শিশুদের দিকে বিশেষভাবে নজরে রাখা উচিত। গ্রামীণ মায়েরা একসময় সন্তানের কোমরে ঘুঙুর বেঁধে দিতেন। ঘরের বা উঠোনের কাজে ব্যস্ত মা না তাকিয়েও ওই ঘুঙুরের শব্দ শুনে বুঝতে পারতেন শিশুটি কোথায় আছে। একটি শিশুর জীবন যেমন অমূল্য, তেমনি তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও সবার নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। তাই একটু সচেতন হলেই অনাকাক্সিক্ষত এই শিশুমৃত্যুর হার অনেকটা কমানো সম্ভব।

লেখক : গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়