প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩
ধারাবাহিক উপন্যাস-৪৮
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
২৮.
রাজীব আসার পর বেশ কিছুদিন হয়ে গেল সে কল করেনি অথচ আজ বলছে আমাকে দেখা করার জন্য। আমি যাব কী না ভাবছিলাম কিন্তু মন চাইছে না। সারোয়ার আংকেলের কাছ থেকে যখন জানতে পারি এই সকল কিছুর মূলে রাজীবের হস্তক্ষেপ শতভাগ তখন তার প্রতি শ্রদ্ধাটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বাবা-ছেলের মাঝে মানসিকতার ব্যবধান অনেক বেশি এটা বুঝতে বাকি নেই। একই রক্ত অথচ ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ভিন্ন। ভুল-শুদ্ধ সে বিবেচনায় আমি যাচ্ছি না তবে এই বিষয়টাতে অপরাধীর জায়গায় তাকে খুঁজে পাই। বয়স্ক মানুষগুলোকে আদালতের দারস্থ না করে আলোচনা করলে হয়তো সমাধান ঠিকই আসত। দেশে ফেরার এতদিন পর কেন আমার সাথে দেখা করতে চাইছে সে বিষয়ে জানতে হবে।
‘আরে তুই এসেছিস বস, এক কাজ করি আমরা বাইরে কোথাও চা খাই।’
‘আমি চা খেতে আসিনি, আমায় কেন ডাকলে আগে সেটা শুনি।’
‘আসার পর থেকে ঝামেলায় জড়িয়ে আছি তোর সাথে কোনো কথাই বলতে পারছিলাম না। আজ একটু ফ্রি হয়েছি বলেই তোকে দেখা করতে বলেছি।’
‘তুমি তো বাসায়ও আসতে পারতে?’
‘ইচ্ছে করছিল না, সত্যি বলতে কী নিকুঞ্জ নিকেতনের কাছাকাছি গেলে আমি ইমোশনাল হয়ে যাই। বিগত দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।’
‘ভয় পাও?’
‘ভয় পাব কেন, ইমোশন আর ভয় কী এক জিনিস! কী রে এভাবে চুপ করে আছিস কেন?’
‘ভাবছি। গতবার যে রাজীব এসেছিল আর এবারের রাজীব দুটোকে আলাদা করে পাচ্ছি। জড় পদার্থের মোহে জীবিত সকল কিছুই ভুলে গেছ।’
‘তুই কী বলছিস আমার মাথায় ধরছে না। তোর এইসব প্যাঁচানো বাক্য আমার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।’
‘ভালো, তাহলে কেন ডেকেছ সেটা বল আমার তাড়া আছে।’
‘তুই এমন করে কথা বলছিস কেন? তোর কী হয়েছে খুলে বল তো?’
‘এটা ধর।’
‘আরেকটা ডায়েরি! তুই এটা দেসনি কেন?’
‘লোভে পড়ে কারণ কাকাবাবু তোমাকে সকল ডায়েরির আগে এই ডায়েরিটা দিতে বলেছিল তাই কী লেখা আছে সেটা পড়ার খুব আগ্রহ ছিল।’
‘বাহ্, অন্যের ডায়েরি পড়ার আগ্রহ দেখি বেশ আছে তোর। তা তুই জানিস না অন্যের ডায়েরি পড়া অন্যায়।’
‘জানি আর অন্যায়টা করতে পেরেছি বলেই তোমার চাইতে তোমার বাবাকে অনেক ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি যা ছেলে হয়ে আজও তুমি বোঝনি।’
‘বিশাখা কারো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে তোর আলোচনা করা উচিত না।’
‘এই চিঠিটা তোমাকে কাকাবাবু দিয়েছিল তুমি আসার আগের দিন, আমি পড়িনি। এটা ডায়েরির ভিতরে রেখেছিলাম বলে তখন ভুলে যাই দিতে। আমার সাথে তোমার আর কোনো জরুরি কথা না থাকলে আমি আসি এখন।’
বিশাখার এমন আচরণ সহ্য করতে পারছি না। যে বিশাখা আমার সাথে কথা বলার জন্য আগ্রহী থাকত, আমার প্রতিটি বিষয় খেয়াল রাখত। যার ভরসায় বাপিকে রেখে আমি দূর দেশে পাড়ি দিতে পেরেছিলাম সেই বিশাখা আমাকে এভাবে এড়িয়ে যাবে, কেন? গতদিন কোর্টের শুনানি শেষে আদালতের বাইরে এসে তার সাথে কথা বলতে চাইলে সে আমাকে পাশ কেটে চলে যায়। আজ চার-পাঁচদিন পর তাকে যখন ফোন করে দেখা করতে বলি সে আমতা আমতা করল আর এখানে এসে এগুলো দিয়ে তড়িঘড়ি করে চলে গেল। সমস্যাটা কোথায় বুঝতে পারছি না। কী লেখা আছে চিঠিতে দেখি পড়ে।
‘প্রিয় রাজীব,
ভালোবাসা ও আশীর্বাদ রইল। আমি জানি না এ জীবনে তোমার সাথে দেখা হচ্ছে কী না? শরীরের অবস্থা বেশি একটা ভালো নয়। একমাসে দুবার হাসপাতালে পরপর আসা মানে আমার সময়টা আর বেশি বাকি নেই এটা বুঝতে পারছি। তুমি আমার সন্তান তাই তোমাকে আমার চাইতে ভালোভাবে আর কেহ বুঝতে পারবে না। আমরা শুধু বাপ-ছেলেই নই ভালো বন্ধুও বটে। তোমাকে কিছু কথা বলার আছে যা সামনাসামনি হয়তো বলা যেত না। তুমি আর আমি আমরা দুজনেই জানি আমেরিকা যাওয়ার বিষয়টা। এটাতে কিছু অভিমান থাকলেও তোমার প্রতি আমার কোনো রাগ নেই। আমরা দুজনেই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে নিজেদের ভেবেছি। তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যত আর আমার ছিল একাকিত্বের বোঝা। তোমার মাকে হারিয়ে আমি জেনেছিলাম আপনজন হারানোর বেদনা কতটা। তোমার অভিমানের কাছে এই বৃদ্ধ বাবাটা সেদিন হেরে গিয়েছিল। তারপর থেকেই একা থাকা বিষয়টা আমাকে বাঁচতে দিত না। পার্কে এসে প্রায়ই খোঁজ করতাম কাউকে মনের কথা বলতে পারি কী না কিন্তু ভরসা করতে পারছিলাম না। আমি গাছের সাথে কথা বলতাম তাও লোক চক্ষুর আড়ালে যেন কেউ দেখলে আমায় পাগল না ভাবে। শেষ বয়সটা যে কতটা ভয়াবহ তা এ বয়সে না আসলে বুঝতে পারবে না। শরীর, মন, বুুদ্ধি, আপনজন কেউই সাথে থাকে না। চারপাশে এত ভীড়-কোলাহল অথচ আমার পৃথিবী নতুন গ্রহের মতো শূন্য। আমি পাগল প্রায় হয়ে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনই আমার এই চার রত্নকে খুঁজে পাই। আমার মতো ওদেরও অনেক যন্ত্রণা তাই হয়তো আমরা একসাথ হতে পেরেছি। ওরা ভাবে আমি ওদের ঠাঁই দিয়েছি। কথা পুরোটা সত্যি নয় এর মধ্যে আমার একাকিত্ব ঘুচানোর বিষয়টাও ছিল। আমি জানি দেশে তোমার ফেরার কোনো সুযোগ নেই। যতদিন আমি আছি হয়তো এই বৃদ্ধ বাপির টানে তুমি আসবে তারপর তোমার ভুবনে তুমি হবে বিলীন। আমি এই বয়সটাকে অনুভব করেছি বলেই এই সকল মানুষগুলোকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা করছি। আমার স্বপ্নটা এই চার রত্ন জানে এবং আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমাদের মধ্যে কোনো একজনও যদি জীবিত থাকে তাহলে নিকুঞ্জ নিকেতনের এই যাত্রা কখনো থামবে না। শেষ জীবনটা অভিশপ্ত নয় শুধু বাঁচতে জানতে হয় তাই ওদের আমি বাঁচতে শিখিয়েছি। এই শিক্ষা ওদের নয় এটা আমারও। বিশাখা অনেক ভালো মেয়ে। আমি জানি না আমার পুত্রবধূ দেখে যেতে পারব কী না। তুমি যতই দূরে থাক আমার নিঃশ্বাসে আজও সেই ছোট্ট রাজীবের শরীরের গন্ধ অনুভব করি। তোমার ছোঁয়া, মিষ্টিমিষ্টি কথা অনুভব করি। তুমি আর আমি হাজার হাজার মাইল দূরে অথচ আমি আমার রাজীবকে আজও অনুভব করি। আজ কয়টা দিন খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোমায়। আমার যদি মৃত্যুও হয় তুমি তো এতদূর থেকে আসতে অনেক সময় লেগে যাবে তাই মুখাগ্নিটা হয়তো এদের কোনো একজন করে দিবে। নিকুঞ্জ নিকেতনের এই যাত্রাকে তুমি থামতে দিও না। ধরে নিও শেষবেলায় তোমার বাপির চাওয়া তোমার কাছে। ঈশ্বর যদি তোমার আমার জন্ম আবার লিখে রাখে তাহলে সে জনমে আমি তোমার ছেলে হয়ে জন্ম নিতে চাই। তখন আমরা একসাথে থাকব আর আমি আমার বাপিকে ছেড়ে কোথাও যাব না। তোমায় বলার আরও অনেক কিছু আছে কিন্তু শরীর ভালো লাগছে না। যদি বেঁচে না থাকি তাহলে তোমার পথচলা যেন না থামে। জয়ী তোমাকে হতেই হবে। আমি চিরকালই থাকব তোমার ভালোবাসায় আশীর্বাদ হয়ে।
‘ইতি’
‘তোমার বাপি’
[চলবে..., পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]








